গত ডিসেম্বরে দেশে গিয়ে জুমার নামাজ পড়ার সুযোগ পেলাম। খুতবা-পূর্ববর্তী বয়ানে ইমাম আলোচনা করছিলেন ‘ইসলামে পোশাক-আশাক’ বিষয়ে। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছিলাম। ভাবছিলাম, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পোশাক নাজিলের তাত্পর্য নিয়ে আলোচনা করবেন, আদম ও হাওয়া (আ.)-এর প্রসঙ্গ টেনে বোঝাবেন মানুষের কাপড় খুলে নির্লজ্জ করা শয়তানের প্রধান কাজ; আর পোশাক বিষয়ে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা এবং বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন, যেখানে আরব-অনারব সবারই স্থানীয় সংস্কৃতির স্বীকৃতিপূর্বক এক মিলিত মোহনার কথা থাকবে।
কিন্তু না, এর কোনোটাই তাঁর আলোচনায় স্থান পেল না। তবে তিনি তাঁর আলোচনায় তিনটি বিষয় তুলে ধরলেন, ১. যারা টাকনুর নিচে কাপড় পরবে, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম, ২. শাড়ি হিন্দুদের পোশাক, মুসলিম নারীর পোশাক হলো ম্যাক্সি, ৩. শার্ট-প্যান্ট হলো পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিস্টানদের পোশাক। এ ছাড়া তিনি যে বার্তাগুলো শ্রোতাদের দিলেন, তা সম্ভবত একটাও পরিপূর্ণ ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের অনেক খ্যাতিমান আলেম এবং মুফতিকেও এমনটিই বলতে শুনেছি। তাঁরা মর্মার্থ বিবেচনা না করে শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করে এমন ফতোয়া দেন, যাতে বহু মুসলমানের গায়ে ‘অপরাধী’ বা ‘জাহান্নামি’ তকমা লেগে যায়। এটা সাধারণ মুসলমানের ওপর এক ধরনের ‘অবিচার’ ছাড়া কিছু নয়।
ওয়াজ-মাহফিল বাংলাদেশের একটা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। ইসলামকে সজীব রাখতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা তেমন না থাকলেও এই ওয়াজ-মাহফিলগুলো সাধারণ মানুষকে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ওয়াজ-নসিহতের জনপ্রিয়তা নিঃসন্দেহে একটা ইতিবাচক দিক। বহু যুগোপযোগী চমত্কার চিন্তাশীল আলোচনার পাশাপাশি ইদানীং কিছু আলোচনায় পাই কাদা ছোড়াছুড়ি, অন্যের চরিত্র হনন, ফিকহি বিতর্ক, কল্পকাহিনি এবং ফতোয়ার তীর-বৃষ্টি। বিনা বিচারে একজন আলোচক অন্যকে ‘কাফির’ আখ্যা দিচ্ছেন। ‘মতের অমিল হলেও মনের অমিল কাম্য নয়’—দ্বিনের এই মৌলিক বিষয়েও সম্ভবত তারা অজ্ঞাত। অনেকের ভেতর দ্বিনের জ্ঞান থাকলেও ‘দ্বিনি খাসলাত’ (ইসলামী স্বভাব) এবং দ্বিনি তারবিয়ত (ইসলামের ব্যাবহারিক প্রশিক্ষণ) অনুপস্থিত। ফলে তাদের দ্বারা উন্মোচিত হচ্ছে ইসলামের অপব্যখ্যা, হানাহানি এবং ফিতনা-ফ্যাসাদের দ্বার।
ওপরের দুই কারণে বাংলাদেশে একটা স্বাধীন (Independent) এবং কার্যকর (Well-Functioning) কেন্দ্রীয় ফতোয়া বা ফিকাহ কাউন্সিল থাকা জরুরি। যার সদস্যরা ইসলামের অন্যান্য মৌলিক যোগ্যতার, যেমন—আরবি ভাষাতত্ত্ব, উলুমুল কোরআন, উলুমুল হাদিস, ফিকহ, আস-সিরাহ, উসুলুদ-দ্বিন, ইসলামের ইতিহাস ও ইতিহাসতত্ত্ব ইত্যাদির পাশাপাশি নিম্নোক্ত যোগ্যতার অধিকারী হবেন—
১. হানাফি মাজহাবের বাইরে অন্য মাজহাবগুলো সম্পর্কেও পাণ্ডিত্য থাকবে।
২. মাকাসিদ আশ-শারিয়াহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকবে।
৩. বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তথা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের আলেম ও ইসলামী স্কলারদের মতামত সম্পর্কে অবগত থাকবেন।
৪. ‘মতবিরোধের ইসলামী নীতিমালা’ সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান ও চর্চা থাকবে।
৫. আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কেও সম্যক ধারণা থাকতে হবে। ফতোয়া যেহেতু সমাজের উদ্ভূত সমস্যাগুলো নিয়ে, সে জন্য সমাজবিজ্ঞানের মৌলিক জ্ঞান ছাড়া একজন মুফতির পক্ষে তাঁর ফতোয়ার হক আদায় করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে তিনি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারেন।
১৫৫৮ সালে, সুলতান সুলেমানের আমলে, ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড মসজিদের ইমাম হওয়ার জন্য নিম্ন লিখিত যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল, যা থেকে একজন নেতৃস্থানীয় আলেমের জ্ঞানের পরিধি কেমন হবে তার ধারণা পাওয়া যায়। শর্তগুলো হচ্ছে—► আরবি, লাতিন, তুর্কি ও ফার্সি কমপক্ষে এই চারটি ভাষায় থাকতে হবে পাণ্ডিত্য।
► কোরআন, বাইবেল ও তাওরাত থাকবে পুরো আয়ত্তে।
► শরিয়াহ ও ফিকহের ওপর জ্ঞান থাকতে হবে।
► পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে স্নাতকোত্তর জ্ঞান থাকতে হবে, যা দিয়ে তারা ছাত্রদের এই দুই বিষয়ে শিক্ষা দান করতে পারবে।
► শাস্ত্রদক্ষতা, তীরন্দাজি, তলোয়ার যুদ্ধ ও যুদ্ধকৌশলে দক্ষ হতে হবে।
► দেখতে সুপুরুষ হতে হবে।
► মধুর কণ্ঠের অধিকারী হতে হবে
(Al Ahram Newspaper, 22nd September 1986, Egypt) এই কেন্দ্রীয় ফতোয়া কাউন্সিল বাংলাদেশের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Religious Affairs) অধীনে হতে পারে। (যদিও সে ক্ষেত্রে এর স্বাধীন চরিত্র ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ—বি. স.)।
সবচেয়ে ভালো হয়, যদি বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার Pusat Islam কিংবা সিঙ্গাপুরের Majlis Ugama Islam Singapura (Islamic Religious Council of Singapore) প্রভৃতির মতো আলাদা কার্যকর মন্ত্রণালয় তৈরি করা যায়। মালয়েশিয়ার মতো একটা বহুগোত্রীয় সেক্যুলার রাষ্ট্রে এবং সিঙ্গাপুরের মতো একটা মুসলিম সংখ্যালঘু সেক্যুলার দেশে যদি কেন্দ্রীয় ফতোয়া কাউন্সিল ভালোভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে সেটা বাংলাদেশেও সম্ভব। এই কাউন্সিলের আরো একটা কাজ হবে বাংলাদেশের প্রতিটি মসজিদে প্রতি সপ্তাহে যুগোপযোগী এবং আধুনিক সমস্যার ইসলামী সমাধানসংবলিত খুতবা সরবরাহ করা। আর যেসব নারী, শিশু, রোগী ও বৃদ্ধরা মসজিদে আসতে অপারগ, তাদের জন্য অনলাইনে খুতবা শোনার ব্যবস্থা রাখা। যেন তারা ওয়েবসাইট থেকে সহজেই খুতবাটি পড়তে বা ডাউনলোড করে নিতে পারে।
সিঙ্গাপুরে প্রত্যেক ধর্মীয় শিক্ষক ও মুফতিকে তাদের লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রতিবছর ৩০ ঘণ্টার কোর্স করতে হয় সমাজের সমকালীন ইস্যু, সমস্যা ও আবিষ্কার নিয়ে। যেমন—বাজেট, কভিড-১৯, সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ রক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, সোস্যাল মিডিয়া ইত্যাদি। আমি নিজেও তাদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের (Asatizah Recognition Scheme) অনুরোধে Environmental Ethics of a Muslim বিষয়ে তিন ঘণ্টার কোর্স অফার করেছি দুবার।
