কুমিল্লা নগরী তখনো কুয়াশায় ঢাকা। একটু একটু করে ফুটছে ভোরের আলো। দূর-দূরান্ত থেকে আসছে পবিত্র কুরআনের হাফেজরা। কেউ এসেই নিজের নাম নিবন্ধন করছে। আবার কেউ মধুর কণ্ঠে তিলাওয়াত করছে। কেউ কেউ পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, কুশল বিনিময় করছে।
গতকাল শনিবার ভোররাত থেকে এই দৃশ্য চোখে পড়ে নগরীর বাদুড়তলা এলাকার নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। দিনভর সেখানে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে জাতীয় হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ‘কুরআনের নূর, পাওয়ার্ড বাই বসুন্ধরা গ্রুপ’ কুমিল্লা জোনের প্রাথমিক পর্বের বাছাই অনুষ্ঠিত হয়।
‘কুরআনের নূর’ নামে এই মেগারিয়ালিটি শো দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মুসল্লি কমিটির আয়োজনে শুরু হয়েছে দেশব্যাপী। বিভাগীয় ক্যাটাগরি হিসেবে কুমিল্লা জোনের প্রাথমিক বাছাই পর্বের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে ছয় জেলার হাফেজরা। সকাল ৭টা থেকে দুপুর পর্যন্ত ছয় শতাধিক প্রতিযোগী রেজিস্ট্রেশন করে ছয়টি পৃথক বুথে বিচারকদের সামনে পরীক্ষা দেয়।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রথম ধাপে বিচারকদের সামনে তিলাওয়াত করে দ্বিতীয় ধাপের জন্য উত্তীর্ণ হয় ৩০ জন প্রতিযোগী। সন্ধ্যায় বিদ্যালয়ের অডিটরিয়ামে শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম। সেখানে ওই ৩০ জনকে আরেক দফা বাছাই করে চূড়ান্ত করা হয় ১০ জনকে। সর্বশেষ ১০ জন থেকে বাছাই করে তিনজনকে নেওয়া হয়েছে ঢাকায়।
এই আয়োজনে বসুন্ধরা গ্রুপ ও আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়েছে লক্ষ্মীপুর সদরের জামিয়া ইসলামী হিলফুল ফুজুল কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী হাফেজ ফাহাদ হুসাইন। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে সাতসকালে কুমিল্লায় এসেছে সে। বাছাই পর্বের সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখে ফাহাদ বেশ আনন্দিত।
হাফেজ ফাহাদ হুসাইন বলে, ‘আমাদের জন্য এমন একটি আয়োজন সত্যিই আনন্দের। এ রকম বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পেরে ভালো লাগছে। আমাদের মাদরাসা থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী এসেছে। আশা করছি, আল্লাহর রহমতে সব কিছু ভালোই হবে, ইনশাআল্লাহ।’
প্রতিযোগিতার কুমিল্লা জোনের সমন্বয়ক হাফেজ কারি মোহাম্মদ মুবারক হোসেন জানান, কুমিল্লা জোনের বাছাই পর্বে অংশ নেয় কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলার প্রতিযোগীরা।
প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্বে থাকা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেম দিনভর হাফেজে কুরআনদের মিলনমেলা দেখে মুগ্ধ হন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে আসা তিনজন বিজ্ঞ বিচারকসহ মোট ১৩ জন আলেম এই প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা কুমিল্লায় এসে কুরআনের পাখিদের উপস্থিত তিলাওয়াত শুনে মুগ্ধ।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থেকে আসা হাফেজ মোহাম্মদ নাঈম বলে, ‘আমি সরাইলের হেলালিয়া হাফেজিয়া মাদরাসার ছাত্র। ভোরে কুমিল্লায় এসেছি হুজুরের সঙ্গে। বাছাই পর্বের সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখে আমি খুবই খুশি হয়েছি।’
সারা দেশে বিভিন্ন মাদরাসার অনূর্ধ্ব-১৫, পূর্ণ (৩০ পারা) হাফেজরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। হাফেজদের সম্মাননা দেওয়ার অংশ হিসেবে এই আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে আগামী পবিত্র রমজান মাসে। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকারীকে দেওয়া হবে ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে সাত লাখ, তৃতীয় পাঁচ লাখ, চতুর্থ ও পঞ্চমে দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রত্যেককে সম্মাননাও দেওয়া হবে। সেরা দশের বাকি পাঁচজনও পাবেন আর্থিক পুরস্কার ও সম্মাননা।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে অডিশন হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। খুলনা ও ফরিদপুরে (পদ্মা) অডিশন হবে ১৮ ফেব্রুয়ারি, বরিশালে ২০ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ জোনে যথাক্রমে আগামী ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি অডিশন হবে।
