প্রশ্ন : ড. মরিস বুকাইলি রচিত “বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান” বই সম্পর্কে এবং বইয়ের লেখক সম্পর্কে জানতে চাই । লেখকের আক্বীদাহ, মানহাজ কেমন?
উত্তরঃ
তিনি একজন সত্যান্বেষী ছিলেন। তিনি একজন ডাক্তার ছিলেন, Mummies of Pharaoh নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কুরআনের বিষয়ে জানতে পারেন। তারপরে তিনি কুরআনের ফ্রেন্চ অনুবাদ পড়েন, তারপরে ইংলিশ। অনুবাদ দুটো পড়ার পর ওনার মনে হয়েছে যে অনুবাদগুলো যথাযথ নয়। তাই তিনি ৫০+ বছর বয়সে এরাবিক(আরবি) ভাষা শিখেন। এরাবিক ভাষা শিক্ষার পরে তিনি কুরআন কে আবার পড়েন, এবং তার মনে হয়েছে কুরআনে এমন অনেক সায়েন্টিফিক ইনফরমেশন আছে যা কেউ বুঝেনি। যেহেতু তিনি একজন ডাক্তার, তাই তিনি সেগুলো বুঝেছেন।
পরে তিনি বই লিখেন “The Bible, The Quran And Science” এই বইয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, বাইবেলে অনেক সায়েন্টিফিক ভুল-ত্রুটি আছে, কিন্তু কুরআনে কোন সায়েন্টিফিক অসংগতি নেই।
তিনি একজন ক্যাথলিক খ্রিস্টান ছিলেন, এই বইটি লেখার পরে ক্যাথলিকরা তাকে বয়কট করে এবং তার বিরুদ্ধে অনেক কিছু করে। কিন্তু তিনি কখনো পিছ-পা হননি। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত যেটা সত্য বলে মনে করতেন সেটা প্রচার করেছেন। তিনি একজন রিসার্চার ছিলেন, তিনি বিজ্ঞানপ্রেমী ছিলেন, এবং তার কাছে ইসলাম (কুরআন) কে বিজ্ঞানময় মনে হয়েছে।
তিনি ইসলামকে ভালোবাসতেন, মুহাম্মদ স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসতেন। সত্যকে ভালোবাসতেন।
তিনি কি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তরঃ
এ বিষয়ে বেশ দ্বিমত রয়েছে। তার ক্যাথলিক বন্ধুদের মতে, তিনি ধর্মীয় দিক থেকে ক্যাথলিক-ই ছিলেন কিন্তু তিনি ইসলামকে ভালোবাসতেন, সত্যকে ভালোবাসতেন তাই তার কাছে যেটা সত্য মনে হয়েছে তিনি তা প্রচার করেছেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি।
কিছু মুসলিম স্কলার যারা একই বিষয়ের উপরে কাজ করেছেন, যথা কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে, যাদের ড. মরীস বুকে/বুকাঈ এর সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে তাদের মতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিনা তারা জানেন না। অন্যদের মতে তারা জানেন না যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিনা তবে তার কথাবার্তায় তাকে তাদের মুসলিম মনে হতো। কিন্তু তিনি কোনদিন নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেননি।
আরেকদল মুসলিম স্কলারদের মতে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তিনি এই বিষয়টি পাবলিকলি সবাইকে জানান নি এবং তিনি বিষয়টি প্রাইভেট রাখতেই পছন্দ করতেন। তার পরিবারকে এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা এসব বিষয়ে কিছু বলেন না। তবে মুসলিম বিশ্বে এটাই প্রসিদ্ধ যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
তার বই পড়লে, বক্তব্য শুনলে, তার কথাবার্তা, চালচলনে তাকে সত্যিই মনে হয় তিনি একজন সিন্সিয়ার ব্যক্তি ছিলেন, একজন মুসলিম ছিলেন। তিনি যদি মুসলিম হয়ে থাকেন, তাহলে আমরা দুআ করি, আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তাআলা যেন তার ভুল ত্রুটি ক্ষমা করেন, এবং জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। বাকিটা আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তাআলা-ই ভালো জানেন।
তো উনার আক্বীদা কি ছিল আমরা জানি না, তার মানহাজ কি ছিল আমরা জানি না, তিনি আদৌ মুসলিম ছিলেন কিনা তাও আমরা অকাট্যভাবে জানিনা, আমরা আশা করি তিনি মুসলিম ছিলেন।
তার লিখিত বইটি কেমন?
উত্তরঃ
তার বইটি ভালো, কোন দিক দিয়ে ভালো?
কুরআন এবং বিজ্ঞানের দিক দিয়ে।
বইটিতে কি কোন ভুল-ত্রুটি আছে?
অবশ্যই আছে।
যেহেতু তিনি কোনো ইসলামিক স্কলার ছিলেন না, তাই তিনি বেশ কিছু ভুল করেছেন। এক দিক দিয়ে বইটিতে তিনি বেশ কিছু জাল-যঈফ সনদের হাদীস উল্লেখ করেছেন। আবার অন্য দিক দিয়ে বুখারী-মুসলিমের সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করেছেন, কারণ সেসব হাদীস তার যুক্তিতে বিজ্ঞান বিরোধী।
বলাবাহুল্য যে তিনি বহু সহীহ হাদীসের বিশুদ্ধতার উপরে অভিযোগ করেছেন। হাদীস এর গুরত্ব নিয়ে বা মানা নিয়ে ওনার বিভ্রান্ত ধারনা এই বইয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যদি মুসলিম হয়েও থাকেন, তাহলে তিনি এক ধরনের হাদীস অস্বীকারকারী তথাকথিত মুসলিম ছিলেন। ওয়াল্লাহু আলাম।
বইটি আমি সেই ২০০৪/৫ এর দিকে পড়েছি। তখন আমার ইসলামের জ্ঞান তত পরিপক্ক ছিলোনা। তাই ওটাতে আরও কোন ভুলত্রুটি আছে কিনা জানিনা। তবে ওনার লিখিত বইয়ের একটি সম্পাদিত সংস্করণ পাওয়া যায়, যার সম্পাদনা করেছেন ড. বিলাল ফিলিপ্স হাফিযাহুল্লাহ, ঐ সংস্করণে তেমন কোন ভুল ছিলো বলে মনে পড়ছে না। যদিও সেটি শুধু কুরআন এন্ড মডার্ন সায়েন্স নিয়ে ছিলো।
কুরআনকে বিজ্ঞানের আলোকে বোঝা বা ব্যাখ্যা করা কি ঠিক?
উত্তরঃ
সবকিছুই একটা লিমিটের মধ্যে থাকা উচিত। লিমিটের বাইরে গেলেই সমস্যা, বিভ্রান্তি ও ফিতনা হয়। এই বিষয়েও তাই হয়েছে। কুরআন কোন বিজ্ঞানের কিতাব নয়, যদিও এতে কিছু বৈজ্ঞানিক নিদর্শন আছে। এতে কোন সমস্যা নেই, ইন শা আল্লাহ্। কিন্তু এই “কুরআন এন্ড মডার্ন সায়েন্স” বিষয়টাকে সেই ১৯৭০ এর দশক থেকে এমন ভাবে প্রচার করা হয়েছে যে, অনেক মানুষ এর ফলে কোরআনের সবকিছুকে বিজ্ঞান দিয়ে মাপা শুরু করে। বিজ্ঞান হয়ে ওঠে তাদের মানদণ্ড।
কুরআনের এই বিষয়টার বৈজ্ঞানিক এক্সপ্লেনেশন(ব্যাখ্যা) কি, এটার পিছনে কী রহস্য হতে পারে? কুরআনে এইটা হালাল; তার পিছনে সায়েন্টিফিক কারণ কি, কুরআনে এইটাকে হারাম বলা হয়েছে, তার পিছনে সায়েন্টিফিক রহস্য কি? দাড়ি রাখতে বলা হয়েছে, তার মেডিক্যাল বেনিফিট কি?টাখনুর উপরে প্যান্ট পড়তে বলা হয়েছে, তার কারণ কি হতে পারে?
ইসলামের সবকিছুর পিছনে সায়েন্টিফিক কারণ কি? বেনিফিট কি? প্রশ্ন, প্রশ্ন আর প্রশ্ন? এমন মনভাব যেন কুরআন একটি বিজ্ঞানের বই। আমাদের দেশীও একজন মুফতি তো বলেই ফেললেন, কুরআন এবং হাদীসেতো শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান। এটা একটা ফিতনাহ এবং গুমরাহি। বিজ্ঞান ও যুক্তির মানদণ্ডে ইসলাম বোঝা আহলুস সুন্নাহ’র মুলনীতি নয়। কুরআন এবং হাদীসকে বুঝতে হবে সালাফদের মানহাজ অনুযায়ী। সালাফদের মানহাজই হচ্ছে সবচেয়ে আসলাম(নিরাপদ), আ‘লাম এবং আহকাম।
যারাই সালাফদের মানহাজ থেকে সরে গিয়েছে, তারাই বিভ্রান্ত হয়েছে। এই কুরআন ও বিজ্ঞানের ফিতনায় পড়ে অনেকেই বিজ্ঞান সঠিক বা ভুল, বিজ্ঞানের সবকিছু কোরআন থেকে প্রমাণ করা শুরু করে দিয়েছে। অনেকে-তো কুরআন থেকে এটাও প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে, মানুষ বিবর্তনের (evolution) মাধ্যমে এসেছে। তারা অনেক মু’জিযা অস্বীকার করেছে, সেসব মু’জিযার প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে, মুসা (আ.) সাগর দ্বিখণ্ডিত করেননি, ওটা একটি কাকতালীয় ভাবে জোয়ার ভাটা ছিলো ব্যাস…….
যারা কুরআনের অনেক কিছু যা সায়েন্সের সীমাবদ্ধতার (ত্রুটির) কারণে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক; সায়েন্সের দ্বারা কুরআনের সেই বিষয়টিকে প্রমাণ করতে পারেনি, তারা তখন কুরআনের সেই আয়াতকে অস্বীকার করেছে। আবার অনেকে কুরআনের সেই আয়াতগুলোকে অস্বীকার না করলেও দূরবর্তী বিকৃত অর্থ করেছে। হাদীসের ক্ষেত্রে-তো এটা একেবারেই পাইকারি হারে করেছে, মানে যুক্তির সাথে না মিললে, ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞানের সাথে না মিললে সেই নির্দিষ্ট হাদীসকে অস্বীকার করা হয়েছে। কেউ কেউ তো একেবারে গোটা হাদীসকেই (হাদীসের ভাণ্ডারকেই) অস্বীকার করে বসে।
শেষ কথা …
তো এই “কুরআন এন্ড মডার্ন সায়েন্স” জিনিসটাকে মানুষ এমন পাইকারি হারে ব্যবহার করেছে যে, অনেক সময় কোরআনের আয়াত কেও তারা বিকৃত করেছে। লেবু বেশি কচলালে যেমন তিতা হয়ে যায়, এই বিষয়টাও তেমন হয়ে গিয়েছে।
এর ভালো দিক যতোটুকু আছে, তার চেয়ে খারাপ দিক টাই বেশি বলে মনে হয়। আমাদের মানদণ্ড ঠিক করতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, আমার মাথায় বা যুক্তিতে যদি কুরআন বা হাদীসের কিছু না আসে, তাহলে আমার মাথা নষ্ট, আমার বুদ্ধি কম। কুরআনের সাথে যদি সমসাময়িক সায়েন্সের দ্বন্দ্ব হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে- সায়েন্স এখনো ত্রুটিপূর্ণ, ভুল এবং সায়েন্স এখনো সেই উন্নতি করেনি যে কুরআনের ব্যাখ্যা করবে।
কত অমুসলিমকে দেখেছিলাম, কুরআনের বিভিন্ন সাইন্টিফিক নিদর্শনের বিষয়ে পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিন্তু যখনি কোন অমুসলিম কুরআনের সেই তথাকথিত সায়েন্টিফিক নিদর্শনকে ভুল প্রমাণ করে, সাথে সাথে তারা আবার ইসলাম ত্যাগ করে। মুসলিম হওয়ার ভিত্তিই যদি ভুল হয়, তাহলে এমনটি ঘটা একেবারেই অনিবার্য।
আমাদের মানদণ্ড হচ্ছে ওয়াহি(কুরআন), আমরা কুরআন দিয়ে সবকিছুকে মাপবো, এমনকি বিজ্ঞানকেও। উল্টাটা যেন না হয়, আমরা যেন বিজ্ঞান দিয়ে কোরআনকে মাপা শুরু না করি। আমাদের কুরআনের ওপর বিশ্বাস যেন এজন্য হয় যে, এটা আল্লাহর তরফ থেকে ওয়াহি । এটাতে সায়েন্টিফিক ইনফরমেশন আছে, সেই জন্য নয়। আমরা এটা কেন করি? আমরা এটাতে কেন বিশ্বাস করি? আমরা এজন্য করি, কারণ আল্লাহ্ বলেছেন, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন। এটাই হওয়া উচিৎ আমাদের মানদণ্ড।
এই বিষয়ের উপরে অনেক অনেক কথা বলা ও লেখা যাবে। জানি না ঠিকমতো উত্তর দিতে পেরেছি কিনা। তবে এখন আর বেশী লিখতে ইচ্ছা করছে না। এই বিষয়ে যদি কোন স্পেসিফিক কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে জিজ্ঞেস করতে পারেন, সময় সাপেক্ষে অবশ্যই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
আপনাদের ভাই
__মোহাম্মদ ওমর ফারুক মিল্কি
