সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি অনলাইন প্ল্যাটফরম, যেখানে ব্যক্তি তার চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতিসহ মানবীয় বিষয়গুলো তার নিজস্ব নেটওয়ার্কে শেয়ার করতে পারে ৷ অন্য কথায়, যে মাধ্যমে নিত্যদিনের তথ্যাবলি খুব সহজে অল্প সময়ে এক স্থান থেকে অসংখ্য মানুষের কাছে লিখিত বা ভিডিওর মাধ্যমে একই সময়ে পাঠানো যায় তার নাম সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। জনপ্রিয় কয়েকটি সামাজিক মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, গুগল প্লাস, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেমন সঠিক তথ্য প্রচারের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে, তেমনি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারেরও বিরাট সুযোগ আছে। এ সুযোগের অপব্যবহার করে অনেকে বিভিন্ন ব্যক্তি, দল ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়।
ফলে অনেকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়। এতে বহু ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয় এবং সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হয়৷ তাই এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচারের মোকাবেলায় আমাদের অনেক করণীয় আছে।
কোরআন-হাদিসের দিকনির্দেশনার আলোকে উল্লেখযোগ্য কিছু করণীয় বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :
১. তথ্য যাচাই-বাচাই করা
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত কোনো তথ্য যাচাই-বাচাই ছাড়া গ্রহণ করা এবং তা অন্যের কাছে প্রচার করা হতে বিরত থাকতে হবে।
তাহলে কেউ অপপ্রচার চালিয়ে স্বার্থোদ্ধার করতে পারবে না। কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে গ্রহণ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)
২. সঠিক তথ্য প্রচার করা
সমাজিক মাধ্যমে কেউ যদি কোনো বিষয়ে অপপ্রচার চালায় তাহলে উপযুক্ত দলিল-প্রমাণসহ সে বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রচার করতে হবে। সত্য প্রকাশিত হলে মিথ্যা এমনিতেই অপসারিত হবে।
এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘বলো, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ৮১)
৩. সবাইকে সচেতন করা
সামাজিক মাধ্যমে অনেকে সঠিক তথ্য গোপন করে এবং সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত তথ্য প্রকাশ করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে সত্যকে প্রকাশ করে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তুলে ধরে সবাইকে সচেতন করতে হবে। কেউ মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে সচেতন জনগণকে ধোঁকা দিতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ো না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে তোমরা গোপন করো না।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ৪২)
৪. সত্যপন্থীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা
সত্যপন্থীরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাহলে তারা কখনো অপপ্রচারের সাহস পাবে না, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ ঐক্যের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ করো; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩)
৫. অপপ্রচারকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা
রাষ্ট্রীয় ও সমাজিকভাবে অপপ্রচারকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে কেউ সহজে অপপ্রচার করতে সাহস পেত না। এ ক্ষেত্রে কোরআনে উল্লিখিত মহান আল্লাহর এ ঘোষণা থেকে আমরা দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর সপক্ষে চারজন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই নাফরমান।’ (সুরা : আন-নুর, আয়াত : ৪)
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিষয়ে করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত সহযোগিতা। এ ব্যাপারে সাধ্যমতো চেষ্টা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
লেখক : প্রভাষক (আরবি), রাজারভিটা ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা, চিলমারী, কুড়িগ্রাম।
