বই: মানসাঙ্ক: ধর্ষণ প্রতিরোধে সমাজ
সন্দীপন প্রকাশন
প্রতিটি তথ্যের রেফারেন্স আগ্রহীরা বইয়ে ফুটনোটে পাবেন।

আরেক বিশেষ প্রজাতির ভাইয়া-আপুরা ধর্ষণ এড়াতে চমৎকার একটা পরামর্শ দিয়ে থাকে। নারীর জরায়ুর স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই নাকি ধর্ষণ বন্ধ হবে। সেক্সকে অবাধ করে দিলে, পতিতাবৃত্তিকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিলে আর প্রচুর পতিতালয় স্থাপন করলে ধর্ষণ কমে যাবে। সুন্দর যুগোপযোগী প্ল্যান!!
তাহলে আমরা একটু দেখি, যারা অলরেডি এই প্ল্যান বাস্তবায়ন করেছে, তাদের দেশে ধর্ষণের কী অবস্থা। সূত্র অনুযায়ী এমন দেশগুলোতে ধর্ষণ তো কমে যাবার কথা। দেখি, চলেন।
★ নেদারল্যান্ড
আমাদের অনেকেরই স্বপ্নের দেশ নেদারল্যান্ডে পতিতাবৃত্তি বৈধ।
প্রতি ২৪ জনের জন্য ১ জন যৌনকর্মী। আর গার্লফ্রেন্ড, হুক-আপ, ডেইট কালচার তো আছেই। কিন্তু এত কিছুর পরও… ২২% ডাচ নারী জীবনে একবার হলেও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়। ১১% ডাচ নারী সেখানে ধর্ষিতা হয়।
যা চাচ্ছে মেয়েটা দিচ্ছেই, তারপরও মুক্তমনাদের স্বর্গরাজ্য নেদারল্যান্ডে—
– ৯৩% পতিতা গালিগালাজ, জোরজবরদস্তি ও অত্যাচারের শিকার হয়।
– ৭৮% পতিতা যৌনমিলনকালে নির্যাতনের শিকার হয়।
– ৬০%-কে শারীরিক নির্যাতন করা হয় (চুল টানা থেকে নিয়ে প্রচণ্ড আঘাত)।
কেন বলেন তো? মেয়েটা তো সেক্স করতেই দিচ্ছে। শুধু সেক্স আর যথেষ্ট নয়। এই বিপুলসংখ্যক মেয়ে খদ্দেরদের যৌনবিকার বা প্যারাফিলিয়ার শিকার। জাতিগতভাবে যৌনতা আর স্বাভাবিকের পর্যায়ে নেই।
★ আমেরিকান ড্রিম
Stop Street Harassment নামক একটি অলাভজনক এনজিও ১০০০ মার্কিন নারী ও ১০০০ মার্কিন পুরুষের ওপর একটি অনলাইন জরিপ চালায়। তাদের রিপোর্টে অামেরিকার ৮১% নারী এবং ৪৩% পুরুষ তাদের সারা জীবনে একবার হলেও যৌন হয়রানির শিকার হয়।
এ তো গেল হয়রানি। এবার ধর্ষণ… যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ধর্ষণ মামলার গড় সংখ্যা ৮৯,০০০। কেবল আমেরিকান আর্মিতেই ২০১৬ সালে ৬১৭২টি ধর্ষণের ঘটনা জানিয়েছে পেন্টাগন, চেপে গেছে কতগুলো কে জানে (NBC news)।
★ জার্মানি
২০১৫ সাল থেকে তাদের অপরাধ পরিসংখ্যানকে এই শরণার্থীদের ঘাড়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা জার্মানিতে দেখা যায়, যেন সব অপরাধ এই শরণার্থীরা এসেই করছে। এর আগে জার্মানি ছিল এক স্বর্গ। একারণে আমরা ২০১৫ সালের আগের তথ্য হাজির করব।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিবিসি Mega-brothels: Has Germany become ‘bordello of Europe’? আর্টিকেলে বলছে, জার্মানি কি ইউরোপের সোনাগাছি হতে চলেছে? সে সময় জার্মানিতে ৪ লাখ পতিতা কাজ করত, জার্মানির জন্য এটা বছরে ১৬ বিলিয়ন ইউরো কামানোর এক বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। এতবড় ইন্ডাস্ট্রি দিয়েও পোষাচ্ছে না। এরপরও সে বছর জার্মান পুলিশের নোটিশে আসা যৌন নির্যাতনের কেস ২২,৪২২টি ও শিশু যৌন নির্যাতনের কেস ১২,১৩৪টি।
জার্মানির একজন Animal welfare officer মিস Madeleine Martin বলেন Frankfurter Rundschau পত্রিকাকে যে, কল্পনার চেয়ে দ্রুতগতিতে জার্মানিতে বেড়েই চলেছে ‘পশু পতিতালয়’ (Bestiality brothel/ Animal brothel)।ফ্রি-সেক্স করে দিয়েও সামলানো যাচ্ছে না। ধর্ষণও না, বিকৃত যৌনাচারও না।
★ ল্যাটিন আমেরিকা
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের ২৪টা দেশকে ল্যাটিন আমেরিকা বলে যাদের ভাষা প্রধানত স্প্যানিশ, পর্তুগিজ বা ফ্রেঞ্চ। ৩টা বাদে বাকিগুলোতে পতিতাবৃত্তি আইন করে বৈধ।
এরপরও ২০১৭ সালে UNDP-এর Gender Mission in Latin America-র প্রধান Eugenia Piza-Lopez AFP-কে বলেন, যুদ্ধপীড়িত এলাকাগুলো বাদে নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা হচ্ছে লাতিন আমেরিকা । যৌনসঙ্গী বাদে অন্য কারও দ্বারা ধর্ষণ যদি শুধু হিসাব করি তবে, লাতিন আমেরিকা শীর্ষে।
ReVista: Harvard Review of Latin America –তে এসেছে, লাতিন আমেরিকায় ৪০ লক্ষ পথশিশু যৌনপেশায় নিয়োজিত। ভাবতে পারেন? পতিতাবৃত্তি লিগ্যাল হবার পরও এই অবস্থা!
★ কানাডা
এখন দেহবিক্রি অবৈধ। যখন বৈধ ছিল, তখন কী অবস্থা ছিল দেখা যাক। ২০০৯-২০১৪ সাল পর্যন্ত এক রিভিউয়ে কানাডা সরকারি Department of Justice বলছে, এই ৬ বছরে পুলিশের দেওয়া তথ্যে যৌন আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ১,১৭,২৩৮টি। ৫২% ক্ষেত্রেই ধর্ষক ছিল বন্ধু, পরিচিত বা প্রতিবেশী।
আর কানাডার YWCA (Young Women’s Christian Association) জানাচ্ছে প্রতি বছর কানাডায় ৪,৬০,০০০ যৌন আক্রমণ হয়। এটা ২০১৪ সালে Huffington Post-এর রিপোর্ট, তখনকার হিসাব যখন দেহব্যবসা বৈধ ছিল। কাজ তো হয়নি, ভাই।
যাদেরকে সামনে ঠেলে দিয়ে সামাজিক যৌন সমস্যার সমাধান করার প্ল্যান হচ্ছে তারা নিজেরাই বাঁচছে না ধর্ষণ থেকে। ৯টি দেশের (Canada, Colombia, Germany, Mexico, South Africa, Thailand, Turkey, United States, and Zambia) ৮৫৪ জন পতিতার মাঝে পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে আমাদের কাছে না পৌঁছানো এক আকুতি। তাদের ৭১% শারীরিক প্রহারের শিকার, আর ৬২% নিয়মিত ধর্ষণের শিকার। ৮৯% এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু তাদের আর উপায় নেই (Farley et al. 2003)
যখন স্বাভাবিক যৌনতা এতটাই সহজলভ্য হয়ে পড়বে তখন মানুষ খুঁজবে ভিন্ন কিছু। সেই ভিন্ন কিছু কী, তা জানতে আবার ‘প্যারাফিলিয়া’ অধ্যায়ের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তখন কারও লাগবে শুধু মুখমেহন, কারও লাগবে শুধু পায়ু, আবার কারও লাগবে শুধু শিশু কিংবা পশু।
কেউ পিটিয়ে ভিকটিমের কাতর চোখে খুঁজে নেবে আরও মজা। আর এই নতুন নতুন চাহিদা মেটাতে পুঁজিবাদ খুলে বসবে নতুন নতুন সব দোকান। সেখানে সাজানো থাকবে পসরা, এমন সব পসরা যা দেখে বিবেকের তলানিও শিউরে ওঠে। সব মানবতা-মূল্যবোধ-নৈতিকতার লাশের ওপর দিয়ে চলে যায় পসরার ট্রাক। তাদের প্রয়োজন শুধু মুনাফা-পুঁজি, কী গেল কী এল দেখার সময় নেই। সুতরাং সমাধান ‘হেথা নয়, হেথা নয়; অন্য কোথাও, অন্য কোনো খানে’।
