Wednesday, June 10, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরভয়াবহ হয়ে উঠছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই শিশুদের শরীরে কাজ করছে...

ভয়াবহ হয়ে উঠছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই শিশুদের শরীরে কাজ করছে না, শেষ অস্ত্র হিসেবে আছে মাত্র দুটি

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মারাত্মক জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে ওঠা নিয়ে চলমান উদ্বেগের মাঝেই দেশের চিকিৎসকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা।

হাসপাতালটির শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুদের শরীরে প্রথম সারির প্রায় সব অ্যান্টিবায়োটিকই সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন যে, আক্রান্ত শিশুদের জীবন রক্ষায় চিকিৎসকদের হাতে ‘শেষ অস্ত্র’ হিসেবে এখন মাত্র দুটি অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্ট রয়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চার মাস ধরে পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৪৯টি শিশুর শরীর থেকে জীবাণুর নমুনা সংগ্রহ করে এই গবেষণাটি চালানো হয়। এর মধ্যে ৩০টি জীবাণু গ্রাম-নেগেটিভ ও ১৯টি গ্রাম-পজিটিভ প্রকৃতির। গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুদের শরীরে ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই আর কোনো কাজ করছে না। বিশেষ করে সবশেষ এপ্রিল মাসে সংগৃহীত প্রতিটি গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণু প্রথম সারির প্রধান ছয়টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শতভাগ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এমন অবশ দুই বাহুর বাস্তবতায় চিকিৎসকদের সামনে এখন কেবল ‘টাইজেসাইক্লিন’ ও ‘কলিস্টিন’ নামের দুটি ওষুধই কার্যকর রয়েছে, যার মধ্যে কলিস্টিনের বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে জীবাণুর সম্পূর্ণ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।

রামেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। সহগবেষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন ডা. ওয়াহিদা খাতুন, ডা. নাসরিন সুলতানা, ডা. সুলতানা আক্তার, ডা. শামীমা নাসরিন ও ডা. সিরাজুম মুনির এবং গবেষণা প্রবন্ধটি ‘জার্নাল অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনে’ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পিআইসিইউতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটাচ্ছে ‘অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি কমপ্লেক্স’ নামের একটি জটিল জীবাণু, যা মোট সংক্রমণের ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ‘ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া’ (১৬ দশমিক ৩ শতাংশ) এবং ‘স্ট্যাফাইলোকক্কাস হিমোলিটিকাস’ (১২ দশমিক ২ শতাংশ)। এছাড়া অন্যান্য জীবাণুর মধ্যে ই. কোলাই, সুডোমোনাস ও এলিজাবেথকিংগিয়ার মতো বিপজ্জনক উপাদানও শনাক্ত হয়েছে।

ওষুধের কার্যকারিতা হারানোর এই চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বহুল ব্যবহৃত ইমিপেনেমের প্রতি প্রতিরোধ ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ, মেরোপেনেম ও পাইপেরাসিলিন-টাজোব্যাক্টামের ক্ষেত্রে ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ, সিপ্রোফ্লক্সাসিনে ৯০ শতাংশ এবং জেন্টামাইসিনে ৮৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রাম-পজিটিভ জীবাণুর ক্ষেত্রে লাইনেজলিড, ডাস্টোমাইসিন ও টাইজেসাইক্লিন এখনো সম্পূর্ণ কার্যকর (প্রতিরোধের হার শূন্য) থাকলেও, নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ‘টেইকোপ্লানিন’। এই জীবন রক্ষাকারী ওষুধটির প্রতি ইতোমধ্যে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ জীবাণু প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, যার সবগুলোই গত এপ্রিল মাসে প্রথম ধরা পড়ে। এছাড়া প্রচলিত লেভোফ্লক্সাসিনে ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং অ্যারিথ্রোমাইসিনের বিরুদ্ধে শতভাগ জীবাণুই এখন প্রতিরোধী।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবাণুর এই প্রতিরোধী ক্ষমতা বা রেজিস্ট্যান্সের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সংগৃহীত জীবাণুর ক্ষেত্রে প্রথম সারির ছয়টি ওষুধের প্রতি গড়ে প্রতিরোধ যেখানে ছিল ৮৩ দশমিক ৮ শতাংশ, এপ্রিল মাসে সেটি এক লাফে পুরো ১০০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। চিকিৎসকদের মতে, পরিসংখ্যানগত এই উল্লম্ফন হাসপাতালজুড়ে একটি বড় ধরনের বিপদের সংকেত। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪৯টি শিশুর ওপর চালানো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে সমস্ত শিশুরা অতীতে কোনো না কোনো কারণে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছিল, তাদের শরীরে একাধিক ওষুধ-প্রতিরোধী বা ‘মাল্টিপল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট’ (এমডিআর) জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি।

এই এমডিআর জীবাণুতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ফলাফলও চরম উদ্বেগজনক। সাধারণ জীবাণুর সংক্রমণে একটি শিশু যেখানে গড়ে ৬ দিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে, সেখানে এমডিআর আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে দ্বিগুণ সময় অর্থাৎ গড়ে ১৪ দিন লেগে যাচ্ছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে পূর্ববর্তী সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৪৮ ঘণ্টার বেশি ভেন্টিলেশনে থাকা কিংবা দীর্ঘ সময় পিআইসিইউতে অবস্থান করাকেও অন্যতম ঝুঁকির কারণ বলা হয়েছে।

অবশ্য গবেষকেরা এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছেন। যেহেতু এটি মাত্র একটি হাসপাতালের এবং মাত্র ৪৯ জন শিশুর নমুনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই এর পরিধি কিছুটা সীমিত। এছাড়া জীবাণুর নিখুঁত জিনগত বিশ্লেষণ (জেনেটিক অ্যানালাইসিস) না করায় প্রতিরোধী হয়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট আণবিক কারণটি নিশ্চিত করা যায়নি। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষক দল জরুরি ভিত্তিতে ও অকারণে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করা, হাসপাতালে কঠোরভাবে হাত ধোয়া ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার নিয়ম চালু করা, শেষ ধাপের ওষুধগুলোর ব্যবহার সীমিত করা এবং দেশব্যাপী এই সংকটের গভীরতা মাপতে একটি ‘বহুকেন্দ্রীক জাতীয় তদারকি’ ব্যবস্থা চালুর জোর আহ্বান জানিয়েছেন। গবেষক দলের প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্পষ্ট করেই বলেছেন, পিআইসিইউতে শিশুদের ওপর ওষুধ কাজ না করার কারণেই তাঁরা এই গবেষণায় হাত দেন এবং এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে শিশুদের এমন কঠোর স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পরিচর্যার মধ্যে রাখা, যাতে তারা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মতো জটিল অসুস্থতায় না পড়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one + 10 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য