সুবহানাল্লাহ, কখনো কখনো হঠাৎ করে চোখে পড়ে কোনো আয়াত বা হাদীস, যা মনের কথার সাথে মিলে যায়, তখন আনন্দ আর ধরে না।
আজকে একটি হাদীস নিয়ে কথা বলতে চাই। অনেকদিন থেকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবছি, সেটি হচ্ছে, দাওয়াতী কাজে অনেকে চায় সহায়তা করতে, কিন্তু তার সাথে আলোচনা করে বা তার কর্মকাণ্ড দেখে বুঝা যায় যে, আমি যেভাবে চাচ্ছি সেভাবে তার থেকে সহযোগিতা নেওয়া যাবে না। অথচ তাদের আগ্রহের অভাব নেই। কিন্তু তাদের আগ্রহকে কাজে লাগাতে গেলে আপনার কাজই বন্ধ হয়ে যাবে। এর বিপরীতে হাতে গোনা কিছু ভাই আছেন, যারা কাজ করতে পারেন, কিন্তু তাদের ব্যস্ততা আমাদের এ ব্যাপারে সহায়তা করে না। তবে অধিকাংশ মানুষকেই নিজের মন মতো কাজে লাগানো যায় না। বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীস চোখে পড়লো, তিনি বলেছেন,
إنما الناس كالإبل المائة، لا تكاد تجد فيها راحلة
“মানুষরা যেন শত উটের সমষ্টি, তাদের মধ্যে তুমি একটি বাহনও খুঁজে পাবে না”। [বুখারী ও মুসলিম]
অথচ উট শতটি কিন্তু বাহনের জন্য একটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। আজকাল অনেক ভাইকে দেখা যায় কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে, যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তুমি কী কী কাজ করতে পার? তাতেই কুপোকাত। দেখা যায় তার অনেক ডিগ্রি কিন্তু কাজ বলতে কিছুই পারে না। যে বিষয়ের ডিগ্রি নিয়েছে সেটিও ভালো রপ্ত করতে পারেনি। যারা প্রফেশনাল ডিগ্রি নেয় তাদের কথা যদি বাদ দিই, বাকী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যারা ডিগ্রি নিচ্ছে তাদের অধিকাংশই তাদের ফিল্ডের মূল জিনিসটি ভালো করে রপ্ত করতে পারেনি। বিশেষ করে আরবী ও ইসলামিক স্টাডিজ কিংবা শরী‘আহ বিষয়ক পড়াশুনা যারা করে তারা যদি আরবী ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করতে না পারে তাহলে তাদের জন্য এ সব বিষয়ে ডিগ্রি নেওয়াই বৃথা। কারণ তারা অচিরেই প্রথমে উস্তাদদের মাথাব্যাথার কারণ হবে, তারপর তার পরিবারের জন্য বোঝা হবে, সমাজের জন্য বোঝা হবে, রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হবে। এরা তখন দু’টি কাজ করে থাকে নিজের শিক্ষাকে ধিক্কার দেয়, নিজের উস্তাদদের সমালোচনায় ব্যস্ত থাকে, যাবতীয় দোষ কখনো নিজের পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, আর যদি আরও বেশি বখাটো হয় তখন ইসলামী শিক্ষার ওপরই তার যাবতীয় ক্ষোভ ছাড়তে দ্বিধা করে না। নিজের কারণেই নিজে কিছু শিখতে পারেনি সেটা সে অনুভব করতে নারাজ।
ইসলামের দৃষ্টিতে দীনী শিক্ষা গ্রহণকারী শুধু দীনী শিক্ষাই গ্রহণ করবে, সে সকল কিছু শিখবে না। তবে দীনী শিক্ষাকে কাজে লাগানোর জন্য অন্য কিছু সে শিখলে তাতে সমস্যা নেই। আল্লাহ বলেন,
وما كان المؤمنون لينفروا كافة فلولا نفر من كل فرقة منهم ليتفقهوا في الدين
“মুমিনরা সবাই যুদ্ধে যাবে না, তাদের মধ্যকার বড় গোষ্ঠী থেকে একটি ছোট গোষ্ঠী থাকা উচিত যারা শুধু দীনের ফিকহ বা গভীর জ্ঞান অর্জন করবে”। [আত-তাওবাহ : আয়াত ১২২]
এ ব্যাপারে আমি এককভাবে কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। কারণ বিভিন্ন কারণে এ ছাত্রগুলো তাদের ভিশন ও মিশন ঠিক করতে পারে না।
প্রথমত: তাদের পিতা-মাতা তাদের দ্বারা আয় ও বৃদ্ধ বয়সে তাদের কামাই খাওয়ার চিন্তা করে থাকে, তারা শুধু দীনের জন্য তাকে পড়ায়নি। তাদের হয়ত কাছের প্রতিষ্ঠানটি ছিল দীনী প্রতিষ্ঠান সেজন্য পড়িয়েছেন। কিন্তু সত্যিকারের দীনী শিক্ষা কেন অর্জন করতে হবে তা তারা নিজেরাও জানতেন না। বা তেমন নিয়্যতও তাদের ছিল না।
দ্বিতীয়ত: আমরা যারা শিক্ষক আছি আমরা তাদের কাছে দীনী ইলম শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য তুলে ধরতে পারি না। আমরা তাদের কাছে নিজেদেরকে আদর্শ হিসেবেও পেশ করতে পারছি না। আমাদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি ও শরী‘আহ অনুষদের কিছু ছাত্র আমাদেরকে অভিযোগ দিয়ে বলে যে, আমাদের উস্তাদগণ আমাদেরকে প্রথম দিন থেকেই বিসিএস দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে বলে। তারা যদি আমাদেরকে দীনী ইলম কেন শিখবে সেটা তুলে ধরতো তাহলে আমাদের আমাদের শিক্ষার আজ এ দূর্দশা হতো না।
এসব কারণে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান হারাচ্ছি। আমাদের সন্তানরূপী এ ছাত্ররা আমরা যখন তাদেরকে দীনী শিক্ষা গ্রহণ করতে বলি তখন আমাদেরকেই উল্টো তাদের জীবনের প্রধান শত্রু ভাবতে আরম্ভ করে। ফলে তারা তাদের বিষয়ে যথাযোগ্য জ্ঞান অর্জন না করেই একটি ডিগ্রি নিয়ে বের হয় যে ডিগ্রি তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আরবী ভাষা ও সাহিত্য থেকে বের হয়েও আরবী বলতে লিখতে ও বুঝতে পারে না। অথচ তা তার জন্য প্রাথমিক কাজ। আর ইসলাামী শিক্ষা থেকে পাস করেও সে আরবী জানে না, ইসলামী শিক্ষা বিষয়ে ভাসা ভাসা কোনো প্রকার জ্ঞান অর্জন করেই ক্ষান্ত হয়, তখন তার দ্বারা ইসলামী শিক্ষার কোনো উপকার সাধিত হয় না। আর ইসলামী ফিকহ আরও বিশেষত্বের দাবী সেটা শিক্ষা গ্রহণ করতে লাগে আরবী+ইসলামী শিক্ষা তারপর তার সাথে যোগ হবে ফিকহ ও উসূল শিক্ষা। অথচ কোথায় ফিকহ শিখবে তারা তো তার প্রাথমিক দাবী আরবীও জানে না, ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে তাদের পূর্ব জ্ঞানও নেই, তাহলে সে কিসের ওপর ভিত্তি করে ফিকহ শিখবে?
তাই আমাদের অভিভাবক শ্রণিকে বুঝতে হবে ছেলেকে দীনের গভীর জ্ঞানী বানাবেন কি না? যদি না বানাতে চান তাহলে সাধারণ দীনী জ্ঞান অর্জনের পরে তাদেরকে আর এসব বিশেষ বিভাগে ভর্তি করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি পড়াতে চান তাহলে নিয়্যতকে বিশুদ্ধ করেন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا، لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
অর্থাৎ “যে কেউ এমন কোনো ইলম শিক্ষা গ্রহণ করবে যা দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ উদ্দেশ্য হয়, সে যদি তা দুনিয়া অর্জনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।’ [আবু দাঊদ, তিরমিযী ও ইবন মাজাহ সহীহ সনদে]
আমাদের শিক্ষকগণের কর্তব্য হচ্ছে যে বিষয়ের তিনি শিক্ষক সে বিষয় শিক্ষা গ্রহণ করার বিধান ও সেটার উদ্দেশ্য ছাত্রদের মধ্যে প্রথমেই তুলে ধরা যাতে করে তারা জেনে শুনেই বড় হতে পারে। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে হতাশা ও দূরাশা কোনোটিই কাজ না করতে পারে। অনুরূপভাবে আমাদের শাসকগোষ্ঠীর উচিত দীনী ইলমের প্রচার-প্রসার করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা এবং যারা এ কাজে সময় ও শ্রম ব্যয় করবে তাদের প্রতি দায়িত্ববান হওয়া। তাদের লেখাপড়াকে খারাপভাবে চিত্রায়িত না করা, যারা খারাপভাবে চিত্রায়িত করবে বা দীনী লেখাপড়ার প্রতি অনীহা সৃষ্টিকর কাজ করবে তাদেরকে দমন করা।
পরিশেষে সবাইকে এ আহ্বান জানাবো, আপনি আমি এমন যেন না হই যে শত উট অথচ বাহনের উপযোগী কোনোটিই নয়। আমরা বেকার না হই। যা শিখেছি তা যথেষ্ট মনে না করে প্রত্যেকের উচিত নিজের বিষয়টি ভালোভাবে রপ্ত করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।
প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া হাফিজাহুল্লাহ।
