গাজায় চলমান সহিংসতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৭০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস। এতে ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছিল। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে আলোচনা করা চুক্তিটি ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং ‘হতাশাজনক’। রয়টার্স সংবাদ সংস্থা অনুসারে, ইসরাইলি কর্মকর্তারাও এ প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের বলে অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন যে, কোনও ইসরাইলি সরকার এটি গ্রহণ করবে না। গাজায় ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরাইলি বাহিনী তাদের নিরলস বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখার এবং অবরুদ্ধ ছিটমহলে ত্রাণ প্রবেশে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনগুলো সামনে এলো। আল জাজিরার সূত্র জানিয়েছে যে, হামাস এবং মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ কাতারের রাজধানী দোহায় এক বৈঠকে খসড়া চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন। তারা বলেছেন যে এর মধ্যে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং গাজায় আটক ১০ জন জীবিত বন্দীর মুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দুই ধাপে সম্পন্ন হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির শর্তাবলী এবং গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। সূত্র জানিয়েছে, চুক্তির মাধ্যমে প্রথম দিন থেকেই কোনও শর্ত ছাড়াই মানবিক সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। তবে, উইটকফ এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করে রয়টার্সকে বলেছেন যে হামাস বন্দী ও যুদ্ধবিরতির জন্য তার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। উইটকফের ঘনিষ্ঠ একটি মার্কিন সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে যে হামাসের দাবি ‘ভুল’ এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর চুক্তি ‘হতাশাজনক’। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার কিম্বার্লি হ্যালকেট মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, টেবিলে থাকা প্রস্তাবটি ইসরাইলের সাথে কেবল একটি ‘অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি’।
এদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি রেকর্ড করা বার্তা জারি করেছেন, যেখানে গাজায় অবশিষ্ট ৫৮ জন ইসরাইলি বন্দীকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন এখনও জীবিত বলে মনে করা হচ্ছে। ইসরাইলি নেতা প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয়ে কোনও উল্লেখ করেননি। জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে আল জাজিরার হামদা সালহুত জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য হামাসের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
হামাস তাদের পক্ষ থেকে জানিয়েছে যে তারা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে অবশিষ্ট বন্দীদের মুক্তি দিতে ইচ্ছুক। তারা আরও বলেছে যে তারা গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে ইচ্ছুক, যেমনটি আরব লীগ-সমর্থিত ৫৩ বিলিয়ন ডলারের ছিটমহল পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটি অস্ত্র জমা দিতে বা গাজা থেকে তাদের নেতাদের নির্বাসনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, বলেছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি ভূখ-ে ইসরাইলের দখল অব্যাহত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই দাবি তারা মেনে নেবে না।
গাজায় ভয়াবহ হামলায় একদিনেই শহীদ ৮১ : ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) বিমান অভিযানে রোববার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নিহত হয়েছেন ৮১ জন ফিলিস্তিনি। নিহতদের মধ্যে ৫৩ জনই গাজার প্রধান শহর গাজা সিটির বাসিন্দা ছিলেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৬৯ জন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে এ তথ্য। সংঘাতের ১৯তম মাসে প্রবেশ করে এই সংখ্যা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান সত্ত্বেও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) থামছে না।
বিমান হামলায় ১১ বছরের মানবাধিকার কর্মী ইয়াকিন নিহত : গাজায় দখলদার ইসরাইলি বিমানহামলায় শহীদ হলেন শিশু মানবাধিকার কর্মী ইয়াকিন হাম্মাদ। ১১ বছরের ফুটফুটে এই কিশোরী বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলির হাতে ত্রাণ এবং খাবার পৌঁছে দিত। গাজার কনিষ্ঠতম মানবাধিকার এবং সমাজমাধ্যম কর্মী ছিল সে-ই। গাজার দেইর আল-বালাহয় ইসরাইলের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় মৃত্যু হয়েছে তার।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, সম্প্রতি দেইর আল-বালাহর অন্তর্গত আল-বারাকা এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় মৃত্যু হয়েছে ইয়াকিনের। সমাজমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে বেশ পরিচিত ছিল ইয়াকিন। সেখানে খুদে এই মানবাধিকার কর্মীর প্রায় এক লাখের কাছাকাছি অনুরাগীও রয়েছেন। সমাজমাধ্যমের পাতায় নিজের জীবনের নানা মুহূর্তের পাশাপাশি নানা সমাজসেবামূলক কাজের প্রচারও করত ইয়াকিন। কখনও কখনও ১১ বছরের এই কিশোরী ও তার ভাই মহম্মদ হাম্মাদ মিলে খাদ্য এবং ত্রাণ পৌঁছে দিত বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলির কাছে। দুই ভাই-বোন গাজায় কর্মরত অলাভজনক মানবাধিকার সংস্থা ‘ওনিয়া কালেক্টিভ’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ইসরাইলের উপর্যুপরি হামলার মুখে গাজাবাসীকে এক টুকরো আশা দেখিয়েছিল ইয়াকিনের সমাজমাধ্যমের পেজ। তার সাহসিকতা অনুপ্রাণিত করেছিল বিশ্বের হাজার হাজার মানুষকে। তাই ইয়াকিনের মৃত্যুর পর শোকবার্তায় ভরে গিয়েছে সমাজমাধ্যম। প্রকাশ্যে এসেছে ইয়াকিনের পুরনো বেশ কিছু ভিডিও। সে রকমই একটি ভিডিওতে একটি অস্থায়ী চুলা বানিয়ে রান্না করতে দেখা গিয়েছে শিশু ইয়াকিনকে। ইসরাইল রান্নার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার পর রান্নার জন্য এই চুলাটি তৈরি করেছিল ইয়াকিনের পরিবার। ওই ভিডিওর নীচে শোকপ্রকাশ করেছেন বহু মানুষ। একজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ইয়াকিন হাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে। ইয়াকিন, তুমি স্বর্গের পাখি হও!’ সূত্র : আলজাজিরা, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান।
