দেশের নামিদামি চক্ষু হাসপাতালে আমার চোখ দেখিয়েছি; কিন্তু সেখানকার অত্যাধুনিক যন্ত্র আমার চোখে কোনো সমস্যা খুঁজে পায়নি। চক্ষু চিকিৎসার ওপর বড়সড় রকমের ডিগ্রিধারী ডাক্তারও আমার চোখ দেখে বললেন যে আমার চোখ বেশ ভালো আছে। বিজ্ঞানের অত্যাধুনিক যন্ত্র আর ডিগ্রিপ্রাপ্ত ডাক্তার আমার চোখে সমস্যা খুঁজে না পেলেও আমি তো জানি আমার চোখ কী পরিমাণ অসুস্থ।
আমার চোখে রয়েছে এমন এক অদ্ভুত অসুখ, যা শনাক্ত করার মতো ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের নেই।
ডাক্তারের ওষুধ কিংবা চশমা কখনো সেই অসুখ সারাতে পারবে না। দুনিয়ার কোনো অত্যাধুনিক যন্ত্র এই অসুখ খুঁজে পাবে না। কারণ এই অসুখের কেন্দ্রস্থল চোখের কর্নিয়া নয়, বরং বক্ষস্থিত হৃদয়। এ রোগে আক্রান্ত হলে ইবাদতের স্বাদ কমে যায়।
নষ্ট হয়ে যায় আমলের রুচি।
‘আমি’ একজন সুন্দরী মেয়ে দেখলেই বলি দোস্ত, আমি না অমুকের ওপর ক্রাশ খেয়েছি। ক্রাশ খাওয়া মানে মেয়েটার রূপ দেখে পাগল হয়ে যাওয়া। আমার রাতগুলো কেটে যায় তার সেই রূপের কথা ভাবতে ভাবতে।
আমার মন খালি আনচান করে তাকে একনজর দেখার জন্য। আমার চোখে সে-ই হলো রানি। অথচ আল্লাহ পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট করে বলেছেন, ‘হে রাসুল, মুমিন পুরুষদের বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)
আমাকে জানতে হবে, কোনো বেগানা নারীর দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকার অনুমতি আমাকে দেওয়া হয়নি। বরং হাদিসে বলা হয়েছে, কোনো নারীর দিকে দৃষ্টি চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তা ফিরিয়ে নিতে।
ভুলেও দ্বিতীয়বার যেন চোখ তুলে না তাকানো হয়। কারণ দ্বিতীয়বার তাকানোতে শয়তানের কুমন্ত্রণা থাকে। শয়তান তখন মনের ভেতরে কুমন্ত্রণা দেয় আর করিয়ে নেয় বিভিন্ন ধরনের পাপকাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)-কে বলেন, ‘হে আলী, কোনো নারীকে (অনিচ্ছায়) একবার দেখার পর দ্বিতীয়বার আর দেখবে না। কেননা তোমার জন্য প্রথমবার দেখার অনুমতি আছে, দ্বিতীয়বার নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৪৯)
বিদায় হজে ফজল ইবনে আব্বাস (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাহনের পেছনে বসা ছিলেন। এ অবস্থায় খাসআম গোত্রের এক মহিলা এসে তাঁর কাছে ফতোয়া জানতে চাইলেন। ফজল (রা.) নারীর দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন আর নারীও তাঁর দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে ফজলের চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৮০৯)
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘চোখের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ১৯)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আয়াতটিতে এমন এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে সুন্দরী মহিলার দিকে বারবার চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকায়। যখনই তার এই কাজ কারো নজরে পড়ে যায়, তখন সে চোখ নামিয়ে ফেলে, এরপর আবার যখন সে সুযোগ পায় তখন আবার ওই সুন্দরী মহিলার দিকে তাকায়।’ (আল জামে লি আহকামিল কোরআন লিল কুরতুবি : ১৫/৩০৩)
আমরা যেটাকে ক্রাশ বলছি, রাসুলুল্লাহ (সা.) সেটাকে চোখের জিনা বলেছেন। এ রোগ সারার একমাত্র প্রেসক্রিপশন হলো, আল্লাহকে ভয় করা, তাওবা করা, মনের ভেতরে সুরা জিলজালের কথাগুলো গেঁথে রাখা—
‘অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে তা সে (বিচার দিবসে) দেখতে পাবে। আবার কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তা-ও সে দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭৮)
‘আমি’ আজ যে মেয়ের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছি, যে মেয়ের ওপর ক্রাশ খাচ্ছি, যে নারীকে নিয়ে মৌজ-মাস্তি করছি, তা আমার আমলনামায় উঠে যাচ্ছে। উন্নত চক্ষু হাসপাতালের অত্যাধুনিক যন্ত্রে হয়তো এই রোগ ধরা পড়বে না; কিন্তু পুনরুত্থান দিবসে আমার সামনে আমার সব কৃতকর্মকে উপস্থাপন করা হবে। ক্ষুদ্র পাপ থেকে বড় পাপ সব কিছু আমার সামনে হাজির করা হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে চোখের হেফাজত করার তাওফিক দান করুন।
