মুসলিম বিশ্বে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ যখন তাদের মূল সংকট -সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা-কে শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছেন তখন একদল পণ্ডিত হাজির হয়েছেন বিদ্যমান সেক্যুলার কু/ফুরি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার নতুন কৌশল নিয়ে। তারা বলছেন, আমাদের অধিকাংশ আইন তো ইসলামের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ; কখনো আবার বলছেন, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকারসহ অনেক ক্ষেত্রেই তো শরীয়াহ অনুসরণ করা হয়”, কিংবা চুরি-ডাকাতি, হত্যা, প্রতারণা নিষিদ্ধ– ইত্যাদি তো ইসলামেরই শিক্ষা।
নানা গবেষণা পরিসংখ্যান আর তত্ত্ব নিয়ে তারা হাজির হন এখন তখন, বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে। সেক্যুলার এশটাব্লিশমেন্ট তাদেরকে স্পেইস তৈরি করে দেয় তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে বেশ আরামের সাথে।
তাদের উপস্থাপিত যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয় মনে হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো আসল প্রশ্নটিকে ধামাচাপা দেওয়া এবং একটু ঘষেমেজে বিদ্যমান কু/ফুরি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে ওকালতি করা।
কেন, সেটাই বলছি:
কোনো সভ্যতাই কেবল কিছু আইনের সমষ্টি হতে পারে না। প্রতিটি সভ্যতার একটি নিজস্ব ওয়ার্ল্ডভিউ, সত্যের ধারণা (Concept of Truth), মানুষের পরিচয় (Concept of Man), জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology), নৈতিকতা (Morality) এবং রাষ্ট্রদর্শন (Political Philosophy) থাকে।
তাই স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের রাষ্ট্রদর্শনও কেবল কিছু আইন বা বিধানের সমষ্টি নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শগত ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গি, যার নিজস্ব রাষ্ট্র-দর্শন, নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং সামাজিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
একটি ইসলামী রাষ্ট্র ও একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কোনো নির্দিষ্ট আইন নয়; বরং “সার্বভৌমত্বের উৎস”।
ইসলামে আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আল্লাহর। মানুষ মৌলিকভাবে আইন রচনা করার অধিকার রাখে না; কারণ সৃষ্টির জন্য আইন রচনার মৌলিক অধিকার কেবল স্রষ্টার। মানুষের দায়িত্ব হলো আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা এবং নতুন পরিস্থিতিতে তার ব্যাখ্যা প্রদান করা। ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় শাসক, সংসদ কিংবা জনগণ কেউই চূড়ান্ত আইনদাতা নয়। যৌগিক যেসকল ক্ষেত্র আল্লাহ তা’আলা মানুষের উপর ছেড়েছেন সেসকল ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া মূলনীতির আলোকেই তারা তা প্রস্তুত করবে।
অপরদিকে আধুনিক সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্বের উৎস হলো জনগণ। জনগণের ইচ্ছাই আইনকে বৈধতা দেয়। কোনো বিষয় আজ বৈধ, কাল অবৈধ; আবার কাল যা অবৈধ, পরশু তা বৈধ হতে পারে, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বা তাদের প্রতিনিধিরা তা অনুমোদন করে।
এখানেই ইসলামী রাষ্ট্র ও সেক্যুলার রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্য। তাই, যদি কোনো রাষ্ট্রের কয়েকটি আইন, এমনকি অধিকাংশ আইনও ইসলামের সঙ্গে মিলে যায়, তবুও সেটি ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যায় না। যেমন কোনো ব্যক্তি মুসলমানদের মতো পোশাক পরলেই মুসলমান হয়ে যায় না।
….
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের যে মূল উপাদান মানুষ তথা জাতিগোষ্ঠী, সেই জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কিত ধারণার ক্ষেত্রেও পশ্চিমা ও ইসলামি ধারণার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে।
১৬৪৮ সালের Peace of Westphalia-এর পর ইউরোপে যে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র বা Nation-State ধারণার উদ্ভব ঘটে, তার ভিত্তি ছিল ভূখণ্ড, জাতীয়তাবাদ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। এই মডেলে রাষ্ট্রই সর্বোচ্চ রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ নীতি। রাষ্ট্রসীমাই মানুষের পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি।
কিন্তু ইসলামী রাজনৈতিক ঐতিহ্যে মুসলমানদের পরিচয়ের কেন্দ্র ছিল উম্মাহ।
ইসলামী রাজনৈতিক কল্পনায় মুসলমানদের ঐক্যের ভিত্তি ছিল আকীদা, ভূগোল নয়।
এই কারণেই আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে মুসলিম বিশ্বের বর্তমান সংকট কেবল দুর্নীতি বা স্বৈরশাসনের সমস্যা নয়; বরং মুসলমানদের উপর আরোপিত জাতিরাষ্ট্র কাঠামোর সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
কারণ এই কাঠামো মুসলমানদের রাজনৈতিক কল্পনাকে উম্মাহ থেকে জাতিরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত করেছে। তাই আদর্শ-সভ্যতা-ভুখণ্ড-জাতিধারণা সব দিক থেকেই বিদ্যমান সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রকল্পের বিস্তর তফাৎ রয়েছে।
…..
আরও গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, ইসলামী রাষ্ট্র ও সেক্যুলার রাষ্ট্রের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যও ভিন্ন।
সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো কেবল নাগরিকদের পার্থিব স্বার্থ, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র এখানে মূলত একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কেবল নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়। ইসলামী রাষ্ট্র মানুষের জীবনে আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এটি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, সৎকাজকে উৎসাহিত করে, অসৎকাজকে প্রতিরোধ করে, ইসলামী নৈতিকতা রক্ষা করে, ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে লালন করে এবং মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।
যেমন কুরআনে মুসলিম শাসনব্যবস্থার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে,
“তারা এমন লোক, যাদের আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।” (সূরা আল-হজ্জ: ৪১)
এ আয়াতে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হিসেবে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, বরং দীন প্রতিষ্ঠা ও নৈতিক সমাজ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
….
আজকের বহু মুসলিম দেশে সেক্যুলার সংবিধান, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামো, ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা, পাশ্চাত্য রাজনৈতিক দর্শন এবং জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তা বিদ্যমান। কিন্তু একই সঙ্গে সেখানে কিছু পারিবারিক আইন বা ব্যক্তিগত বিধান ইসলামের মতো রয়েছে।
এই বাস্তবতা দেখে যদি কেউ দাবি করে যে “রাষ্ট্র তো মোটামুটি শরীয়াহ অনুযায়ীই চলছে”, তাহলে সে মূলত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ও দর্শনের প্রশ্নকেই সুকৌশলে আড়াল করছে।
একটি রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার মূল দর্শন দ্বারা, বিচ্ছিন্ন কিছু আইন দ্বারা নয়।
উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ আইনে চুরি নিষিদ্ধ, ইসলামী আইনেও চুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু তাই বলে ব্রিটিশ আইন ইসলামী আইন হয়ে যায় না। কারণ উভয় ব্যবস্থার নিষেধাজ্ঞার পেছনের দর্শন, উদ্দেশ্য এবং বৈধতার উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন।
…..
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে চলে যায়। ঔপনিবেশিক শাসকরা শুধু ভূমি দখল করেনি, তারা রাষ্ট্রের দর্শন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক কাঠামোকেও বদলে দিয়েছে।
ফলে মুসলিম সমাজের উপর এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ভিত্তি ইসলাম নয়; বরং ইউরোপীয় সেক্যুলার আধুনিকতা।
আজ মুসলিম বিশ্বের বহু চিন্তাবিদ উপলব্ধি করছেন যে মুসলমানদের সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, কেবল রাজনৈতিক নয়; বরং এটি মূলত একটি সভ্যতাগত ও দার্শনিক সংকট। মুসলমানদের উপর এমন একটি রাষ্ট্রদর্শন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক রাষ্ট্রদর্শনের বিপরীত।
এ কারণেই সত্যপন্থী ইসলামী আন্দোলনগুলো কেবল কয়েকটি আইন পরিবর্তনের কথা বলে না; বরং রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শন, নৈতিক ভিত্তি এবং আইন প্রণয়নের উৎস পরিবর্তনের কথা বলে।
…..
যখন কেউ বলে, “আমাদের অধিকাংশ আইনই তো শরীয়াহসম্মত”, তখন সে সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নকেই গৌণ করে দেয়।
এসব বক্তব্য দ্বারা তারা মানুষকে বোঝাতে চায় যে এসব ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন নেই; বিদ্যমান রাষ্ট্র-কাঠামোই মুসলমানদের জন্য যথেষ্ট। এর দ্বারা ইসলামের রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত প্রকল্পকে ধ্বংস করে মুসলমানদেরকে আরও হাজার হাজার বছর কা/ফিরদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পথে সুগম করা হয়।
এর মাধ্যমে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা থেকে সংকুচিত করে ব্যক্তিগত ধর্মে পরিণত করা হয়, যা মূলত সেক্যুলার রাষ্ট্রেরই কাঙ্ক্ষিত অবস্থান।
তাই মুসলমানদের জন্য মূল প্রশ্ন এটা না যে বর্তমান রাষ্ট্রের কত শতাংশ আইন শরীয়াহর সঙ্গে মেলে; বরং মূল প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার হাতে? রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কী? সমাজকে কোন নৈতিক দর্শনের উপর নির্মাণ করা হচ্ছে? আইন বৈধতা লাভ করছে কোথা থেকে?
যদি রাষ্ট্রের ভিত্তি হয় মানুষের সার্বভৌমত্ব, সেক্যুলার দর্শন এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কাঠামো, তাহলে সেখানে কিছু শরীয়াহসম্মত আইন বিদ্যমান থাকলেও সেটিকে ইসলামী রাষ্ট্র বলা যায় না।
অতএব “আমাদের তো অনেক আইনই শরীয়াহসম্মত” এই ধরনের বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে কোনো মন্তব্য নয়, বরং চক্রান্তের অংশ।
এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে মুসলমানদের সামনে বিদ্যমান সেক্যুলার কাঠামোকেই ইসলামের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করে। আর এ কারণেই এ ধরনের বক্তব্যকে সর্বোতভাবে বর্জন করা উচিৎ।
(আহমেদ রফিক)
