Wednesday, June 3, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরচা শ্রমিকরা ১২০ টাকায়ই কাজ করবে কিন্তু ১৪৫ টাকা মানছে না কেন?

চা শ্রমিকরা ১২০ টাকায়ই কাজ করবে কিন্তু ১৪৫ টাকা মানছে না কেন?

মজুরি বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু দিন থেকে ধর্মঘট করছিলেন দেশের চা শ্রমিকরা। দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি বর্তমান সময়ে খুবই নগণ্য শুধু নয়, একেবারেই নিপীড়নমূলক। তাদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট বাগান মালিকরা মজুরি বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার প্রস্তাব করে। কিন্তু শ্রমিকরা এটা মেনে নেননি।

মাত্র ২৫ টাকা মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাবকে তারা অপমানজনক মনে করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। চা শ্রমিকদের এ অনড় মানসিকতা এবং ন্যায্য দাবির বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে সর্বত্র। এ নিয়ে খোদ চা শ্রমিকদের জীবনের কিছু চালচিত্র তুলে ধরা হলো।

বাণী বাড়ৈয়ের জন্ম হয়েছিল যে চা বাগানে, সেখানেই এখন তার মায়ের সাথে কাজ করেন। এক সময় তিনি বেতন পেতেন ৭০ টাকা। সেখান থেকে হয়েছে ১২০ টাকা।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বাড়িতে ছয়জন মানুষ। দুই কেজি চাল কিনতেই এই টাকা শেষ হয়ে যায়। অন্য কিছু কেনার কথা তো ভাবতেও পারি না।’

এর সাথে বাগান থেকে প্রতিদিন আধা কেজি হারে চাল বা আটা রেশন পান। কিন্তু সেটা তার পরিবারের চাহিদার তুলনায় কিছুই না।

নিজের পিতামাতা যেভাবে টানাটানির সংসারে জীবন কাটিয়েছেন, বাণী বাড়ৈয়ের নিজের সংসারেও সে অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

তার মতোই এক লাখ ৪০ হাজার চা শ্রমিক প্রতিদিন মাত্র ১২০ টাকা মজুরিতে বাংলাদেশের ১৬৭টি নিবন্ধিত বাগানে কাজ করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সম্প্রতি মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করলে চা বাগান মালিক বা সরকারি তরফ থেকে মাত্র ২৫ টাকা মজুরি বাড়ানোর যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, একটি অংশ তা মানলেও শ্রমিকদের আরেকটি অংশ ক্ষোভে আর অভিমানে তা মানতে রাজি হননি। তারা বলেছেন, ১৪৫ টাকা মজুরির প্রস্তাবে রাজি হওয়ার বদলে তারা পুরনো মজুরিতেই কাজ করবেন।

শ্রীমঙ্গলের একজন চা শ্রমিক মোহন মুন্ডা বলছিলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। আগের টাকাতে কোনোভাবেই আমাদের জীবন চালানো যায় না। মাত্র ২৫ টাকা বাড়ালে আমাদের কী হবে? দরকার নাই আমাদের।’

প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, মজুরি সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে শ্রমিকরা পুরনো ১২০ টাকা মজুরিতেই আপাতত কাজে ফিরেছেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মজুরির বিষয়টি নির্ধারিত হবে।

গত ৯ আগস্ট থেকে দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে ধর্মঘট শুরু করে চা বাগানগুলোর প্রায় সোয়া লাখ শ্রমিক।

সে সময় প্রতিদিন দু’ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করলেও, ১৩ আগস্ট থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেন।

এর আগে ১৪৫ টাকা মজুরিতে শ্রমিকদের একটি অংশ ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও বেশিরভাগ শ্রমিক তাতে রাজি হননি।

কমলগঞ্জের একটি চা বাগানের একজন নারী শ্রমিক বলেন, ‘ধর্মঘট তারা কিভাবে তুলছে আমরা তো জানি না। তারা (শ্রমিক নেতৃবৃন্দ) তাদের মনমতো অবরোধ ডাকলো, এই ১০টা দিন আমাদের রাস্তায় রাস্তায় নাচালো। এখন তাদের ইচ্ছামত যদি তারা অবরোধ তুল দেয়, তাদের মতো বড় মীরজাফর, বড় বেঈমান কে আছে বাংলাদেশে?’

শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সর্বশেষ ২০২০ সালে যখন চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বাগান মালিকদের সংগঠন চা সংসদ মজুরি নিয়ে চুক্তি করেছিল, সেসময় মজুরি বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সে প্রতিশ্রুতি ১৯ মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি।

তবে মালিকদের সংগঠন বলছে, ৩০০ টাকার প্রতিশ্রুতি কখনো দেয়া হয়নি। তাদের কথা, শ্রমিকদের যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়, তা ৩০০ টাকার চেয়ে বেশি।

তবে মালিকদের এই যুক্তি মানতে রাজি নন শ্রমিকরা।

চা বাগার শ্রমিক সীমা মাহালী বলেন, ‘না হয় বাগানের জমিতে থাকি, কিন্তু ঘরের মেরামতের খরচ আমাদের। কাপড় কিনতে হয়, বাচ্চাদের পড়ালেখা করাতে হয়, চাল-ডাল সবজি কিনতে হয়। এই ১২০ টাকায় কি এতো কিছু হয়?’

‘তারা যে বলে রেশন দেয়, এটা দেয়, সেটা দেয়, প্রতিদিন মাত্র আধা কেজি চাল বা আটায় একটা পরিবারের কী হয়? তিন বেলা বাচ্চাদের ভাত-রুটি দিতে পারি না। সপ্তাহে একটি মাছ-মাংস হয় না। আমরাও তো মানুষ, নাকি?’

শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে প্রতিদিন ১২০ টাকা দৈনিক মজুরির বাইরে সপ্তাহে সাড়ে তিন কেজি চাল বা আটা দেয়া হয়। এছাড়া বাগানের জায়গায় থাকার জন্য বাঁশ, কাঠ, টিন আর এককালীন ৪-৫ হাজার টাকা দেয়া হয়, তবে ঘর শ্রমিকদের নিজেদের তুলে নিতে হয়।

সাধারণত একজন চা শ্রমিককে প্রতিদিন অন্তত ২০ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। চারাগাছ হলে অন্তত ১৬ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে হয়। এর বেশি সংগ্রহ করতে পারলে কেজি প্রতি চার থেকে পাঁচ টাকা বাড়তি পাওয়া যায়।

মাধবপুরের একজন বাসিন্দা রাজকুমার দাসের স্ত্রী ও মা চা বাগানে কাজ করেন। তিনি নিজে একটি বাগানে পাহারাদারের কাজ করেন। তিন সন্তান নিয়ে পরিবারে মোট ছয়জন। যে টাকা আয় হয় তাতে জীবনযাপন করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, সকালে চা জ্বাল দিয়ে খেয়েছেন। দুপুরে খাবেন রুটির সাথে চা পাতার ভর্তা। রাতে হয়তো ডাল-ভাত আর আশেপাশের ক্ষেতখামার বা জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা কচু শাক।

এভাবেই দিনের পর দিন তাদের খাওয়া চলে। কখনো মাসে একদিন, কখনো দুই মাসে একদিন মাছ বা মাংস রান্না হয়।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের একজন নেতা রামভজন কৈরি বলেন, এখনকার যে মজুরি সেটি দিয়ে একজন শ্রমিকের নিজের সব মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় না।

তিনি বলেন, ‘১২০ টাকায় দুই কেজি চাল কিনতে পারবো আমি, এখন ৪-৫ জনের একটা পরিবারে দিনে দুই কেজি চাল তো মিনিমাম লাগবেই। তাহলে তারা তো আমার সবজির কথা বলে নাই, পোশাক-আশাক, সন্তান লালন-পালন, তাদের লেখাপড়ার কথা বলে নাই।’

আরেকজন শ্রমিক প্রদীপ রবিদাস বলেন, ‘পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে আমার বাপ-দাদারা এখানে এসেছিল ভালো থাকার আশায়। কী পেয়েছি আমরা?’

‘মানুষ কাজ করে টাকা-পয়সা জমায়, সঞ্চয় করে, সম্পত্তি করে। আমাদের চা শ্রমিকদের তো জীবনই চলে না। আমাদের বাপ-দাদাদের যে অবস্থা ছিল, আমাদের কেউ তার চেয়ে ভালো নেই। সন্তানরা ফ্রি স্কুলে পড়ে, কিন্তু তাদের পরবর্তী ভালো স্কুল-কলেজে পড়ানোর মতো কারও ক্ষমতা নেই। রোজকার খাওয়াটাও ঠিক মতো হয় না।’

‘বহুবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তাই আমরা বাধ্য হয়ে পথে নেমেছি,’ তিনি বলেন।

এই শ্রমিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ২০-২৫ টাকা বেশি নয়, তাদের ন্যায্য মজুরি না দেয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন থেকে সরে যাবেন না। প্রধানমন্ত্রী কী সিদ্ধান্ত দেন, সেটা দেখার জন্য তারা কিছুদিন অপেক্ষা করবেন।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৬৭টি নিবন্ধিত চা বাগান রয়েছে। এর বড় অংশটি সিলেট, হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার এলাকায় অবস্থিত।

সূত্র : বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

sixteen + two =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য