চট্টগ্রামে দুই দিনের দুর্ভোগ শেষে গতকাল সোমবার দুপুর থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। শুরুতে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও সন্ধ্যার পর বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গ্যাস না পাওয়ায় গতকালও সারা দেশে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এ কারণে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ঘন ঘন লোডশেডিং হয়েছে।
এদিকে বাসাবাড়িতে গ্যাস পাওয়া গেলেও সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে পুরোদমে গ্যাস না পাওয়ায় গতকালও নগর পরিবহনে সংকট ছিল। নগরের আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, টাইগারপাস, নিউ মার্কেট, অক্সিজেন, ২ নম্বর গেট, ওয়াসাসহ আরো কয়েকটি সড়ক ও এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সিএনজিচালিত বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার, অটোরিকশা, অটো টেম্পোসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল কম ছিল।
ঘূর্ণিঝড় মোখার কারণে গত শুক্রবার রাত থেকে মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। এতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দেয়।
চট্টগ্রাম নগরের জাকির হোসেন সড়কের নাসিরাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা মোহাম্মদ মহসিন গতকাল বিকেল ৪টার দিকে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) দুপুর ১২টার পর যখন গ্যাস ধীরে ধীরে আসা শুরু করে তার আগেই কাঠ জ্বালিয়ে দুপুরের রান্না করেছে আমার স্ত্রী। লাইনের চুলায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় দুই দিন অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।’
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, দুটি টার্মিনালের মধ্যে একটি টার্মিনাল আজ (গতকাল) দুপুরে চালু করা হয়েছে। এটি থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আরেকটি টার্মিনাল আগামী সপ্তাহের শুরুতেই চালু করা হবে বলেও তিনি জানান।
গ্যাসের সংকটে চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাসভিত্তিক সব বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মেঘনাঘাট, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসচালিত বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র গতকালও বন্ধ ছিল। এ কারণে সারা দেশে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং করতে হয় দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানিকে। এ জন্য গতকালও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ প্রায় সারা দেশেই ঘন ঘন লোডশেডিং হয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, উৎপাদন হয় ৯ হাজার ৯৮৪ মেগাওয়াট। এ সময় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল দুই হাজার ২১৬ মেগাওয়াট।
জানতে চাইলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল ইসলাম গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। বন্ধ থাকা পাইপে গ্যাসের চাপ আসতে কিছু সময় লাগছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, বিদ্যুৎ ও সার কারখানা ছাড়া সব আবাসিক গ্রাহক, শিল্প-কারখানা ও সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা হচ্ছে।
শিল্প-কারখানাগুলোতে গতকাল গ্যাস পাওয়া গেলেও চাপ কম থাকার কারণে কেউ কেউ পুরোপুরি উৎপাদনে যেতে পারেনি। জানতে চাইলে মোস্তফা হাকিম গ্রুপের পরিচালক মো. সরোয়ার আলম বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, গত শনিবার বিকেল ৪টা-৫টার দিকে গ্যাস চলে যায়। আজ (গতকাল) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গ্যাসের সরবরাহ শুরু হলেও চাপ কম থাকায় পুরোপুরি উৎপাদনে (ইস্পাত) যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে কিছু কাজ হয়েছে।
চট্টগ্রামে পরিবারপ্রতি বাড়তি খরচ চার হাজার টাকা
গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম নগরে দুই দিনে প্রতি পরিবারকে প্রায় চার হাজার টাকার মতো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ২৩৯ কোটি ২৪ লাখ চার হাজার টাকা। গতকাল কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগ ও নগর কমিটি থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
সারা দেশে ঘন ঘন লোডশেডিং
রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সারা দেশেই গত শুক্রবার রাত থেকেই ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিন-চার ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরের জেলাশহর ও গ্রামাঞ্চলে দিনে-রাতে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানি বাংলাদেশ বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। জানতে চাইলে আরইবির পরিচালক (কারিগরি) মো. রফিকুল ইসলাম গত রাতে বলেন, ‘সোমবার দিনের বেলা আমাদের দুই হাজার ৮৯ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল।’
ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিকাশ দেওয়ান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) আমাদের দিনের বেলা ৪৫০ মেগাওয়াটের লোডশেডিং করতে হয়েছে। দিনের বেলা চাহিদা ছিল এক হাজার ৭০০ মেগাওয়াট, তার বিপরীতে আমরা সরবরাহ পেয়েছি এক হাজার ২৫০ মেগাওয়াটের মতো।’
রাজধানীতে গ্যাসের চাপ কম
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গতকালও তিতাসের গ্যাসের চাপ কম ছিল। এতে গ্রাহকরা চুলায় ঠিকমতো রান্না করতে পারছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে সিএনজিচালিত গাড়ির লম্বা লাইন দেখা গেছে। গতকাল রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা, কুড়িল, রামপুরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার তিতাসের গ্রাহকরা গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্না নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে পড়ে।
মিরপুরের বাসিন্দা হিমেল হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টানা তিন দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম, চুলা জ্বললেও গ্যাসের চাপ কম থাকার কারণে এতে রান্না করা যায়নি। বাসায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির সিলিন্ডার কিনে এনে দুই দিন ধরে রান্না করা হচ্ছে। এতে আমাদের খরচ বেড়ে গেছে।’
