– ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান ইইউর
– হামাসের হামলায় ইসরাইলি কমান্ডারসহ নিহত ৩
অবরুদ্ধ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজার দক্ষিণাঞ্চল রাফায় ইসরাইলি হামলায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের এই আশ্রয়স্থলে ইসরাইলি অভিযান প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। দেশটি বলেছে, ইসরাইলি অভিযান এ অঞ্চলে গুরুতর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। এ অবস্থায় চীন অতি দ্রুত রাফাহে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছে।
এএফপির খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার রাফাহে মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাফাহে যুদ্ধ বন্ধ না হলে গুরুতর মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে।
বিবৃতিতে চীন বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকারক এমন যেকোনো হামলার তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করে চীন।’ বিবৃতিতে রাফায় অতি দ্রুত সামরিক অভিযান বন্ধ করতে ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘অতি দ্রুত সামরিক অভিযান বন্ধ করে এমন পদক্ষেপ নেয়া উচিত, যাতে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় এবং রাফাহে আরো বড় পরিসরে সৃষ্টি হতে যাওয়া মানবিক বিপর্যয় এড়ানো যায়।’
এর আগে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাফাহে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে ইসরাইলকে সতর্ক করে বলেন, রাফাহে যারা আশ্রয় নিয়েছে, তারা নাজুক অবস্থায় আছে। সেখানে কোনোভাবেই অভিযান চালানো উচিত হবে না। বাইডেন বলেন, ‘রাফাহে আশ্রয় নেয়া এবং সেখানে বসবাসরত ১০ লাখেরও বেশি মানুষের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও তাদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত না করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়টি এগিয়ে নেয়া উচিত হবে না।’
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সাথে সোমবার কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আরো বলেন, ‘সহিংসতার কারণে গাজার উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং এখন তারা রাফাহে আশ্রয় নিয়েছে। তারা বর্তমানে নাজুক পরিস্থিতিতে আছে। তাদের রক্ষা করা দরকার।’ এ সময় বাইডেন আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ যুদ্ধবিরতির পদক্ষেপ হিসেবে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করছে।
অন্য দিকে হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত রোববার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়া’ আইডিএফের রাফাহে সামরিক অভিযান চালানো উচিত হবে না। তবে এ ধরনের আপত্তির তোয়াক্কা করছেন না নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, গাজার দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশে নিষেধ করা মানে হলো ইসরাইলকে পরাজিত হতে বলা। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা জয়ের খুব কাছেই। আমরা অভিযান চালাব। আমরা রাফাহে অবশিষ্ট হামাস যোদ্ধাদের শেষ করব। এটিই শেষ ঘাঁটি, আমরা হামলা করতে যাচ্ছি।’
ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান ইইউর : তেমনি গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হতাহত হওয়া ঠেকাতে ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা প্রদান হ্রাস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপের দেশগুলোর জোট ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)। রয়টার্স জানায়, সোমবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের প্রধান জোসেপ বরেল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্প্রতি বলেছেন যে গাজায় নিহত বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা অনেক বেশি। আমি তাকে বলতে চাই, যদি সত্যি আপনি (বাইডেন) এমনটি মনে করেন, তা হলে ইসরাইলে সামরিক সহায়তা পাঠানো হ্রাস করুন। ইসরাইলি বাহিনীর হাতে অস্ত্র-গোলাবারুদ কম থাকলে গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের নিহতের হারও হ্রাস পাবে।’
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা প্রদান হ্রাস করে, তা হলে ইইউও সেই পথে হাঁটবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন জোসেপ বরেল। সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একই কথা আমাদের বেলায়ও প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি মনে করে যে গাজায় বেসামরিকদের গণনিধন যজ্ঞ চলছে, তা হলে আমাদেরও সামরিক সহায়তাসংক্রান্ত আইন-বিধি পরিবর্তন করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়টিও সামনে আনেন জোসেপ বরেল। তিনি বলেন, ‘সবাই তেল আবিবে যাচ্ছে, (নেতানিয়াহুর কাছে) হাতজোড় করে অনুরোধ করেছে- ‘দয়া করে এমন করবেন না, বেসামরিকদের রক্ষা করুন, এত মানুষ মারবেন না। কিন্তু তিনি কোনো কথাই কানে তুলছেন না। গাজায় আর কত মানুষ মারা গেলে তার টনক নড়বে? আর কত মৃত্যু চান তিনি?’ ‘এর মধ্যে সম্প্রতি রাফাহে অভিযান চালানোর জন্য সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের সরানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশের মানে কী? এই ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে কোথায় রাখা হবে? চাঁদে?’
হামাসের হামলায় ইসরাইলি কমান্ডারসহ নিহত ৩ : ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক ব্যাটালিয়ন কমান্ডার নিহত হয়েছেন। তার সাথে একই দিন প্রাণ গেছে আরো দুই সেনার। গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে দখলদার ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে ১৩০ দিন ধরে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ থামানোর জন্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো আবারো নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। এ ছাড়া ইসরাইলি সেনাদের গাজার সর্বশেষ নিরাপদ স্থান রাফাহে ঢুকে পড়ার একটি শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে প্রাণ হারালেন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার।
টাইমস অব ইসরাইল জানায়, সোমবার আরো তিন সেনার মৃত্যুর মাধ্যমে গাজায় দখলদারদের মৃত্যুর সংখ্যা ২৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। সোমবার নিহত সেনারা হলেন- গাজা ডিভিশনের সাউদার্ন ব্রিগেডের ৬৩০তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল নেতানিয়েল ইয়াকুব এলকোবি (৩৬)। মেজর (রিজার্ভ) ইয়ারির কোহেন (৩০) ও সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস (রিজার্ভ) জিভ চেন (২৭)।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, খান ইউনুসের একটি ভবনে এই সেনারা অবস্থান করছিলেন। তখন সেটিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই বিস্ফোরণে নিহত হন তারা। বর্তমানে খান ইউনুসেই লড়াই চলছে।
এ দিকে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতির জন্য মিসরের রাজধানী কায়রোতে আবারো আলোচনা হবে। এই আলোচনায় প্রতিনিধি পাঠাবে ইসরাইল। হামাসের হাতে এখনো ইসরাইলের ১৩০ জন আটকা রয়েছেন। সোমবার রাতে রাফাহ থেকে দখলদার ইসরাইলি সেনারা দুই বন্দীকে মুক্ত করেন। কিন্তু তাদের মুক্ত করতে গিয়ে ১০০ সাধারণ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে তারা। এর পরই বিশ্ববাসী আবারো নড়েচড়ে বসে। যুক্তরাষ্ট্রও জানিয়েছে, রাফাহতে বন্দীদের মুক্ত করতে যে অভিযান চালানো হয়েছে এতে তারা চিন্তিত। ইসরাইলি সেনারা প্রথম থেকেই দাবি করছে, তারা হামাসকে গাজা থেকে নির্মূল করছে। তবে এখনো হামাস যোদ্ধাদের শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ছে তারা।
