মুসলিম বিশ্বের আধুনিক ও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী—যারা বয়সে তরুণ এবং যাদের হাতে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ তাদের বিপথগামিতা, অমূলক সংশয়, নৈরাশ্য ও ধর্মবিমুখতার একটি কারণ হলো সেই স্থবিরতা ও অস্থিরতা, যা ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্রগুলো ও এর প্রতিনিধিদের ওপর দীর্ঘকাল থেকে প্রভাব বিস্তার করে আছে। এই স্থবিরতা ও অস্থিরতার কারণে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান তারা ধারণ করে আছেন তা বিকাশ ও উন্নতির পূর্ণ সম্ভাবনা রাখা সত্ত্বেও স্বীয় আবেদন, যোগ্যতা ও উপকারিতা হারিয়েছে। এবং তা পরিবর্তনশীল জীবনধারা পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উপযোগিতা সৃষ্টি করতে পারছে না। তারা কাজের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করতে পারছেন, যা এই সংকটময় সংগ্রামমুখর সময়ে প্রয়োজন ছিল।
বিজ্ঞাপন
অথচ ইসলামী শিক্ষার পুরনো পাঠ্যক্রম অতীতে বারবার পরিবর্তন গ্রহণ করেছে এবং তা চলমান জীবনের সহচর হিসেবে অবদান রেখেছে।
এটা ঠিক সে সময় পরিবর্তন একটা নির্ধারিত বিরতির পর আসত এবং শিক্ষার মৌলিক পদ্ধতিতে বিশেষ কোনো পার্থক্য দেখা যেত না। এসব পরিবর্তন শাসকবর্গ ও তাদের নিযুক্ত ব্যক্তিদের নামে হলেও তা মূলত পাঠ্যক্রম প্রবর্তনকারী ও শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বশীলরাই করতেন। এ ক্ষেত্রে তারা সব সময় নিজেদের প্রতিভা ও ব্যুৎপত্তির প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁরা চেষ্টা করেছেন পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের দ্বারা শিক্ষাক্রমকে যুগোপযোগী রাখতে।
কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে শাসক পরিবারের পরিবর্তে যখন সভ্যতা, চিন্তাধারা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন সূচিত হলো এবং এই বিপ্লবের প্রসার ও তীব্রতা আগের সব সীমা অতিক্রম করে গেল, তখন পাঠ্যক্রম একই স্থানে স্থবির থেকে গেল এবং তাতে প্রয়োজনীয় সব পরিবর্তন ও পরিবর্ধনকে অস্বীকার করা হলো। পাঠ্য বিষয়, পাঠ্য তালিকাভুক্ত কিতাবাদি ও শিক্ষা পদ্ধতি—প্রতিটি ব্যাপারে প্রচলিত দরসে নিজামির ওপর জেদ ধরা হলো। ভারতে তার প্রবর্তন করেছিলেন মোল্লা নিজামুদ্দিন লাখনভি (রহ.) এবং খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতকে মধ্যপ্রাচ্যে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমরা স্থাপন করেছিলেন। ফিকহ ও ইসলামী আইনে প্রশস্ততা আনয়ন করা হলো না, যদিও ওই সব নতুন বিষয় বা নতুন আবিষ্কার ও নতুন অর্থনৈতিক বিবর্তন ও নতুন ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের জন্য ইজতিহাদ করা আবশ্যক ছিল; কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে তা করা হয়নি। ইজতিহাদ যা কিছু শর্তসাপেক্ষে কোনো অবস্থায় প্রাজ্ঞ আলেমদের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও পরিবর্তিত সময়ে পথপ্রদর্শনের উপায় ছিল, কার্যত তার দ্বারা বন্ধ হয়ে গেছে। খ্যাতিমান আরব আলেম মোস্তফা আহমদ জুরকা সুন্দর বলেছেন, ‘আলেমদের জন্য ইজতিহাদের দুয়ার খোলা, তা কখনো নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু যে পরিচয় দিয়ে তারা তা খুলতে পারতেন তা দীর্ঘনদিন ধরে হারিয়ে গেছে। ’
ইসলামী জ্ঞান, কোরআনের জ্ঞান ও ইসলামী শরিয়তের জন্য যে শক্তিশালী, মর্মস্পর্শী, হৃদয়গ্রাহী ও চিত্তাকর্ষক ব্যাখ্যা ও বিবরণের এবং আধুনিক যুগের ভাষা ও সাহিত্যের পদ্ধতি-রচনাশৈলী প্রয়োজন ছিল, তা যদিও বিরল নয়; তবে দুষ্প্রাপ্য নিশ্চয়ই। এমন আলেম খুব কম দেখা যায়, যাঁরা এসব ধর্মীয় তত্ত্বের চিরন্তন হওয়ার, জীবনের জন্য উপযোগী হওয়ার এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতার চিত্র আধুনিক শ্রেণির লোকদের মন-মস্তিষ্কে স্থাপন করতে পারেন। পরিপূর্ণ জ্ঞানগত দক্ষতা ও যুক্তির সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ করে আধুনিক সভ্যতার জাদুকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারেন।
