ভারতের উত্তরপ্রদেশে এক মুসলিম ছাত্রকে মারার জন্য ক্লাসেরই অন্য ছাত্রদের নির্দেশ দিয়ে যে শিক্ষিকা দেশ জুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে, তিনি জানিয়েছেন, ওই ঘটনার জন্য তিনি মোটেও লজ্জিত নন।
মুজফফরনগর জেলায় তৃপ্তা ত্যাগী নামে ওই শিক্ষিকা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি কেন লজ্জিত হব? একজন শিক্ষিকা হিসেবে আমি আমার গ্রামের সেবা করে আসছি- আর গ্রামবাসীরাও সবাই আমার পাশেই আছে।’
ক্লাসে অবাধ্য ছাত্রদের ‘বাগে আনতেই’ ওই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল, নিজের আচরণের পক্ষে এমন কথাই বলছেন তিনি।
তৃপ্তা ত্যাগী বলেছেন, ‘দেশের সরকার তো আইন বানিয়েই খালাস। কিন্তু আমাদের তো স্কুলে বাচ্চাদের কন্ট্রোল করতে হয়, ফলে আমরাই জানি সমস্যাটা কোথায়।’
ওই ঘটনার তদন্ত শেষ না-হওয়া পর্যন্ত মুজফফরনগরে ‘নেহা পাবলিক স্কুল’ নামে ওই স্কুলটি বন্ধ রাখতে বলেছে উত্তরপ্রদেশের শিক্ষা দফতর। স্কুলের গেটে তালাও ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।
নির্যাতিত মুসলিম শিশুটির বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ওই স্কুল শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির (ইন্ডিয়ান পিনাল কোড) ৩২৩ ও ৫০৬ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে।
তবে অভিযুক্ত ওই শিক্ষিকাকে রোববার (২৭ আগস্ট) বিকেল পর্যন্ত গ্রেফতার কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়নি।
ইতোমধ্যে মুসলিম ওই বাচ্চাটির মা রুবিনা বলেছেন, ‘ম্যাডাম (তৃপ্তা ত্যাগী) আসলে খুবই অন্যায় করেছেন। সব দেখেশুনে তো মনে হচ্ছে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ থেকেই এ কাজ করা হয়েছে।’
এদিকে ভারতে বিভিন্ন দলের রাজনীতিকদের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতি বা চলচ্চিত্র জগতের অনেক তারকাও মুজফফরনগরের ওই ঘটনার তীব্র নিন্দায় সরব হয়েছেন।
খুব্বাপুর গ্রামে এখন কী অবস্থা?
উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগর জেলার খুব্বাপুর নামে যে গ্রামটিতে এ ঘটনা ঘটেছে, সেখানে এখন মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে।
সাংবাদিকরা শনিবার নির্যাতিত শিশুটির বাড়িতে গিয়ে দেখতে পায় যে তার বাবা ইরশাদের সাথে দেখা করার জন্য অনেক দূর-দূরান্ত থেকেও বহু মানুষ এসেছে। তারা পরিবারটিকে সমবেদনা জানাচ্ছে।
শিশুটির বাবা ইরশাদ অবশ্য বারবারই বলছেন, তিনি ওই ঘটনাটিকে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের দৃষ্টি দিয়ে দেখতে চান না।
তিনি বলছেন, ‘বিষয়টা মোটেই হিন্দু-মুসলিম না, বিষয়টা একটা বাচ্চাকে মারধর করার। আমাদের সন্তানকে নির্যাতন করা হয়েছে, আমরা তার বিরুদ্ধে এফআইআর করেছি। এখন প্রশাসন এ ব্যাপারে যা করার করবে।’
খতৌলির পুলিশ সুপার রবিশঙ্কর মিশ্রাও জানান, নির্যাতিত শিশুটির বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ৩২৩ ও ৫০৬ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ধারাগুলো হলো কারো ভাবাবেগে আঘাত হানা ও ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা সংক্রান্ত।
তবে কোনো বিশেষ ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষসূচক মন্তব্য করলে যে ১২৩-এ ধারায় চার্জ আনা হয়, ওই ধারাটি এই মামলায় যুক্ত করা হয়নি।
পুলিশ প্রধান বলেছেন, ‘তদন্ত চলছে। তদন্ত আগালে আরো যে সব তথ্য সামনে আসবে, তার ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
তবে ওই শিশুটির মা রুবিনা কিন্তু জানিয়েছেন, ওই শিক্ষিকার আচরণ মুসলিম-বিদ্বেষী ছিল বলেই তার মনে হয়েছে।
রুবিনা বলেন, ‘ম্যাডাম কাজটা মোটেই ঠিক করেননি। ক্লাসের অন্য বাচ্চাদের দিয়ে আমাদের ছেলেকে মারধর করাটা উচিত হয়নি। উনি নিজে মারলে তবুও বুঝতাম।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার তো মনে হচ্ছে উনি মুসলমানদের সহ্য করতে পারেন না। ঘটনার মানে তো তাই দাঁড়াচ্ছে!’
গ্রামেরই আর এক প্রান্তে অভিযুক্ত শিক্ষিকা তৃপ্তা ত্যাগীও কিন্তু গত দু’দিন ধরেই সংবাদমাধ্যমের সাথে দেখা করছেন।
তৃপ্তা ত্যাগী বারবার একটা জিনিসই বলছেন, তার স্কুলে বেশির ভাগ ছাত্রই মুসলিম। এমন কি যাদেরকে উনি বাচ্চাটিকে মারতে বলেছিলেন তাদের মধ্যে মুসলিম ছাত্রও ছিল। কাজেই এর মধ্যে মুসলিম-বিদ্বেষের কিছু নেই।
তিনি বলেন, ‘আমাকে ফাঁসানোর জন্যই একটা তুচ্ছ ঘটনাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এভাবে দেখানো হচ্ছে আর অযথা ধর্মকে এর মধ্যে টেনে আনা হচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়
শুক্রবার (২৫ আগস্ট) মুজফফরনগরের ওই ঘটনার কথা জানাজানি হওয়ার খানিকক্ষণ পরেই কলকাতা ও মুম্বাইয়ের নন্দিত অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখার্জি টুইট করেছিলেন, ‘ইনি একজন শিক্ষক!!! বিষয়টা এখন এই পর্যায়ে নেমে এসেছে। এখান থেকে পরিত্রাণের উপায়টা কী?’
বস্তুত এই অমানবিক ঘটনা সাধারণ ভারতীয়দের বিবেকে যে কতটা নাড়া দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার ঢল দেখেই তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।
অনেকেই লিখছে, সার্বিকভাবে ভারতে যে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা আর বিদ্বেষের পরিবেশ গড়ে উঠেছে তারই প্রতিফলন ঘটেছে ওই ঘটনায়।
এক সুপরিচিত সমাজকর্মী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিশেষত এই ঘটনাটি যেহেতু একটি বাচ্চাদের ক্লাসরুমে ঘটেছে, তা থেকে বোঝা যায় দেশের শিক্ষাঙ্গনও এই বিষাক্ত হাওয়ার আঁচ এড়াতে পারেনি।’
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, বিজেপির ‘বিদ্রোহী’ নেতা তথা এমপি বরুণ গান্ধী কিংবা হায়দরাবাদের এমপি আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মতো অনেকেই এই ঘটনার নিন্দা করেছেন কঠোরতম ভাষায়।
তবে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি ফিল্ম দুনিয়ার তারকাদেরও অনেককেই এই ঘটনায় সরব হতে দেখা যাচ্ছে।
অভিনেত্রী রেনুকা সাহানি লিখেছেন, ‘এই দুষ্ট শিক্ষকের জায়গা হওয়া উচিত গরাদের পেছনে। তার বদলে হয়ত দেখব জাতীয় সংহতির প্রসার ঘটানোর জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় শিক্ষকের অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন।’
দু’দিন আগেই কাশ্মিরি পন্ডিতদের নিয়ে তৈরি বিতর্কিত বলিউড মুভি ‘দ্য কাশ্মির ফাইলস’ জাতীয় সংহতির প্রসারের জন্য ভারতের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছে, রেনুকা সাহানির টুইটে তারই প্রচ্ছন্ন খোঁচা ছিল।
দ্য কাশ্মির ফাইলস ছবিটিকেও অনেকেই চরম মুসলিম-বিদ্বেষী বলে অভিযুক্ত করেছেন।
বলিউড ও দক্ষিণী ছবির তারকা প্রকাশ রাজ মুজফফরনগরের ঘটনাটিকে ‘মানবতার অন্ধকারতম দিক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
অভিযুক্ত শিক্ষিকা তৃপ্তা ত্যাগীকে অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে অত্যন্ত তির্যক একটি পোস্ট করেছেন অভিনেত্রী স্বরা ভাস্করও।
সূত্র : বিবিসি
