ক’দিন আগের প্রবন্ধে লিখেছিলাম, ‘দেশের অর্থনীতিতে অশনি সঙ্কেত’। এখন বোধকরি, অশনি সঙ্কেত বলার সময় শেষ; অর্থনৈতিক সঙ্কট শুরু হয়ে গেছে; চলছে। মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল; টাকার মান কমছে লাফিয়ে লাফিয়ে; দ্রব্যমূল্য বাড়ছে লাফিয়ে; আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়ছে প্রতিদিন। সুতরাং এরই মধ্যে আসা সঙ্কট মোকাবেলা এবং আরো সঙ্কট না আসার আগাম প্রস্তুতি নেয়ার সময় এখন।
এত দিন যেসব বিশেষজ্ঞ যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন ‘আমার প্রিয় দেশ কক্ষনো শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির মতো হবে না,’ তাদের গলার স্বর এখন কিছুটা নমনীয়; ভেতরে ভেতরে সঙ্কট মোকাবেলার পদ খুঁজছেন। তবে এ কথা সত্যি, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে; প্রথমত, আমাদের জনসংখ্যা অনেক বেশি যাদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বিদেশে কর্ম করে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায়; ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সব সময়ই থাকবে; আছে। তবে বিপুল জনসংখ্যার এ দেশটির জন্য নতুন নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করা দরকার। প্রবাসে শ্রমিক পাঠানোতেও রয়েছে অনেক অব্যবস্থা; এ অব্যবস্থা দূর করে, প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্ট শিল্প, যার পণ্য রফতানির মাধ্যমে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে। এ খাতটির ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে; নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের তেলের মতো কিছু খনিজসম্পদ রয়েছে যদিও প্রয়োজনের চেয়ে তা অনেক কম। পাশাপাশি, আমাদের কৃষি সেক্টরও অনেক সমৃদ্ধ।
শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশের কিছু মিলও রয়েছে, যেমন বিরোধী দলবিহীন সরকারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ, দুর্নীতি, লুটতরাজ, টাকা পাচার ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় মিল হলো, উন্নয়নের নামে দেশী-বিদেশী ঋণ করে অনেক অপ্রয়োজনীয় অথবা কম প্রয়োজনীয় মেগা প্রজেক্ট, মেগা দুর্নীতি, মেগা অর্থ পাচার ইত্যাদি। এর সাথে যোগ হয়েছে, মেগা প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় নেয়া; ফলে বাস্তবায়ন খরচ যেমন বেড়ে যায় বহুগুণে, তেমনি প্রকল্প থেকে বেনিফিট আসতে সময় লাগে অনেক বেশি। এ কথা সত্যি, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দেশের জিডিপির ৪১ ভাগ, যা আন্তর্জাতিক মানে বিপজ্জনক নয়; তবে গত ক’বছরের ঋণের প্রবৃদ্ধি বিপজ্জনক; মাত্র ক’বছরে ঋণ বেড়েছে বহুগুণে। সুতরাং এখনই বৈদেশিক ঋণ নিয়ে মেগা প্রজেক্ট হাতে নেয়া বন্ধ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় পণ্যাদি আমদানি বন্ধ করতে হবে; পাশাপাশি, দেশে প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এর সাথে পণ্য রফতানি বাড়ানোর জোর উদ্যোগ নিতে হবে; পণ্যের নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে।
শুধু শ্রীলঙ্কা নয়, বরং সারা বিশ্বের অর্থনীতির সাথে আমাদের বর্তমান অর্থনীতির একটি সাধারণ মিল হলো, করোনা অতিমারীর প্রভাব শেষ না হতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ; এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এ যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববাজারে বেশ কিছু পণ্যের জোগানে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে মূলত উৎপাদন এবং সরবরাহ চেইনে সমস্যার কারণে। ফলে দেশে ওই সব পণ্যের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দুর্ভাগ্যক্রমে, ওই প্রতিটি পণ্যই বাংলাদেশের অতিপ্রয়োজনীয় আমদানি পণ্য। যেমনÑ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অতিমূল্যের প্রভাবে এরই মধ্যে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। দেশেও তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় দেশীয় পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও দেশের বাজার যেভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে, সরকার কার্যত তা সামাল দিতে পারছে না। রাসায়নিক সার ও গম বেশি দামেও আমদানি করা যাবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এ কথা সত্যি যে, দেশের রফতানি আয় কোভিড-পরবর্তী সময়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। তবে এই আয়বর্ধন আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ব্যতিক্রম ছিল রেমিট্যান্স আয়; করোনার অতিমারীর সময়ও এটি বাড়ছিল অথচ এখন রেমিট্যান্স আয় না বেড়ে বরং কমছে। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে দ্রæত চাপ পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর। এরই সাথে সামনে মধ্যমেয়াদি সময়ে মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য নেয়া ঋণ পরিশোধের পরিমাণও দ্রæত বাড়বে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাজারে ছেড়ে ডলারের মূল্য কমিয়ে রাখা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখতে হবে। এ সময় দেশে ডলারের দাম বাড়াটা অভ্যন্তরীণ বাজারের মূল্যস্ফীতিতে আগুনে তেল ঢালার মতোই হতে পারে। উন্নয়ন নয় বরং এখন নিম্ন, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার ওপর মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব লাঘব করার আগাম প্রস্তুতি নেয়া জরুরি; এ জন্য আসছে বাজেটে যথেষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে; প্রশ্ন হলো যথেষ্ট বরাদ্দ রাখার সুযোগ কতখানি? দেশের কৃষি খাতকেও পাশাপাশি বাঁচিয়ে রাখতে হবে; সে জন্য সারের ওপরও বড় ধরনের ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হতে পারে। বাজেটে মেগা প্রকল্পে, এমনকি উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পে আপাতত বরাদ্দ না রেখে আপৎকালীন অবস্থা মোকাবেলার জন্য বাজেটে সাধ্যমতো বরাদ্দ রাখাই সমীচীন।
অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় অথবা কম প্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এ দেশের একটি কালচার হয়ে উঠেছে; এতে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়। আশার কথা সরকার এরই মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে; এখন প্রয়োজন পদক্ষেপের বাস্তবায়ন। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, গেল দশকে দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ১১ লাখ কোটি টাকা; এর কিয়দংশও যদি এখন ফিরিয়ে আনা যায়, এই বিপদের সময় দেশের বড় উপকার হবে।
রাজস্ব সংগ্রহ এ দেশের সরকারের বাজেটের একটি চিরাচরিত ও প্রধান সমস্যা। বহু বড় বড় ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ কর ফাঁকি দেন। রাজস্ব সংগ্রহেও রয়েছে অনেক দুর্বলতা, অসততা। মধ্যবিত্তরা যেভাবে ট্যাক্স দেয় উচ্চবিত্তদের ট্যাক্স দেয়ার হার এর চেয়ে অনেক কম। দেশী-বিদেশী ঋণের ওপর ভিত্তি করে বিশাল বাজেট প্রণয়নে কোনো কৃতিত্ব নেই। এর সাথে কোভিড অতিমারীর ধাক্কা সামলানো এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পের কারণে সরকারের সুদ পরিশোধের দায় বেড়ে যাচ্ছে, আরো বাড়বে। দেশী ও বিদেশী ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ রাজস্ব আয়ের একটি বড় ও ক্রমবর্ধমান অংশ চলে যাচ্ছে।
বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর মেগা প্রকল্পের সুদ-আসল পরিশোধ করতে গিয়ে আমরা শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থানে যাচ্ছি কি নাÑ এ নিয়ে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে বাংলাদেশের ম্যাক্রো অর্থনীতির বর্তমান সূচকগুলোর বিচারে এখনই শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হবে বলে মনে হয় না। এর পরও শ্রীলঙ্কার মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে, কিভাবে ব্যয় সাশ্রয়, সম্পদের অপচয় রোধ এবং প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ণয় করা যায়। উল্লেখ্য, ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্প গ্রহণ নিছক জনতুষ্টির উন্নয়নের বুলি আওড়ানোর জন্য হতে পারে না, বরং এগুলোর সত্যিকারের সফলতা নির্ভর করবে এর থেকে দেশ কী বেনিফিট পেল, এর ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কতখানি আকৃষ্ট করা গেল, তার ওপর। আমার মনে হয়, মেট্রোরেল, এলিভেটেড রোড, পাতাল রেল, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্প বাংলদেশের সার্বিক সক্ষমতার বিচারে উপকারী হলেও জরুরি নয়; বরং রফতানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেলে পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধের জন্য বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর আর চাপ পড়বে না।
গত দশকের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে, ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার সময় খাদ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় টানাপড়েনে পড়েছিল। তেমনি একটি অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে দেশ। তবে এটি দেশীয় অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থার কারণেই হচ্ছে বলে মনে হয়। আশার কথা, অর্থনীতিতে এ ধরনের ঝাঁকুনি খেলে টেকসই প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে কাঠামোগত মৌলিক প্রতিবন্ধকতাগুলো থাকে তার দিকে নজর দেয়া যায়। সুতরাং আগামী দিনে উন্নয়ন ব্যয়ে অনেক সাশ্রয়ী হতে হবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ অবশ্যই জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি জোর দিতে হবে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও নগরায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, জনস্বার্থ রক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকে যদিও এসবের জন্যই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অর্জনের খরচ ক্রমেই বেড়ে যাবে।
পরিশেষে বলতে হয়, অর্থনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতেই হয়, তবে তার জন্য দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও জরুরি। দেশের সব মতের মানুষকে সাথে নিয়েই এ অবস্থা মোকাবেলা করতে হবে; অন্যথায় শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক দেউলিয়াপনার পাশাপাশি রাজনৈতিক অব্যবস্থাও দেখা দিতে পারে।
