দখলদার ইসরাইলের হামলায় গাজা কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। স্কুল, বাসস্থান থেকে হাসপাতাল: নেতানিয়াহুর হামলা থেকে ছাড় পায়নি কিছুই। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) যে এলাকাগুলিতে সহায়তা দিচ্ছে, সেখানে একাধিক রক্তক্ষয়ী হামলা হয়েছে, সংঘর্ষে প্রাণ গিয়েছে অনেকের। অ্যামনেস্টি-সহ একাধিক সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়েছে জিএইচএফ-এর ভূমিকা।
তবু ইসরাইলি হামলা যাদের প্রাণ কেড়ে নিতে পারেনি, তাদের তো বাঁচতে হবে! তাই ‘এইড সাইট’-এর দরজা খোলার অনেক আগে, সূর্য ভালো ভাবে উঁকি মারারও আগে তারের বেড়ার পিছনে লাইন দেন গাজার মানুষ। কারও হাতে প্লাস্টিকের বাটি, কারও সঙ্গে জিএইচএফ-এর দেওয়া বিভিন্ন নথি। খাবারের অপেক্ষা তাদের। ড্রোন ফুটেজে এমনই এক এলাকায় দেখা মিলেছে, মার্কিন সেনার সাবেক কিছু সদস্যের। পোশাকে বাহিনীর ব্যাজ নেই, রাইফেলের নলও মাটির দিকে। সাইটে দাঁড়ানো ট্রাকের খাবার বিতরণে স্থানীয় শ্রমিকদের নির্দেশ দিচ্ছেন তারা। তবে কি গাজায় সেনা পাঠাল আমেরিকা? ‘ইনসিগনিয়া’ বা সেনার ব্যাজ-এমব্লেম বর্জিত পোশাক পরা মানুষগুলো ইউএসেরই সংস্থা ‘ইউজি সলিউশনস’-এর কর্মী। গাজায় কাজ শুরু করেছে তারা। জিএইচএফ-এর একাধিক ত্রাণকেন্দ্রে ইউজি-র লোকজনকে দেখা যাচ্ছে। গাজায় বেশ কিছু নতুন নিয়োগও করছে তারা। ইউএস আর্মির এক সাবেক অফিসারের দাবি, অক্টোবরের শেষে তার কাছেও প্রস্তাব আসে। কোনও এক জায়গায় ডিউটির জন্য দিনে ৮০০ মার্কিন ডলার, মোবাইল ডিউটিতে এক হাজার এবং স্টেডি অ্যালাওয়েন্স হিসেবে ১৮০ ডলারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তাকে। যদিও ‘প্রচুর আবেদন জমা পড়েছে’ জানিয়ে ওই সাবেক অফিসারকে আর নিয়োগ করা হয়নি।
ত্রাণের লাইনে এ বছর মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে ২,৬০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, আহত ১৯ হাজারের বেশি। ইউজির দাবি, ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টেবিলাইজেশন ফোর্স’ (আইএসএফ) এর সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে ওই এলাকার নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করবে তারা। এই বাহিনী আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’-এর অধীন। অভিজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হলো, গাজা পুনর্গঠন, সুরক্ষা, অর্থনৈতিক পলিসি এবং ত্রাণ বিতরণে একচ্ছত্র অধিকারী ওই বোর্ড। ফিলিস্তিনের একাধিক গোষ্ঠী কিন্তু গাজার ক্ষেত্রে মার্কিন পরিকল্পনা স্বীকার করতে নারাজ। অথচ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সায় দিয়েছে। ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলির বক্তব্য, নিধন-যজ্ঞ চালিয়েও ইসরাইল যে উদ্দেশ্য সাধিত করতে পারেনি, আমেরিকা ঘুরিয়ে সেটাই করবে।
এই আবহে সরাসরি মার্কিন বাহিনী মোতায়েন না করে ইউজি–র মাধ্যমে ট্রাম্পের দেশ একই পথ ধরেছে বলে অভিযোগ। সুরক্ষা দেওয়ার নামে তারা ঘাতক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সংবাদসংস্থা এপি-সহ একাধিক সূত্রে খবর, প্ররোচনা ছাড়াই ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের উপরে গুলি, গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র প্রয়োগ করছেন সংস্থার সদস্যরা। কার্যত সমস্ত ত্রাণবিলি কেন্দ্রেই এক চিত্র। একটি সংস্থার দাবি, জিএইচএফ-এর বিতরণ কেন্দ্রগুলি তো ‘কিলিং ফিল্ড’-এ পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ঙ্কর, ইউজি-র এক গার্ড জুলাইয়ে ইস্তফা দিয়ে জানান, ত্রাণকেন্দ্রগুলি ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সেখানে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ চলছে নির্বিচারে। ইসরাইল-হামাস সংঘর্ষবিরতির পরেও নেতানিয়াহুর সরকার হামলা চালিয়েছে এবং ত্রাণের ট্রাকও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ বলেও অভিযোগ ইউজি-র বিরুদ্ধে। যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে সংস্থার দাবি, মানবাধিকার সংগঠন বলতে যা বোঝায়, তারা ঠিক তেমনটা নয়। শিশুপাচার রোধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কর্মরত, ইউএসের অলাভজনক সংস্থা ‘দ্য সেন্টিনেল ফাউন্ডেশন’ থেকে এদের জন্ম।
বিবিসির খবর, গাজায় কর্মরত ইউজি-র ৩২০ কর্মীর মধ্যে কমপক্ষে ৪০ জন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাইকার গ্যাংয়ের সাবেক বা বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অনলাইনে বেশ ঘনঘন মুসিলম-বিরোধী পোস্টের অভিযোগ রয়েছে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। সেই গ্যাংয়েরই জনি ‘তাজ’ মালফোর্ড গাজার কাজের নেতৃত্বে। তার শরীরে ‘ক্রুসেডার ক্রস’ (জেরুসালেম থেকে বিশ্বের চার প্রান্তে খ্রিস্টধর্ম ছড়িয়ে পড়ার প্রতীক) এবং ‘১০৯৫’ (মধ্যযুগে প্রথম ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের বছর)-এর ট্যাটু আঁকা। সদস্যদের অনেকে গাজার মরুভূমিতে রাইফেল নিয়ে পোজ দিয়ে ছবিও তুলেছেন, সঙ্গের ব্যানারে লেখা : ‘মেক গাজা গ্রেট এগেন’। বিভিন্ন সময়ে শুয়োরের রোস্ট থেকে মহিলার বোরখা ছেঁড়ার ছবি তুলে ধরেছে তারা। ইসলাম-ধর্মাবলম্বী এলাকায় এদের এ ধরনের সক্রিয়তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে। ইউজি-র কাজকর্ম ও পানি-খাবার প্রত্যাশী ফিলিস্তিনির উপরে তাদের হামলার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রশাসনকে আহ্বান জানিয়েছে ‘দ্য কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস ইন নর্থ ক্যারোলাইনা’। সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর, দ্য নিউজ লাইন।
