গুম করে আয়নাঘরে বন্দি রাখা ২৫ জনের জন্য একটি টুথ ব্রাশ ও একটি গামছা দেয়া হতো। একটি টুথ ব্রাশ ও একটি গামছা সবাইকে ব্যবহারে বাধ্য করা হতো। এতে বন্দিদের চোখের লাল সংক্রমণসহ দেহে নানা ধরনের ব্যাধির সৃষ্টি হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জোরপূর্বক অপহরণ ও গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলায় অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানির সময় ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এসব কথা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সারা দেশে অসংখ্য মানুষকে গুম করার জন্য যখন দেশি-বিদেশি সংস্থার নানা অভিযোগ করলেও শেখ হাসিনা সরকার গুমের জন্য ভিকটিম পরিবারকেই দায়ী করতো। অনেক সময় গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবার পরিজনদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কুৎসা রটনা করা এবং ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদেরকে জোরপূর্বক গণভবনে এনে সহানুভূতির নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। আয়নাঘর নিয়ে এমনই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে প্রসিকিউশনের শুনানিতে।
সেনাবাহিনীর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ আসামি গ্রেপ্তার হয়ে সাব-জেলে আছেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এদিন মামলার অভিযোগ গঠনের উপর রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষ হয়। তবে মামলার প্রিপারেশন নেয়ার জন্য আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সময় আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল আগামী ৯ই ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। গতকাল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এই দিন ধার্য করেন।
শুনানিতে যা বলে প্রসিকিউশন: চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরের দক্ষিণ পাশে মেস-বি এর মাঝে একটি দোতলা ভবনে ছোট ছোট খোপের মতো বন্দিশালা ছিল। এটি জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার- পরবর্তীতে আয়নাঘর নামে পরিচিতি লাভ করে। এ বন্দিশালায় ছিল মোটা রডের গ্রিল ও বাইরে ছিল ঢাকনা। ভেতরে কোনো আলোর ব্যবস্থা ছিল না। প্রত্যেকটা সেলের ভেতরে সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকতো। ছোট ভেন্টিলেটর ছিল। এ ছাড়া যখনই আজান হতো তখন এডজাস্ট ফ্যান চালানো থাকতো। কখনো উচ্চশব্দে সাউন্ড বক্সে গান বাজানো হতো। বন্দিরা যেন আজান বা বাইরের কোনো শব্দ শুনে বুঝতে না পারেন এটা কোন জায়গা। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, অনেক সময় মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হতো যে, এই এলাকার অমুক ব্যক্তি ইন্তেকাল করেছেন। তার জানাজা অমুক মসজিদে এতটা সময় অনুষ্ঠিত হবে, তখন তো বন্দিরা এটি শুনে সেলের লোকেশন জেনে যাবে। সেজন্য আয়নাঘরের করিডোরে বড় এডজাস্ট ফ্যান চালানো হতো।
তাজুল বলেন, এই শব্দ নিয়ন্ত্রণের পরও একজন বন্দি এই জায়গার লোকেশন চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তিনি সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান। তিনি গুম থেকে ফিরে এসে আয়নাঘরের কথা বলেছেন। তার মাধ্যমে সারা বিশ্ব এই আয়নাঘর সম্পর্কে জেনেছে।
গুমের নির্দেশ দিতেন শেখ হাসিনা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই গুমের নির্দেশদাতা ছিলেন। তার সরাসরি নির্দেশ ও জ্ঞাতসারে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাগুলো ঘটতো বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আটক ও গুম করার সিদ্ধান্ত হাসিনার নিকট থেকে তার সামরিক ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন হতো। তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর গুমের নির্দেশনা কার্যকর করতেন ডিজিএফআই’র ডিজি এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন সিটিআইবি এর পরিচালকগণ। যারা তাদের অধীনস্থ ছিল।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে গুম করতেন লে. কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক: এই মামলার আসামি লে. কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক অপর আসামি তারিক সিদ্দিকীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থেকে মাঠ পর্যায়ে গুমের ভিকটিমদের চিহ্নিত করতেন। তৎপর মাঠ পর্যায়ের অন্য সহযোগীদের নিয়ে তাকে অর্থাৎ গুমের ভিকটিমকে অপহরণ করে জে.আই.সি-তে নিয়ে আসতেন। যেখানে ভিকটিমদের তথাকথিত জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাদের অধস্তনদের দ্বারা গুমের শিকার ব্যক্তিদেরকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হতো আয়নাঘরে। এমনকি মখছুরুল হক যখন চাকরি থেকে অবসরে যান, তখনো ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি গুমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ করেন চিফ প্রসিকিউটর।
সেনা কর্মকর্তারা যেভাবে আসামি হলেন: চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ২২শে অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৬ই আগস্ট পর্যন্ত যারা ডিরেক্টর জেনারেল ও সিটিআইবি’র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে তারা প্রত্যেকে গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল। মেজর জেনারেল মো. আকবর হোসেন (৮ই আগস্ট ২০১৩ থেকে ১লা ফেব্রুয়ারি ১০১৭), মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন (২রা ফেব্রুয়ারি ’১৭ থেকে ৪ঠা মার্চ ’২০), মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আলম (৫ই মার্চ ’২০ থেকে ২৭শে জুলাই ’২১), মেজর জেনারেল আহম্মদ তাবারেল শামস চৌধুরী (২৮শে জুলাই ’২১ থেকে ২রা নভেম্বর ’২২), মেজর জেনারেল হামিদুল হক (৩রা নভেম্বর ’২২ থেকে ৫ই আগস্ট ’২৪) পর্যন্ত ডিজিএফআই’র ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ঘটনাকালীন সময়ে সিটিআইবি’র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্রি. জেনারেল মোহাম্মদ তৌহিদ-উল-ইসলাম, পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত (নভেম্বর ’১৪ থেকে আগস্ট ’১৮), ব্রিঃ জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত (১৭ই আগস্ট ’১৮ থেকে ৬ই ফেব্রুয়ারি ’২০), বিঃ জেনারেল কবীর আহাম্মদ, পরবর্তীতে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত (৯ই মে ’২০ থেকে ২০শে মার্চ ২২), আসামি ব্রি. জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী (১৫ই মার্চ ’২২ থেকে ২৯শে মে ’২৩) এবং আসামি বি. জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী (৩০শে মে ’২৩ থেকে ৫ই আগস্ট ’২৪) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তাজুল বলেন, অপরাধ সংঘটনে আসামিদের ঊর্ধ্বতন অবস্থান এবং যৌথ দায় রয়েছে। তাদের জ্ঞাতসারে এসব অপরাধ হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি এমনকি প্রতিহতও করেননি। শেখ হাসিনা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ীভাবে পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গঠিত ডিজিএফআই’র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্সিকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া তারিক সিদ্দিকীর নির্দেশে আসামিরা বিভিন্ন এজেন্সির সদস্যদের মাধ্যমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পরামর্শে মাঠ পর্যায়ে ব্যক্তি চিহ্নিত করে গুমের শিকার উল্লিখিত ব্যক্তিরা সহ অসংখ্য নিরীহ মানুষকে আটক ও অপহরণপূর্বক গুম করার মাধ্যমে সিটিআইবি’র অধীন পরিচালিত জেআইসি অর্থাৎ আয়নাঘরে গুম করে রেখে তাদের অধীনস্থ দ্বারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আটক ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে, নির্যাতন অব্যাহত রাখতে বাধ্য করে, সকল নির্যাতনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে আসামিরা তাদের স্ব-স্ব পদের ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ পালন করে, নির্দেশ অনুযায়ী অপহরণ করে গুম করে রেখে/তাদের অধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন অফিসার ও ফোর্সদের নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে।
