বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে নির্মিতব্য কক্সবাজার রেললাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সুরক্ষার জন্য আগামী ৫০ বা ১০০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই এলাকায় কেমন হতে পারে তা পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—এডিবি। তারা ১৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে বেশির ভাগ অর্থায়ন করছে।
সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে এডিবি বলেছে, রেলপথের এই অংশের উচ্চতা আরো বাড়ানো দরকার কি না তা-ও বিবেচনা করতে হবে। রেলপথ রক্ষায় প্রয়োজনে সাঙ্গু নদীতে বাঁধ দেওয়ার দরকার হলে তা-ও ভেবে দেখা যেতে পারে।
এডিবির প্রতিনিধিদের কেউ কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিদর্শনের পর তাঁরা অনানুষ্ঠানিকভাবে এই তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পরে দেওয়া হবে।
এদিকে দেশীয় বিশেষজ্ঞরা এই প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশায় গলদ আছে বলে মত দিয়েছেন।
নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেছেন, বাংলাদেশের বাকি সব রেলপথ উত্তর-দক্ষিণে দেশের প্রবহমান নদীগুলোর সমান্তরালে করা হয়েছে। এই প্রকল্প একমাত্র ব্যতিক্রম। এই পথ করা হয়েছে নদীর প্রবাহের আড়াআড়ি, পূর্ব-পশ্চিমে। ফলে পানি এসে সরাসরি রেলপথে আঘাত করেছে।
আর অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করছেন, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা উচিত।
সেই সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে দুটি লটে ভাগ করে। লট-১ চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার। লট-২ চকরিয়া থেকে কক্সবাজার স্টেশন পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার।
সাম্প্রতিক বন্যায় রেললাইনের যে অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা লট-১ অংশে।
লট-১ অংশের কাজ যৌথভাবে করছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন-সিআরইসি ও বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন কম্পানি। লট-২-এর কাজ করেছে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন—সিসিইসিসি ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
২০১৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের চুক্তি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লট-২-এর কাজ শুরু করে পরের বছরের ১ মার্চ। আর তমা কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু করে আরো চার মাস পর ১ জুলাই। দেরিতে কাজ শুরু করলেও তমা কনস্ট্রাকশনকে কাজ শেষ করতে হচ্ছে একই সঙ্গে, একই সময়ে। তাই শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া করে কাজ শেষ করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। সেই সঙ্গে ব্যবহার করা নির্মাণসামগ্রীর পাশাপাশি মাটি ও পাথরের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দোহাজারী থেকে চকরিয়া অংশের সাতকানিয়ার জনার কেঁওচিয়া ও তেমুহনী এলাকার রেললাইনের বেশি ক্ষতি হয়েছে সাম্প্রতিক বন্যায়। এরই মধ্যে অর্থায়নকারী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—এডিবির প্রতিনিধিরা প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। গতকাল পরিদর্শনে গেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা।
এডিবির প্রতিনিধি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করলেও রেলওয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক করেনি। তবে তাঁরা গত ১৬ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় লট-১-এর ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। প্রতিনিধিদলটি শিগগিরই এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেবেন।
তবে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, এডিবির প্রতিনিধিরা বলেছেন, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এগুলো নিয়ে পরামর্শ করে প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত নিতে। তাঁরা শুধু কিছু দিক দেখিয়ে গেছেন। কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব দেননি। কাজের মান নিয়ে এডিবি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত কালের কণ্ঠকে বলেছেন, এটি বাঁধনির্ভর রেলপথ হলেও উপযুক্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। বাঁধ নির্মাণের নামে মাটির স্তূপ তৈরি করা হয়েছে। এটা পরিকল্পিত বাঁধও নয়।
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে বন্যার পাশাপাশি নির্মাণকাজের দুর্বলতা আছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। প্রকল্পে যেসব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোর মান সঠিকভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না সেটাও দেখা জরুরি। পর্যাপ্ত সময় নিয়ে প্রতিটি স্তরে কাজ হয়েছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখা উচিত।
জানতে চাইলে তমা কনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকার কাজ করেছি। ৫২ কিলোমিটার রাস্তা বানিয়েছি। কোথাও সমস্যা হলো না। সব সমস্যা কি ৫০০ মিটারে হয়েছে! যেখানে সমস্যা হয়েছে সেই রাস্তাটা মাটি থেকে ১৫ ফুট উঁচুতে। মাটি ও পাথর উপযুক্ত না থাকলে পুরো রাস্তাই তো ভেঙে যেত। কাজের মান ভালো না থাকার অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তমা কনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো বলেন, ‘আমরা চার মাস পর ওয়ার্ক অডার পেয়েছি। তাই চার মাস পর কাজ শুরু করতে হয়েছে। আমার কথা আমি বললে তো হবে না, যাঁরা কাজ দেখেছেন তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন, কাজ কতটা ভালো বা খারাপ হয়েছে।’
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুরো রেলপথের নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। আর অক্টোবরের মাঝামাঝিতে যাত্রী পরিবহন শুরুর কথা। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামত করার পাশাপাশি পুরো কাজ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হবে কি না তা এখন স্পষ্ট নয়। অক্টোবরের শুরুর দিকে ট্রেন চলাচল শুরুর ভাবনা থাকলেও সেখান থেকে সরে আসছে রেল কর্তৃপক্ষ।
দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের অদূরে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়াল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রথম পর্যায়ে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০.৮৩১ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয়েছে ৯টি রেলওয়ে স্টেশন, চারটি বড় ও ৪৭টি ছোট সেতু। ১৪৯টি বক্স কালভার্ট ও ৫২টি রাউন্ড কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। লেভেলক্রসিং রয়েছে ৯৬টি।
সর্বশেষ জুলাইয়ের প্রকল্পের অগ্রগতির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১০০ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ৮৮ কিলোমিটার লাইন বসানো হয়ে গেছে। ৯টি স্টেশনের কাজ চলমান আছে। স্টেশনের সার্বিক কাজের অগ্রগতি প্রায় ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে ডুলাহাজারা স্টেশনের কাজ শেষ হয়েছে।
প্রকল্পটি ২০১০ সালে অনুমোদন দেয় সরকার। এরপর সব জটিলতা কাটিয়ে ২০১৮ সালে প্রকল্প নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করে। ফাস্ট ট্র্যাক এই প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হচ্ছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঋণ দিচ্ছে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। বাকি চার হাজার ৯১৯ কোটি সাত লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।
