Thursday, July 16, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াসমাজে যেভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন মহানবী (সা.)

সমাজে যেভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন মহানবী (সা.)

গোটা পৃথিবী ছিল ঘন অমানিশায় আচ্ছন্ন। মজলুমের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছিল আকাশ-বাতাস। অসহায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বঞ্চনার হিমালয়। গলাকাটা প্রাণীর মতো কাতরাচ্ছিলো মায়ের জাতি। বাতাসে ভেসে আসত নিপীড়িত মানুষের করুন আর্তনাদ। মানব সভ্যতা তখন ডুকরে কাঁদছিল। এমনি এক নাজুক সময়ে ন্যায় বিচারের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে আগমন করেন আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.)। প্রতিষ্ঠা করেন ন্যায় বিচারের এক অপূর্ব সমাজব্যবস্থা। কারণ সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তার আগমনের অন্যতম লক্ষ্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারের কিতাব এবং তা কার্যকর করার দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় সব রাসুল প্রেরণ করেছি।’ (সুরা হাদিদ: ২৫)

আকাশের তারা হয়তো গুনে শেষ করা সম্ভব। কিন্তু ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় নবীজির আদর্শকে সীমিত শব্দে তুলে ধরা অসম্ভব। তবু ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় নবীজির উল্লেখযোগ্য কিছু দিক তুলে ধরা হলো—

জীবনের নিরাপত্তা বিধান

জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। তাই নবীজি জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঐশী কণ্ঠে ঘোষণা করেন, কোনো কারণ ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে, সে যেন দুনিয়ার সব মানুষ হত্যা করল। আর কেউ কাউকে প্রাণে রক্ষা করলে, সে যেন দুনিয়ার সকল প্রাণ রক্ষা করল। (সুরা মায়েদা: ৩২)

নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা

ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা অতি জরুরি। তাই নবীজি (সা.) শতভাগ নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা চালু করেন। নবীজির বিচার ব্যবস্থায় চরম শত্রু বা প্রতিপক্ষও ইনসাফ বঞ্চিত হয়নি। ঐশী কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে নবীজি বলেন, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের বিদ্বেষ কখনো যেন ন্যায়বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করবে—কারণ তা তাকওয়ার নিকটবর্তী। (সুরা মায়িদা: ৮)

ন্যায়বিচার না করার ভয়ানক পরিণতির কথা ঘোষণা করে নবীজি বলেন, বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার বিচারক জান্নাতি আর দুই প্রকার বিচারক জাহান্নামি। জাহান্নামি বিচারক হলো যিনি সত্যকে জেনেও সে অনুসারে বিচার করে না। আরেক প্রকার বিচারক হলো, যে সত্যকে জানে না এবং বিচারে অনিয়ম করে। তারা উভয়ে জাহান্নামি। কিন্তু যে বিচারক সত্যকে জেনে সে অনুযায়ী বিচার করে সে জান্নাতি। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৭৩)

স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম বাধা হলো স্বজনপ্রীতি। তাই নবীজি সমাজের সর্বক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি বন্ধে কঠিন অবস্থান গ্রহণ করেন। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তিনি মুসলিম-অমুসলিম, অনুসারী বা বিরোধীর মাঝেও কোনো ধরনের প্রীতির আচরণ বরদাস্ত করতেন না। সমাজের উঁচু-নীচু সবার মাঝেও ন্যায় বিচার করতেন।

বৈষম্যমূলক বিচারকে ধ্বংসের কারণ সাব্যস্ত করে তিনি বলেন, পূর্ববর্তী যুগের মানুষ ধ্বংস হওয়ার একটি কারণ ছিল, তাদের সম্মানিত ব্যক্তিরা চুরি করলে ছাড় দেওয়া হতো। আর দুর্বল শ্রেণির কেউ চুরি করলে সাজা দেওয়া হতো।… এক ঘটনার প্রেক্ষিতে নবীজি ঘোষণা করেন, যদি আমার মেয়ে ফাতেমাও চুরি করত, তবু আমি তার হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিতাম। (সহিহ্ বুখারি: ৪৩০৪)

দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন

সুরাকা একজন ব্যক্তির নাম। তিনি এক বেদুইনের কাছ থেকে উট কিনে মূল্য পরিশোধের টালবাহানা করছিল। তখন বেদুইন নবীজি (সা.)-এর কাছে এ বিষয়ে নালিশ জানায়। নবীজির দরবারে তাকে পাঠানো হয়।

মূল্য পরিশোধ না করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সুরাকা বলল, আমার কাছে টাকা নেই। তখন নবীজি বেদুইনকে বললেন, তোমার উট বাজারে বিক্রি করে টাকা উশুল করে নাও। (দারাকুতনি)

শিক্ষা সম্প্রসারণ

শিক্ষা মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও মানবীয় গুণের বিকাশ ঘটায়। মানুষের মাঝে উন্মেষ ঘটে ইনসাফ, সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব ও সমঝোতার বোধ। শিক্ষার আলোয় দূরে সরে যায় অন্যায় ও অনৈতিকতার কালো মেঘ। ছড়ায় ন্যায়ের সুরভি।

তাই নবীজি (সা.) নারী-পুরুষ সবার জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেন। এমনকি শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা করে তিনি বলেন, হে আমার সম্প্রদায়, আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। (সুরা ফুরকান: ২০)

অপরদিকে অশিক্ষা হিংসা-বিদ্বেষ বিভেদের বীজ রোপিত করে। নবীজি এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন, যার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক সম্মানবোধ, ন্যায় বিচার ও মানবিকতাবোধ। (আল হায়সামি, কাশফুল আসতার: ২/৩৫)

সম্পদের সুষ্ঠু আবর্তন নিশ্চিত করা

এখনকার মতো ইসলাম পূর্ব সমাজে ধনসম্পদ ছিল আভিজাত্যের মাপকাঠি। কামিয়াব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। তাই মানুষ হালাল-হারাম, ন্যায়-নীতি তোয়াক্কা না করে সম্পদ অর্জনের পেছনে ছুটত।

নবীজি (সা.) অর্থ-সম্পদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে বুঝিয়ে দেন যে, জীবনে অর্থসম্পদ অপরিহার্য কিন্তু তা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং ধনসম্পদ ও দুনিয়ার সবকিছুই মানুষের খাদেম। পৃথিবীর সব বস্তু নিশ্চয়ই মানুষের সেবার জন্য সৃষ্টি। (সুরা বাকারা: ২৯)

আল্লাহ তাআলার বাণী তিনি মানুষের মাঝে পৌঁছে দেন, ‘আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং মানুষের ধনসম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৮)

তাকওয়াভিত্তিক সমাজ গঠন

সমাজ থেকে নবীজি (সা.) বংশীয় গৌরব ও আভিজাত্যের দেয়াল ভেঙে দেন। প্রতিষ্ঠা করেন মানবতা ও তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠা করেন ন্যায় বিচার। স্পষ্ট ভাষায় নবীজি (সা.) ঘোষণা দেন, ‘আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সব মানুষ একে অপরের ভাই। সব মানুষ আদমের বংশধর আর আদম মাটি থেকে তৈরি। (মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৩)

পবিত্র কোরআনের বাণী, ‘তোমাদের মধ্যে সেই বেশি সম্মানিত, যে বেশি তাকওয়ার অধিকারী।’ (সুরা হুজরাত: ১০)

লেখক: মুহাম্মদ এনায়েত কবীর

শিক্ষক, শেখ জনূরুদ্দীন রহ. দারুল কুরআন চৌধুরীপাড়া মাদরাসা, ঢাকা-১২২৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 + 11 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য