রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে সরাসরি এ শব্দগুলো এসেছে, “আমি কিয়ামতের দিন সকল আদম সন্তানের নেতা, আমি প্রথম ব্যক্তি যিনি কবর ফেটে বের হবো, আমি প্রথম সুপারিশকারী, আর প্রথম আমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২২৭৮]
শাফা‘আত শব্দের অর্থ কোনো এককের সাথে যোগ করা। একজন দো‘আ করছে আর আপনি তার সাথে তার জন্য দো‘আ করলেন, অর্থাৎ আপনি শাফা‘আত করলেন। তার দো‘আর সাথে জোড়া হলো। কারো জন্য কোনো কিছু চাওয়ার অপর নাম হচ্ছে সুপারিশ করা।
সুপারিশ দু’ প্রকার:
দুনিয়ার সুপারিশ: দুনিয়ার সুপারিশ করার জন্য শর্ত হচ্ছে,
১- সুপারিশটি বৈধ কাজে হতে হবে।
২- কারো অধিকার বঞ্চিত করার জন্য অপরের কাছে সুপারিশ না হওয়া।
৩- আল্লাহর কোনো হদ্দ বা নির্ধারিত শাস্তি রহিত করার জন্য সুপারিশ না হওয়া।
আখেরাতের সুপারিশ:
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, আখেরাতে শাফা‘আত বা সুপারিশ অবশ্যই সাব্যস্ত, যা কুরআন-সুন্নাহ ও আসার দ্বারা প্রমাণিত।
কাযী ইয়াদ্ব বলেন, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অভিমত হচ্ছে, শাফা‘আত বা সুপারিশ হওয়া বিবেকের যুক্তি অনুযায়ী বৈধ বিষয়, আর কুরআন ও সুন্নাহর দাবী অনুযায়ী তা অবশ্যম্ভাবীভাবে প্রমাণিত। তারপর তিনি এর ওপর বেশ কিছু আয়াত উল্লেখ করেন। তারপর বলেন, ‘বহু আসার এসেছে যার সম্মিলিত সমন্বিত দাবী হচ্ছে আখেরাতে গুনাহগার মুমিনদের জন্য শাফা‘আত বা সুপারিশ হওয়ার বিষয়টি বিশুদ্ধভাবে সাব্যস্ত। আর সালাফ, খালাফ ও তাদের পরবর্তী আহলুস সুন্নাত এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
এর বিপরীতে খারেজী ও মু‘তাযিলারা তাদের ভ্রান্ত মূলনীতির কারণে তা অস্বীকার করে, সে মূলনীতি হচ্ছে, কবীরা দগুনাহগার চিরস্থায়ী জাহান্নামী। কাযী আব্দুল জাব্বার বলেন, ‘উম্মতের মধ্যে মতভেদ নেই যে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত অবশ্যই সাব্যস্ত, তবে মতভেদ হয়েছে সেটার কার জন্য হবে? … তারপর বলেন, ‘আমাদের নিকট তা কেবল ঈমানদারদের মধ্য হতে যারা তাওবা করে মারা যাবে তাদের জন্য। [শারহুল উসূলিল খামসাহ পৃ. ৬৮৮-৬৯০]
অন্যত্র বলেন, ‘সুতরাং উপরোক্ত বাক্য দ্বারা তুমি বুঝতে পারলে যে, শাফা‘আত শুধু ঈমানদারদের জন্য সাব্যস্ত হবে, সালাত আদায়কারী কিন্তু ফাসেক লোকদের জন্য নয়।’ [আব্দুল জাব্বার, ফাদ্বলুল ই‘তিযাল ওয়া ত্বাবাক্বাতুল মু‘তাযিলাহ পৃ. ২০৭-২০৯]
কুরআন ও সুন্নার সকল ভাষ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, আমাদের নবীর জন্য আখেরাতে যেসব শাফা‘আত সাব্যস্ত হয়েছে তা কয়েক প্রকার। তা থেকে কিছু প্রকার কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত। যেমনটি ইমাম ইবন কাসীর ও ইমাম ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। যদি আমরা সেগুলোকে সংক্ষেপে বলতে পারি, তাহলে তা নিম্নোক্ত অবস্থা দাঁড়ায়:
১- আশ-শাফা‘আতুল উযমা বা বড় সুপারিশ। যা একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাস। যা একাধিক হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত। বরং সেটি মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত যেমনটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেছেন। দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৪/৩০৯, আস-সাফাদিয়্যাহ ২/২৯০-২৯১। মু‘তাযিলারা সাধারণত এ সুপারিশ মেনে নেয়। [দেখুন, ফাতহুল বারী ১১/৪২৮]
২- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক এমন লোকদের জন্য সুপারিশ করা, যাদের সৎকাজ ও অসৎকাজ সমান হয়ে গেছে। তখন তিনি তাদের জন্য সুপারিশ করবেন যাতে তারা জান্নাতে প্রবেশ করে।
৩- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক এমন লোকদের জন্য সুপারিশ করা, যাদের গোনাহের পাল্লা ভারী হওয়ার কারণে জাহান্নামে যাওয়ার নির্দেশ হয়ে গেছে, কিন্তু তারা এখনো তাতে প্রবেশ করেনি। তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশের আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ পেয়ে বসবে। উপরোক্ত ২য় ও ৩য় প্রকার সুপারিশের কথা বর্ণনা করেছেন ইমাম নাওয়াওয়ী, শারহু মুসলিম, ১/৪৪৩; ক্বুরতুবী ও কাযী ইয়াদ্ব, আত-তাযকিরাহ পৃ. ৩০১; সাফারীনী, লাওয়ামি‘উল আনওয়ার আল-বাহিয়্যাহ ২/২১১; ইবন আবিল ইয্য, শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ পৃ. ২৫৭, ইবন হাজার, ফাতহুল বারী ১১/৪২৮।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত ২ ও ৩ নং এর ব্যাপারে ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, এখন পর্যন্ত আমি এগুলোর দলীল হাদীস থেকে পাইনি। দেখুন, হাশিয়াতুস সুনান ১৩/৭৭, আউনুল মা‘বূদের হাশিয়ায়।
অবশ্য এ ব্যাপারে ইমাম ইবন হাজার তাঁর ফাতহুল বারীতে একটি হাদীস দিয়ে দলীল নিয়েছেন, তা হচ্ছে, সহীহ মুসলিমে এসেছে, “আর তোমাদের নবী সিরাতের উপর দণ্ডায়মান থেকে বলতে থাকবেন, হে রব্ব নিরাপত্তা দিন, নিরাপত্তা দিন।” [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৯৫]
৪- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক এমন লোকদের জন্য সুপারিশ করা, যারা জান্নাতে প্রবেশ করেছে, কিন্তু তাদের মর্যাদা নিচে হওয়ায় তাদের জন্য মর্যাদা বৃদ্ধির তিনি সুপারিশ করবেন। [খারেজী ও মু‘তাযিলারা এ অংশ মেনে নেয়, যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে] এর পক্ষে দলীল দেয়া হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, যা তিনি আবু সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর জন্য দো‘আয় বলেছেন, “আল্লাহুম্মা ইরফা‘ দারাজাতাহূ ফিল মাহদিয়্যীন” হে আল্লাহ, তার মর্যাদাকে আপনি হিদায়াতকারীদের পর্যায়ে উন্নীত করুন [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ৯২০] অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাইদ আবী আমেরকে বলেছিলেন, “ওয়াজ‘আলহু ফাওক্বা কাসীরিন মিন খালক্বিকা” হে আল্লাহ, আপনি তাকে অনেক সৃষ্টির উপরে রাখুন [বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ৪৩২৩, ৬৩৮৩; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৪৯৮]। আর কুরআন থেকেও এর দলীল দেয়া যায়, আল্লাহর বাণী, “”। [সূরা আত-ত্বূর: ২১]
৫- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক কিছু লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে দেয়ার জন্য সুপারিশ করা। যেমনটি তিনি উক্বাশাহ ইবন মুহসিন এর জন্য দো‘আ করেছেন, যাতে তাকে সত্তর হাজার লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। [দেখুন, বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ৫৮১১; মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২১৬-২১৭]
৬- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক জাহান্নামে যাওয়া ব্যক্তির আযাব কম হওয়ার সুপারিশ করা। যেমন তিনি আবু তালেব এর জন্য সুপারিশ করবেন। [বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ, হাদীস নং ৩৮৮৩, মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২০৯]
৭- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক সকল প্রকার মুমিনদের জান্নাতে প্রবেশের সুপারিশ। কারণ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি জান্নাতে প্রবেশের জন্য প্রথম সুপারিশকারী। [মুসলিম: ১৯৬]
৮- মদীনাবাসীদের জন্য রাসূলের সুপারিশ: এটি একটি বিশেষ সুপারিশ যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার কষ্ট সহ্য করে যারা সেখানে মারা যাবে তাদের জন্য সুপারিশ করবেন বলেছেন, হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে কেউ মদীনার আবহাওয়া ও কষ্ট সহ্য করে সেখানে মারা যাবে আমি তার জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবো অথবা সাক্ষ্য হবো”। [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ১৩৭৪, ১৩৭৭, ১৩৭৮]
৯- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সকল নবী, সকল নেককার জান্নাতী ঈমানদার ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক এ উম্মতের কবীরা গুনাহকারীদের জন্য সুপারিশকরণ, যারা জাহান্নামে প্রবেশ করেছে, তখন সুপারিশের কারণে সেখান থেকে বের হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমার সুপারিশ আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীদের জন্য’ [আহমাদ, আল-মুসনাদ ৩/২১৩; আবু দাঊদ, আস-সুন্নাহ ৪৭৩৯; তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৩৫; হাকিম, আল-মুস্তাদরাক ১/৬৯, ইমাম যাহাবী তাঁর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন]
মু‘তাযিলা ও খারেজীরা এ প্রকার শাফা‘আতকে অস্বীকার করে। কারণ তা তাদের মূলনীতির বিপরীত হয়েছে। সে মূলনীতি তাদের বিবেক নির্ধারণ করা নীতি, ‘যারা জাহান্নামে যাবে তারা আর বের হবে না, তারা সেখানে স্থায়ী হবে’। এ সর্বনাশা মূলনীতির কারণে তারা বহু হাদীস অস্বীকার করেছে।
তবে এ কথা স্মরণ থাকা দরকার যে,
১- আখেরাতের সুপারিশের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহ তা‘আলা।
২- যে সুপারিশ পেতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ হতে হবে:
এক. সুপারিশের জন্য আল্লাহর অনুমতি, আর তার প্রমাণ, আল্লাহর বাণী, “এমন কে আছে যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ব্যতীত?”। [সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৫]
দুই. সুপারিশকারীর প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর তার প্রমাণ, আল্লাহর বাণী, “সেদিন কারও সুপারিশ কাজে আসবে না, তবে যার জন্য রহমান অনুমতি দিবেন এবং তার ওপর সন্তুষ্ট হবেন”। [ত্বাহা: ১০৯] অর্থাৎ তার সুপারিশ যার জন্য আল্লাহর অনুমতি রয়েছে।
তিন. আল্লাহর পক্ষ থেকে যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি সামান্যতম সন্তুষ্টি (ঈমান ও ইসলামের অংশ থাকা), তার দলীল, আল্লাহর বাণী, “আর তারা কেউ সুপারিশ করবে না, তবে যার জন্য তাঁর সন্তুষ্টি আছে তার জন্য তা হবে…”। [সূরা আল-আম্বিয়া: ২৮] সুতরাং তাওহীদ থাকতেই হবে, যদিও কবীরা গুনাহকারী হয়। [শাওকানী, ফাতহুল কাদীর ৩/৪০৬]
এ শর্তগুলো সব একই আয়াতে একসাথে এসেছে, আল্লাহ বলেন, “আর আসমানে বহু ফিরিশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না, তবে যার জন্য ইচ্ছা তার অনুমতি হবে এবং যার ওপর ও যাদের জন্য সন্তুষ্টি থাকবে”। [সূরা আন-নাজম: ২৬] অর্থাৎ সুপারিশকারীর জন্য অনুমতি আর সুপারিশকারী ও সুপারিশকৃতের জন্য সন্তুষ্টি। [আস-সা‘দী, আত-তাফসীর: ৫/১৯১]
