ওয়েস্টার্ন রেডিক্যাল নারীবাদ আর ফারজানা আপাদের “কুরআন সুন্নাহ সম্মত নারীবাদ” এর মাঝে একটা পার্থক্য হইলো, ওয়েস্টার্ন নারীবাদ আন্দোলন শুরুই হইছে ধর্মীয় গ্রন্থাবলী ও যাজকতন্ত্ররে বাদ দিয়া। এগুলোর বিরুদ্ধেই সবার আগে দাঁড়ানো লাগছে তাদেরকে। এই দিক দিয়া ফারাজানা আপারা একধাপ পিছনে আছনে। উনারা এখন পর্যন্ত,বাহ্যিকভাবে হলেও,কুরআন হাদিসরে মূল হিসেবে ধরেই নারীবাদ করতেছেন। শুরুতেই কুরআন হাদীস কে বাদ দিয়া দেন নাই, তাহলেতো আউট অফ কনটেক্সট থাকতেন। বরং কুরআন হাদিসের সাথে যথাসম্ভব মানাইয়া নেয়ার জন্য একপ্রকারের অসম কুস্তি খেলায় নেমেছেন এইসব টেক্সটের সাথে।
এইটা হইলো ইসলামি নারীবাদের বিগিনার স্টেজ,পয়লা ধাপ। এই স্টেজে এসে উনাদের মনে হবে,কুরআন হাদীসের মূল টেক্সট ঠিক আছে,সমস্যা নাই,সমস্যা এসবের প্যাট্রিয়ার্ক্যাল বা পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। যেহেতু পৃথিবীর ইতিহাস হইলো পুরুষতন্ত্রের ইতিহাস,পুরুষ ডমিন্যান্ট দুনিয়ায় ইসলামের সবকিছুও যে পুরুষ কেন্দ্রিকই হবে,এটা উনারা ধরেই নিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ ও রাসুলের কথার বাইরে বাকি সবার কথা আপাতত গোনায় ধরতেছেন না তার। তা তিনি যত বড় তাবেঈ হোন আর ইমাম মুজতাহিদই হোন। তিনি মূলত পুরুষ,এবং তার দৃষ্টিভঙ্গিও পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারী দৃষ্টিভঙ্গি। সুতরাং কুরআন ও হাদিসের সর্ব যুগে সর্বজনে গৃহিত, স্বীকৃত যে ব্যাখ্যা,অর্থ,বিশ্লেষণ আছে,এসবের দিকে আপাতত না তাকালেও চলবে। সকল ব্যাখ্যার রিফর্মেশন, রিকনস্ট্রাকশন লাগবে,এবং সেটা হবে (ওয়েস্টার্ন রেডিক্যাল) নারীবাদের কাঠামো তে।
আপনি যতক্ষণ না নারীবাদের চশমা লাগিয়ে কুরআন হাদিস পাঠ করবেন,এবং সেসবের নারীবাদী ব্যাখ্যা গ্রহন না করবেন,ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি একজন যথারীতি পুরুষ,যে কি না উপর্যুপরি মিসোজিনিস্ট এবং যাজকতন্ত্রের ধ্বজাধারী। আপনি একজন পরিত্যাজ্য ধর্মীয় মোল্লা।
আচ্ছা, তো কুরআন হাদীসের আধুনিক নারীবাদী পাঠ বা বিনির্মান আদৌ কি সম্ভব?
হ্যাঁ,সম্ভব। কুরআন হাদীসের কাদিয়ানী পাঠ,বিবর্তনবাদি পাঠ, আহলে কোরআনবাদি পাঠ সম্ভব হলে নারীবাদী পাঠও খুব সম্ভব। যেহেতু এসব টেক্সটের অর্থ ও ব্যাখ্যার ব্যাপকতা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে,এবং প্রত্যেকেই তাদের মত ও আদর্শ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে নিচ্ছে। সুতরাং কুআন ও হাদিসের আপাত মিসোজিনিস্ট টেক্সটগুলোর বিকল্প ব্যাখ্যা দাঁড় করানে কোন বিষয়ই না। কারণ সবকিছুই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। আমি কিছুদিন আগে এক কুখ্যাত শয়তান কে দেখেছি,সে কুরআন কে ব্যাখ্যা করে এই কথা প্রমাণ করেছে যে,আমরা প্রচলিত অর্থে নামাজ বলতে যা বুঝি সেটা মূলত নামাজ না,কুরআনে আল্লাহ এই নামাজের আদেশ দেন নাই। আক্বীমুস সালাহ অর্থ হলো আল্লাহর আদেশাবলী মেনে চলো। তার এই ব্যাখ্যাও কিন্তু একটা ব্যাখ্যা,এবং সেটা বহু মানুষের মনে মুগ্ধতা জাগাবে।
ফারজানা আপারা যখন বলেন,এগুলোর অন্য ব্যাখ্যা আছে,মোল্লারা যা বলে সেটা না,তখন আমার এই কথা মনে পড়ে। আসলেইতো,সবকিছুরই ব্যাখ্যা আছে।
উনারা কুরআন সুন্নাহ সম্মত নারী হিতৈষী মতবাদ পোষণ করেন,সেটা খুবই ভালো কথা। কিন্তু এটা করতে গিয়ে কোরান ও সুন্নাহর অর্ধেকেরও বেশি জিনিস বেমালুম গায়েব করে ফেলেন। এ এক আশ্চর্যজনক ভানুমতির খেল। স্ত্রী বাইরে কাজ করতে চাইলে স্বামীর অনুমতি লাগবে,স্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব ঘর গৃহস্থালির দেখাশোনা করা,সন্তান লালন পালন করা,স্বামীর সন্তুষ্টি লাভে সচেষ্ট থাকা, অনুগত থাকা, ঘরে থাকা,প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়া,পুরুষের ক্বিওয়ামাহ,এসবের কোনটাই নাকি কুরআন হাদিসের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না! সব পুরুষতন্ত্রের আবিষ্কার! কিংবা পাওয়া গেলেও এগুলোর “অন্য ব্যাখ্যা” আছে!
উনাকে নাকি একজন প্রশ্ন করেছিলো, আমি জব করতে চাইলে আমার স্বামীর পারমিশন নেয়া লাগবে কি না। এহেন নাদান মার্কা প্রশ্নে তিনি যারপরনাই রুষ্ট ও মর্মাহত হইছেন বলে জানান এক পোস্টের মাধ্যমে । তার মতে,একজন আধুনিক শিক্ষিত নারী কী করে স্বামীর অনুমতি টাইপের পশ্চাৎগামী চিন্তা করতে পারে? কোথায় পেয়েছে সে এসব চিন্তা? ইসলামের কোথাও এসব নিয়ম নাই।
এ হলো প্রথম ধাপের সিম্পটম,আলামত,চিন্তা প্রক্রিয়া। কিন্তু নারীবাদ, জেন্ডার বায়াসনেস, মিসোজিনি,সমতা,অধিকার এইসব আপাত মোহনীয় ঘোলাটে ও উদ্দেশ্যহীন বাক্যগুলো মিলেই এমন এক চিন্তা কাঠামো গঠন করে ব্যাক্তির ভেতরে,যা তাকে কোথায় থেকে কোথায় নিয়ে যাবে,সেটা কল্পনা করাও অসম্ভব। একটা চশমার মতো,চোখে লাগালে পুরো পৃথিবীর রংটাই পাল্টে যায়। নারীবাদের চশমা,তা সে যে রূপেই হোক,রেডিক্যাল বা ইসলামিক,চোখে লাগানোর পর পুরো দুনিয়াটাকেই পুরুষতান্ত্রিক আর মিসোজিনিস্ট বলে মনে হবে। আজকে কোরআন হাদিস কে বাদ দিয়ে বাকি পুরো উম্মাহর সকল ইমাম মুজতাহিদ,ফুকাহা মুহাদ্দিস,মুফাসসির কে মিসোজিনিস্ট বলে গালি দিচ্ছে,স্পষ্ট ভাষায় ঘৃণা প্রকাশ করছে। দুই দিন পর এই কুরআন আর হাদীসকেও মিসোজিনিস্ট বলে মনে হবে। (আল্লাহ রক্ষা করুন)। এই পরিণতি অনেকটা অবধারিতই। হাজারো উদাহরণ তৈরী হয়েছে।
ওয়েস্টার্ন রেডিক্যাল নারীবাদের সাথে উনাদের সবচে বড় এবং মৌলিক মিলের জায়গাটা কোথায়?
মিলের জায়গা হলো,তারা উভয়েই পুরুষ হয়ে উঠতে চায়। এরা এক আশ্চর্য নারী ঘৃণায় আক্রান্ত। নিজেই নিজের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। নারীর সৃষ্টিগত ও স্বভাবগত যে অস্তিত্ব আছে তাকে তারা ঘৃণা করে,এবং সেটা অতিক্রম করে প্রবল পরাক্রান্ত পুরুষ হইয়া উঠতে চায় শেষমেশ। ফলে একজন নারীর যে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য আছে,যেমন আছে পুরুষেরও,স্বাতন্ত্র্য কিছু বৈশিষ্ট্য, সেগুলো কে তারা স্রেফ গায়ের জোরে অস্বীকার করেন। আর একই সাথে সুরে সুর মিলিয়ে তালে তাল মিলিয়ে বলেন– কেউ নারী হয়ে জন্মায় না,সমাজই তৈরী করে নারী!
ফেইসবুকেই কোন এক পোস্টে যেন দেখেছিলাম চমৎকার একখানা বাণী। বহুদিন পর আবার মনে পড়লো আজকে—
— what is islamic feminism?
— Brown women taking orders from angry white women.
Hujaifa Mahmud
