আলহামদুলিল্লাহ! মহান আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের অসীম করুনা, শেষ অধ্যায়টুকু লেখার মত হায়াত আর তৌফিক দান করেছেন এই অধমকে।
গত ছয়টি লেখায় চেষ্টা করেছি – জ্ঞানার্জনে, বিশেষ করে আল-কুরআন এবং সহীহ ইসনাদের ভিত্তিতে বর্নিত দ্বীনের জ্ঞানার্জনে প্রিয়জনকে অনুপ্রাণিত করার জন্য। যাতে করে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভুল ধারনাগুলো পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।
জ্ঞানার্জন মানে এই নয় যে, যা খুশী তাই পড়া, যে কোন বই পড়া বা যে কারো মতবাদ পড়েই তা গ্রহন করা। পবিত্র কুরআনুল-কারীমে আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া-তা’আলা মানুষকে কুরআন পড়ে অনুধ্যায় করতে বলেছেন, শুধু অধ্যয়ন করতে বলেননি। আল্লাহ্ বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
নিকটতম অনুবাদঃ তারা কি কুরআনের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে না? [সুরাহ আন-নিসাহ্ ৪, আয়াত ৮২]
এই আয়াতে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে التَدَبُّر (আত-তাদাব্বুর – To Reflect) চিন্তা-ভাবনা করা। অর্থাৎ শুধু পড়া নয়, পড়ার পরে এই আয়াতসমূহ কতখানি যৌক্তিক সেই বিষয়গুলিও চিন্তাভাবনা করতে হবে। সুতরাং কেউ যদি এমন সব তথ্য উপস্থাপন করে কুরআনের আয়াতের তাফসীর করে, যার কোন যৌক্তিক উৎস নেই, তাহলে সেই তাফসীর গ্রহনযোগ্য মনে করার কোন কারন থাকে না। আর সে কারনেই কুরআনুল কারীমের তাফসীরে – সহীহ ইসনাদে বর্নীত সুন্নাহের গুরুত্ব অপরিসীম। যে কোন হাদিস হলেই হবে না, হাদিস বিজ্ঞানের মান অনুযায়ী হাদিসটির ইসনাদ, মতন, খবর ইত্যাদি বিষয় প্রত্যায়িত করা সম্ভব হলেই – সেই হাদিস কুরআনুল কারীমের তাফসীরে ব্যবহার করা যথার্থ হবে।
আজকে শেষ অধ্যায়টি লিখতে বসে, মনে হলো – মৃত্যু পরবর্তী জীবনে আল্লাহ’র দেখা পাওয়া যাবে কিনা – সেই বিষয়ে কিছু বলা উচিত। আর সেইভাবেই লেখাটি শেষ করার ইচ্ছা পোষন করছি – ইন-শা-আল্লাহ!
মৃত্যু পরবর্তী জীবন শুরু হয়, কবরের জীবন থেকে। আমরা সবাই জানি, কবরের প্রত্যেক মানুষকেই সওয়াল জবাব করা হবে। কি ধরনের প্রশ্ন করা হবে, এই বিষয়ে বেশ কিছু সহীহ হাদিস রয়েছে। তার মধ্যে নীচের হাদিসটি একটি আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন। তাই এখানে উল্লেখ করছি।
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا شَبَابَةُ، عَنِ ابْنِ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرِو بْنِ عَطَاءٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ : “ إِنَّ الْمَيِّتَ يَصِيرُ إِلَى الْقَبْرِ فَيُجْلَسُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فِي قَبْرِهِ غَيْرَ فَزِعٍ وَلاَ مَشْعُوفٍ ثُمَّ يُقَالُ لَهُ : فِيمَ كُنْتَ فَيَقُولُ : كُنْتُ فِي الإِسْلاَمِ . فَيُقَالُ لَهُ : مَا هَذَا الرَّجُلُ فَيَقُولُ : مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ جَاءَنَا بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَصَدَّقْنَاهُ . فَيُقَالُ لَهُ : هَلْ رَأَيْتَ اللَّهَ فَيَقُولُ : مَا يَنْبَغِي لأَحَدٍ أَنْ يَرَى اللَّهَ . فَيُفْرَجُ لَهُ فُرْجَةٌ قِبَلَ النَّارِ فَيَنْظُرُ إِلَيْهَا يَحْطِمُ بَعْضُهَا بَعْضًا فَيُقَالُ لَهُ : انْظُرْ إِلَى مَا وَقَاكَ اللَّهُ . ثُمَّ يُفْرَجُ لَهُ فُرْجَةٌ قِبَلَ الْجَنَّةِ فَيَنْظُرُ إِلَى زَهْرَتِهَا وَمَا فِيهَا فَيُقَالُ لَهُ : هَذَا مَقْعَدُكَ . وَيُقَالُ لَهُ : عَلَى الْيَقِينِ كُنْتَ وَعَلَيْهِ مُتَّ وَعَلَيْهِ تُبْعَثُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ . وَيُجْلَسُ الرَّجُلُ السُّوءُ فِي قَبْرِهِ فَزِعًا مَشْعُوفًا فَيُقَالُ لَهُ : فِيمَ كُنْتَ فَيَقُولُ : لاَ أَدْرِي . فَيُقَالُ لَهُ : مَا هَذَا الرَّجُلُ فَيَقُولُ : سَمِعْتُ النَّاسَ يَقُولُونَ قَوْلاً فَقُلْتُهُ . فَيُفْرَجُ لَهُ قِبَلَ الْجَنَّةِ فَيَنْظُرُ إِلَى زَهْرَتِهَا وَمَا فِيهَا فَيُقَالُ لَهُ : انْظُرْ إِلَى مَا صَرَفَ اللَّهُ عَنْكَ . ثُمَّ يُفْرَجُ لَهُ فُرْجَةٌ قِبَلَ النَّارِ فَيَنْظُرُ إِلَيْهَا يَحْطِمُ بَعْضُهَا بَعْضًا فَيُقَالُ لَهُ : هَذَا مَقْعَدُكَ عَلَى الشَّكِّ كُنْتَ وَعَلَيْهِ مُتَّ وَعَلَيْهِ تُبْعَثُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى ” .
আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হলে এবং সে সৎকর্মপরায়ণ লোক হলে তাকে ভীতিশূন্য ও দুশ্চিন্তামুক্ত অবস্থায় তার কবরে বসানো হয়। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি কিসের অনুসারী ছিলে? সে বলবে, আমি ইসলামের অনুসারী ছিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, এই ব্যক্তি কে? সে বলবে, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণসহ আমাদের নিকট এসেছিলেন এবং আমরা তাকে সত্য নবী বলে স্বীকার করেছি।
অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি আল্লাহকে দেখেছিলে? সে বলবে, আল্লাহকে দেখা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
অতঃপর তার জন্য জাহান্নামের দিকে একটি সুড়ঙ্গ পথ খুলে দেয়া হবে। সে সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পাবে যে, তার এক অংশ অপর অংশকে গ্রাস করছে। তাকে বলা হবে, দেখে নাও, যা থেকে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করেছেন। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি সুড়ঙ্গ পথ খুলে দেয়া হবে। সে তথাকার পুষ্প উদ্যান ও অন্যান্য সবকিছু দেখতে পাবে। তাকে বলা হবে, এই হলো তোমার স্থায়ী বাসস্থান। তাকে আরো বলা হবে, তুমি ঈমানের উপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ছিলে, ঈমানসহ মৃত্যুবরণ করেছ এবং ইনশাল্লাহ ঈমানসহ হাশরের ময়দানে উত্থিত হবে।
পক্ষান্তরে দুষ্কর্মপরায়ণ লোককে ভীতিকর ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবস্থায় উঠিয়ে তার কবরে বসানো হবে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কিসের অনুসারী ছিলে? সে বলবে, আমি জানি না। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, এই ব্যক্তি কে? সে বলবে, আমি লোকজনকে একটা কথা বলতে শুনেছি, আমিও তাই বলেছি। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি সুড়ঙ্গ পথ খুলে দেয়া হবে। সে সেদিকে তাকিয়ে তথাকার পুষ্প উদ্যান ও অন্যান্য সবকিছু দেখতে পাবে। তাকে বলা হবে, দেখ যা থেকে আল্লাহ তোকে বঞ্চিত করেছেন। অতঃপর তার জন্য জাহান্নামের দিকে একটি সুড়ঙ্গ পথ খুলে দেয়া হবে। সে সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পাবে যে, জাহান্নামের এক অংশ অপর অংশ কে গ্রাস করছে। অতঃপর তাকে বলা হবে, এটা হলো তোর স্থায়ী আবাসস্থল। তুই সংশয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলি, সংশয়ী অবস্থায় মরেছিস এবং আল্লাহর মর্জি সংশয়ী অবস্থায় তোকে উঠানো হবে।
রেফারেন্সঃ ihadis.com, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪২৬৮, হাদিস মান: সহীহ্
উপরে বর্নীত সুন্নাহ থেকেও এটা সুস্পষ্ট প্রমানিত হয় যে, পার্থিব জীবনে আল্লাহ্কে দেখা সম্ভব নয়।
আজকের দিনে আমরা যেমন আল্লাহ্কে দেখা বিষয়ে নানা রকম আগ্রহ এবং কৌতুহল প্রকাশ করে থাকি, চৌদ্দশত বছর আগের জামানাতেও মূমীন এবং মুশরিকদের মাঝেও এই বিষয়ে নানারকম প্রশ্ন ছিল। মুশরিকরা আল্লাহ্কে দেখার দাবী করতো দম্ভ সহকারে, আল্লাহ্র আধিপত্য এবং একত্ববাদকে অস্বীকার করার জন্য, আর মূমীনগন প্রশ্ন করতো আল্লাহ্কে দেখার, আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে।
পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ বলেন,
وَقَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا لَوْلَا أُنزِلَ عَلَيْنَا الْمَلَائِكَةُ أَوْ نَرَىٰ رَبَّنَا ۗ لَقَدِ اسْتَكْبَرُوا فِي أَنفُسِهِمْ وَعَتَوْا عُتُوًّا كَبِيرًا
নিকটতম অনুবাদঃ যারা আমার সাক্ষাৎ আশা করে না, তারা বলে, আমাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ করা হল না কেন? অথবা আমরা আমাদের পালনকর্তাকে দেখি না কেন? তারা নিজেদের অন্তরে অহংকার পোষণ করে এবং গুরুতর অবাধ্যতায় মেতে উঠেছে। [সুরাতুল-ফুর্ক্কান ২৫, আয়াত ২১]
উল্লেখ্য যে, ভ্রান্ত মতবাদের অনুসারীগন আল্লাহ’র সাথে এই সাক্ষাতের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, এই আয়াতে বর্নিত “আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ আশা করা” বলতে পার্থিব জীবনেই আল্লাহ্কে দেখার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।
আসলেই কি তাই?
না, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। প্রকৃতপক্ষে তাদের এই মনগড়া ব্যাখ্যা সম্পূর্ন ভুল। এই আয়াতটি একটি সুস্পষ্ট আয়াত – এবং এই আয়াতে আল্লাহ’র সাক্ষাৎ বলতে – মৃত্যু পরবর্তী জীবনে ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহর সাথে নির্ধারিত সাক্ষাতের কথা বলা হয়েছে, যেদিন মানুষ বিচারের জন্য তার রব্বের সামনে কিয়াম করবে। বিচ্ছিন্নভাবে একটি আয়াত না পড়ে, আগে এবং পরের কিছু আয়াত একসাথে পাঠ করলেই – আয়াতের প্রকৃত প্রেক্ষাপট পরিস্কারভাবে অনুধাবন করা সম্ভব। উপরোক্ত আয়াতের পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ্ বলেন,
يَوْمَ يَرَوْنَ الْمَلَائِكَةَ لَا بُشْرَىٰ يَوْمَئِذٍ لِّلْمُجْرِمِينَ وَيَقُولُونَ حِجْرًا مَّحْجُورًا
নিকটতম অনুবাদঃ যেদিন তারা ফেরেশতাদেরকে দেখবে, সেদিন অপরাধীদের জন্যে কোন সুসংবাদ থাকবে না এবং তারা বলবে, কোন বাধা যদি তা আটকে রাখত। [সুরাতুল-ফুর্ক্কান ২৫, আয়াত ২২]
وَقَدِمْنَا إِلَىٰ مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنثُورًا
নিকটতম অনুবাদঃ আমি তাদের কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণারূপে করে দেব। [সুরাতুল-ফুর্ক্কান ২৫, আয়াত ২৩]
উপরোক্ত আয়াতের প্রেক্ষাপট পরিস্কার ভাষায় ব্যক্ত করে যে, কাফের মুশরিকগন অহংকারবশত আর গুরুতর অবাধ্যতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহ্কে দেখার দাবী করে। দৃষ্টতার সাথে দাবী করে তাদের কাছে কেন ফেরেস্তা আসে না! আল্লাহ্ যদি সত্যি হবে, তাহলে কেন তারা আল্লাহ্কে দেখতে পায় না। তারা এই জন্য এই ধরনের দৃষ্টতা পোষণ করার সাহস প্রদর্শন করতে পারে, কারন তারা আখিরাত তথা বিচার দিবসে বিশ্বাস পোষণ করে না। তারা মনে করে দুনিয়ার জীবনাবশনের সাথে সাথেই সব কিছু শেষ। তারপর আর কিছু নেই। তাই মরনের পরে বিচার বলেও কিছু নেই। আর তাই আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা, মালিকি-ইয়াও-মিদ্দিন, সেইসব কাফির মুশরিকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন যে, যারা (আখিরাতে)আল্লাহ’র সাক্ষাতের প্রত্যাশা করে না, তুচ্ছতাচ্ছিল্ল্য করে আল্লাহ্ এবং ফেরেস্তাদের দেখার দাবী করে, তারা অচিরেই ফেরেস্তা (মালাকুম মওত এবং অন্যান্য ফেরেস্তা)-গনের সাক্ষাৎ প্রাপ্ত হবে। তবে সেদিন তারা বলবে – “হায় কোন বাঁধা যদি থাকতো – যদি ফেরেস্তা (মালাকুল মওত) আমার কাছে না আসতো।” আর একবার মালাকুল মওতের সাথে দেখা হয়ে যাবার পরে, তাদের জন্য আর কোন সুসংবাদ থাকবে না। আল্লাহ্ বিচারে মনোনিবেশ করবেন, আর তাদের আমলসমূহকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকনায় রূপান্তর করে দেবেন। তাদের কৃতকর্মের কোন মূল্যই থাকবে না।
এভাবে আল-কুরআনে – “আল্লাহর সাক্ষাতের আশা” এবং “আল্লাহর সাক্ষাতের ভয়” ইত্যাদি বাক্য দ্বারা শেষ বিচারে আল্লাহ’র সামনে কিয়াম করাকে বুঝানো হয়েছে।
সহীহ সুন্নাহতেও ক্বিয়ামত দিবসে আল্লাহ্র সাক্ষাতের বিষয়টি বর্নিত হয়েছে।
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ سُهَيْلِ بْنِ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ سَمِعَهُ يُحَدِّثُ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ نَاسٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَرَى رَبَّنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالَ ” هَلْ تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ الشَّمْسِ فِي الظَّهِيرَةِ لَيْسَتْ فِي سَحَابَةٍ ” . قَالُوا لاَ . قَالَ ” هَلْ تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ لَيْسَ فِي سَحَابَةٍ ” . قَالُوا لاَ . قَالَ ” وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَتِهِ إِلاَّ كَمَا تُضَارُّونَ فِي رُؤْيَةِ أَحَدِهِمَا ” .
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহকে দেখতে পাবো? তিনি বললেন, মেঘহীন দুপুরে তোমাদের কি সূর্য দেখতে কষ্ট হয়? সাহাবীগন বললেন, না। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, মেঘহীন নির্মল আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়? তারা বললেন, না। তিনি (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সেই, মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমরা এর একটি (চাঁদ বা সূর্য) যেভাবে নির্বিঘ্নে দেখতে পাও সেভাবে তাঁকেও তোমরা দেখবে।
রেফারেন্সঃ ihadis.com, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৭৩০, হাদিস মানঃ সহীহ্
সুরাতুল ক্বিয়ামাহতে আল্লাহ্ বলেন
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ
إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٌ
নিকটতম অনুবাদঃ সেদিন অনেক মুখমন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তার রব্বের দিকে তাকিয়ে থাকবে। [সুরাতুল ক্বিয়ামাহ ৭৫, আয়াত ২২-২৩]
আখিরাতে আল্লাহ্র সাক্ষাতের বিষয়টি, কুরআনুল কারীমের এই ধরনের আরো অনেক আয়াত এবং আরো অনেক সহীহ সুন্নাহ উপস্থাপন করে – আরো বিস্তারিত আলোচনা করে বর্ননা করা সম্ভব। কিন্তু লেখার কলেবর বৃদ্ধি করা আমার মূল উদ্দেশ্য নয়। তাই শুধুমাত্র একটি হাদিস বর্ননা করে মূল আলোচনা শেষ করছি।
حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ بْنِ مَيْسَرَةَ، قَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ ثَابِتٍ الْبُنَانِيِّ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى، عَنْ صُهَيْبٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ – قَالَ – يَقُولُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى تُرِيدُونَ شَيْئًا أَزِيدُكُمْ فَيَقُولُونَ أَلَمْ تُبَيِّضْ وُجُوهَنَا أَلَمْ تُدْخِلْنَا الْجَنَّةَ وَتُنَجِّنَا مِنَ النَّارِ – قَالَ – فَيَكْشِفُ الْحِجَابَ فَمَا أُعْطُوا شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنَ النَّظَرِ إِلَى رَبِّهِمْ عَزَّ وَجَلَّ ” .
সুহায়ব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা কি চাও, আমি আরো অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেই? তারা বলবে, আপনি কি আমাদের চেহারাগুলো আলোকোজ্জ্বল করে দেননি, আমাদের জান্নাতে দাখিল করেননি এবং জাহান্নাম থেকে নাযাত দেননি? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, এরপর আল্লাহ তা’আলা আবরণ তুলে নিবেন। আল্লাহর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই তাদের দেয়া হয়নি।
রেফারেন্সঃ ihadis.com, সহীহ্ মুসলিম, হাদিস নং ৩৩৮
সুরাহ আলে-’ইমরানের আট নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন, আল-কুরআনে দুই ধরনের আয়াত আছে, ১) মুহ্কাম বা সুস্পষ্ট আয়াত এবং ২) মুতাশাবিহ্ বা দ্ব্যর্থবোধক আয়াত, যা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব কিংবা যার একাধিক অর্থ থাকতে পারে। মুহ্কাম আয়াত সমূহই হচ্ছে কুরআনের ভিত্তিমূলক আয়াত, যা দ্বারা দ্বীন ইসলামকে সুস্পষ্টভাবে জানা, বুঝা এবং ‘আমল করা যায়। আর এই ভিত্তিমূলক আয়াতগুলো ইসলামিক জীবনাচরন বা শরিয়তের মূল স্তম্ভ।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, সাতটি পর্বে লেখায় যতগুলি আয়াত চয়ন করেছি, সবগুলোই আল-কুরআনের মুহ্কাম আয়াত, যাদের মধ্যে কোন দ্ব্যর্থবোধকতা নাই, কোন অস্পষ্টতা নাই। সুতরাং, উপস্থাপিত আয়াতসমূহ এবং সহীহ ইসনাদের বর্নিত হাদিসমূহের প্রেক্ষাপটে এটা দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে দৃঢ়তার সাথে বলা যায় যে,
দুনিয়াতে অর্থাৎ পার্থিব জীবনে আল্লাহ্কে দেখার যে দাবী সুফীবাদী / পীরবাদী মানুষেরা করে থাকেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার এবং উদ্দেশ্যমূলক প্রতারণা।
আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’আলা সকল মুমীন বান্দাকে শয়তানের প্রতারণা এবং ওয়াস-ওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। সেইসব মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হবার তৌফিক দান করুন, যারা আল্লাহ্র নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়েছে, দুনিয়াতে এবং আখিরাতে সফলকাম হয়েছে। আ-মী-ন!
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসা সহকারে আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করি। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আপনি ছাড়া হক্ব কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকট তওবা করি।
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
পবিত্র আপনার রব্বের সত্ত্বা, তিঁনি সম্মানিত এবং পবিত্র যা তারা বর্ননা করে তা থেকে। রাসুলদের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। সমস্ত হাম্দ্ সমস্ত বিশ্বের রব্ব আল্লাহ্রই জন্য।
আস-সালামু-আলায়কুম ওয়া-রাহমাতুল্লাহি ওয়া-বারাকাতুহু!
বিঃদ্রঃ –
১) আলোচিত সাতটি লেখায় কোন ধরনের ভুল তথ্য পরিলক্ষিত হলে, সংশোধনের নিমিত্তে অনুগ্রহ করে আমাকে জানিয়ে দিলে, আমি সহ অন্যান্য সকলেই উপকৃত হবেন আশা করি।
২) লেখাটি অনুসন্ধানমূলক – যারা এই বিষয়ে পড়াশোনা করেন, বিস্তারিত জানার জন্য আরো গবেষণা করতে চান, তাদের জন্য লেখাটি সহায়ক পাঠ হিসাবে কাজে লাগতে পারে।
৩) এই অধমের জন্য দু’আর দরখাস্ত রইলো।
