দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালে ১০১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। করোনার মধ্যে সামাজিক, আর্থিক ও পারিবারিক চাপে এসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠেছে। গতকাল শনিবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
দেশের প্রায় ৫০টি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার আত্মহত্যার সংবাদ বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফাউন্ডেশনটি।
সংগঠনটির তথ্য থেকে দেখা গেছে, বিদায়ি বছরে আত্মহত্যাকারীদের একটি বড় অংশই ছিল ছাত্র। ছাত্রীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ছাত্র বিদায়ি বছরে আত্মহত্যা করেছেন। মোট ৬৫ ছাত্র আত্মহত্যা করেছেন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৬৪.৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রী ছিল ৩৬ জন বা ৩৫.৬৪ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশই সম্পর্কের অবনতির কারণে আত্মহত্যা করে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটের পরিচালক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক কে এম সাইফুল ইসলাম খান, অভিনেত্রী ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ।
আঁচলের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্পর্কগত কারণে ২৪.৭৫ শতাংশ এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে ১৯.৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৫.৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ। এ ছাড়া পড়াশোনাসংক্রান্ত কারণে মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছেন ১০.৮৯ শতাংশ এবং আর্থিক সমস্যায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ৪.৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া মাদকাসক্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন ১.৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যান্য কারণে আত্মহত্যা করেছেন মোট ২১.৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি ৬১.৩৯ শতাংশ বা ৬২ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১২, যা মোট আত্মহননকারীর ১১.৮৮ শতাংশ। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংখ্যাটি ৪ বা ৩.৯৬ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন, যা হার করলে দাঁড়ায় ২২.৭৭ শতাংশে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষাসংক্রান্ত যেমন পড়াশোনার চাপ, বিভিন্ন পরীক্ষায় ব্যর্থতা, পরিবারের সঙ্গে অভিমান, প্রেঘটিত সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব ইত্যাদি নানাবিধ কারণ আত্মহত্যার জন্য দায়ী।
সংবাদ সম্মেলনে আঁচল ফাউন্ডেশন কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মেন্টাল হেলথ প্রফেশনাল নিয়োগ দেওয়া এবং ইয়ুথ অর্গানাইজেশনকে যথাযথ প্রশিক্ষণের আওতায় আনার মাধ্যমে যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করা, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কুসংস্কার ও হীনম্মন্যতা দূরীকরণে প্রাথমিক স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহে জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় হটলাইন সেবা চালু করাসহ ১০টি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়।
