Sunday, May 31, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeযুগ জিজ্ঞাসাগল্পটি আবেগী দ্বীনি বোনদের জন্য

গল্পটি আবেগী দ্বীনি বোনদের জন্য

২০০৭ সালে আমার একটি বিয়ের প্রস্তাব আসে।তখন আমি মাদ্রাসায় পড়তাম।আমার পরিবার বেশ ধার্মিক ও আমার বাবা একজন আলিম ছিলেন।
যে পরিবার থেকে প্রস্তাব এসেছিল, তারা ছিল সম্পূর্ণ মডার্ণ।পাত্র নিজে এসে আমার বাবাকে প্রস্তাব দেয়।বাবা এককথায় না করে দিলেন।কিন্তু, সে কিছুতেই মানল না।তখন বললেন, “যদি তুমি ও তোমার পরিবার ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে চলতে পারো, তাহলে আমি আমার মেয়েকে তোমার কাছে বিয়ে দিব।কারণ, আমার মেয়ে নামাজী ও পর্দাশীল।এখন তুমি যদি এভাবে উগ্র হয়ে চলো, শেইভ করো, নেশা করো,নামাজ পড়ো না,তাহলে আমার মেয়ে কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না।আর আমিও আমার মেয়ের জন্য সম্পূর্ণ এক দ্বীনদার পাত্র চাই।”
ছেলে রাজি হয়ে গেল।এবং সময় চাইল।আমার বাবাও তাকে সময় দিলেন।
এর ঠিক একবছর পর একদিন মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে উনাকে দেখতে পেলাম। আগের মতোই আছেন তিনি।আমার পথরোধ করে বললেল, “আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।”
জবাবে বললাম, “আমার কথা বলা ঠিক হবে না।ক্ষমা করবেন।”
পরে তিনি অনেক আকুতি-মিনতি করায় ৫ মিনিট সময় দিলাম।
তিনি বলতে লাগল, “আমার তোমাকে অনেক ভালো লাগে। তোমার মত মেয়ে চাই আমি।কিন্তু, আমি হয়তো তোমার যোগ্য না।তবে দেখো,তুমি পাশে থাকলে আমি তোমার যোগ্য হতে পারব।তোমার বাবা আমাকে সময় দিয়েছেন। আমি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারব।তবে আমার পরিবারের পরিবর্তনের জন্য তোমার সাহায্য লাগবে।তুমি যখন নামাজ পড়বে, তা দেখে আমার মা-বোনও শিখতে পারবে।তোমার পর্দা করা দেখে তারাও এতে আগ্রহী হবে।প্লিজ!তুমি তোমার বাবাকে একটু বুঝাবা?
তোমাকে বিয়ে না করলে তাদেরকে পরিবর্তন করা যাবে না।তুমিও তো পারো একটি মডার্ণ পরিবারকে দ্বীনদার বানাতে।এতে তোমারই কল্যাণ হবে।”
আমি সরাসরি উনাকে বললাম, “দেখুন! আমি শৈশব থেকেই দ্বীনি পরিবেশে বড় হয়েছি।তাই আপনার পরিবারে গিয়ে নিজেকে মানাতে পারব না।এমন কী গ্যারান্টি আছে, আপনার মা-বোন আমার মত চলতে পারবেন?হতে পারে,উল্টো উনারা আমাকে তাদের দিকে টানবেন।”
তিনি তখন বলল, এমনকিছুই হবে না।আমি যথেষ্ট চেষ্টা করেছি।কিন্তু, তারা না দেখলে কীভাবে বুঝবে?
এভাবে তিনি আরো অনেক কথা বললেন।আমাকে বুঝালেন।আমার তখন কি জানি হয়ে গিয়েছিল।মনে হল, “যদি একটি বেদ্বীন পরিবারকে দ্বীনের পথে আনতে পারি,তাহলে পরকালে আমার মুক্তির উপায় খুঁজে নিতে পারব।ঐতিহাসিক গল্পে অনেক নারীর গল্প পড়েছিলাম যে, তাদের কল্যাণে কীভাবে একজন মাতাল পুরুষও বদলে গিয়েছিল।আমার তখন সেইসব মহীয়সী নারীদের মত হতে মন চাইল।
তিনি পুনরায় আমার বাবাকে প্রস্তাব দেওয়ায় বাবা বলে দিলেন, ” এটা সম্ভব না।তোমার পরিবার আজও দ্বীনি পরিবেশ গড়তে পারে নি।”
আমি তখন বাবাকে বুঝাতে লাগলাম।বললাম যে, “বাবা! আমি আল্লাহর জন্য এ বিয়েটা করব।এবং এই পরিবারকে দ্বীনি দাওয়াত দিব।ইনশাআল্লাহ!উনারা একদিন আল্লাহর পথে ফিরে আসবেন।”
আমার কথা শুনে বাবা রাগতস্বরে বললেন, “তুমি যেরকম মনে করছো, সেরকম যুগ এখন আর নেই। বাহিরের দুনিয়া সম্পর্কে কতটুকু জানো?কী বলছো তুমি, বুঝতে পারছো?বর্তমানে এটা ফিৎনার যুগ।সবাই মুখোশ পরে আছে।তুমি কয়জনকে চিনতে পারবে?আর এমনও তো হতে পারে তুমি ঐ পরিবারের গিয়ে দ্বীন ভুলে যাবে।তাদের মত চলাফেরা করতে ইচ্ছে হবে।”
আমি বললাম, এমনকিছু হবে না।আপনি বিশ্বাস রাখেন আমার উপর।আমি তো শুধু আমার নাজাতের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছি। একটা দ্বীনি পরিবারে গিয়ে সুন্দরভাবে দ্বীন পালত করতে পারব।কিন্তু, যারা বুঝে না তাদের কী হবে?আমি তো পারি তাদেরকে যথাসাধ্য বুঝানোর?বাকিটা আল্লাহর হাতে।
বাবা তখনও রাগে যা-তা বললেন। আমি শুনলাম না।জিদ ধরে রইলাম। শেষ পর্যন্ত তিনি মানলেন।এবং দাওরাহ শেষে আমার বিয়েটা সে-ই ছেলের সাথে হল।
আমি তখনও ডুবে ছিলাম সেই ঐতিহাসিক নারীদের গল্পে।তাদের মত মহীয়সীনী হতে চেয়েছিলাম।কিন্তু, আমার তকদিরে ছিল অন্যকিছু।মুখোশ পরা মানুষদেরকে চিনতে পারি নি।
বিয়ের প্রথমদিন থেকেই আমার স্বামীকে নামাজের তাগিদ দেওয়া শুরু করলাম।তিনি আমার উৎসাহে নামাজ পড়া শুরু করলেন।দাঁড়িও রাখলেন।
কিন্তু, পরিবারের অন্য সদস্যদেরকে বুঝাতে বারবার ব্যর্থ হলাম।তারপরেও ধৈর্য্য ধরলাম, হয়তো একদিন সবাই বদলাবে।
আমার শ্বশুর ছিলেন অনেক ভালো মানুষ। তিনি একটু ধর্মীয় রীতি মানতেন।আমাকেও অনেক ভালোবাসতেন।তিনি আমাকে দেখিয়ে শ্বাশুড়ি ও ননদের সাথে রাগারাগি করতেন।কিন্তু, উনারা এসব কোনোদিন কানে নেন নি।আমার ননদের মডেলিং করার অনেক শখ ছিল। সে নিয়মিত নাইট ক্লাবে যেত।তার ছিল প্রচুর ছেলে বন্ধু।পড়াশোনার জন্য অন্য আরেক শহরে থাকত।তাই তার এসব সম্পর্কে আমরা কেউ জানতাম না।
বিয়ের ১বছর পর্যন্ত সব-ই ঠিকঠাক ছিল।আমার স্বামীও আমাকে অনেক ভালোবাসতেন।আমার কথা শুনতেন।কিন্তু, যখন আমি ২ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন থেকেই তিনি বদলাতে শুরু করলেন।
বাসায় দেরীতে ফিরতেন।জিজ্ঞেস করলে, রাগারাগি করতেন।আগে প্রতি ওয়াক্তে খোঁজ নিতাম, নামাজ পড়ছেন কি না?এখন তা জিজ্ঞেস করার জন্য ফোন করলে, রিসিভ করেন না।সারাক্ষণ ব্যস্ততা দেখাতেন।
আমার যখন ৫ মাসের গর্ভ, তখন হঠাৎ একদিন উনার চেহারা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম।…

আমার যখন ৫ মাসের গর্ভ, তখন হঠাৎ একদিন উনার চেহারা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম।
কারণ, তিনি সম্পূর্ণ দাঁড়ি কেটে ফেলেছেন।কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলাম, কেন এভাবে দাঁড়িগুলো কেটে ফেললেন?উনার জবাব ছিল, “দাঁড়ি রাখার জন্য বয়স চলে যাচ্ছে না-কি? বুড়ো হলে ওসব রাখা যাবে।এখন দাঁড়ি রেখে সৌন্দর্য নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।”
আমি বুঝাতে পারব না,আমার মনের অবস্থা তখন কেমন ছিল।উনার পরিবর্তন আমাকে বেশ আহত করল।কিন্তু, এতে আমার শ্বাশুড়ি খুব খুশী।
তিনি এখন সুযোগ পেয়ে ইচ্ছেমত আমাকে মানসিকভাবে টর্চার করতে লাগলেন।আমাকে নামাজ পড়তে দেখলে নানান কথায় ব্যঙ্গ করতেন।পর্দা করলে জঙ্গি,ভূত,খ্যাঁত আরো অনেককিছু বলতেন।
উনার কথাগুলো আমার গায়ে কাঁটার মত বিঁধত।
অবাক হতাম তাদেরকে দেখে, এরাও কি মুসলিম?
আমি কখনোই এসবে অভ্যস্থ ছিলাম না।তাই খুব ভেঙ্গে পড়লাম।লজ্জায় আমার পরিবারকেও বলতে পারি নি।
যে মানুষ আমাকে হিজাব পরতে দেখে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, আজ সেও আমাকে বলে আমি না-কি খ্যাঁত।কোনো স্মার্টনেস আমার মধ্যে নেই।তারপর এসব নামাজ পড়ার কী দরকার? বয়স চলে যাচ্ছে না-কি? এখন তো ফূর্তি করার সময়।বুড়ো হলে নামাজ পড়া যাবে।
আমি ভাবলাম, হয়তো সন্তানের মুখ দেখে একটু শুধরাবেন।কষ্টগুলো মনের মধ্যে রেখে আমার অনাগত সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
আমার পুরো প্রেগনেন্সির সময়ে সবাই মিলে আমাকে মানসিকভাবে অনেক আঘাত করেছে।সারাক্ষণ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। আমি জানতাম না, আমার অপরাধ কী?
আমার শাশুড়ী কখনোই আমাকে ভালোকিছু খেতে দেন নি।শ্বশুর লুকিয়ে আমার জন্য ফল ও পুষ্টিকর খাবার আনতেন।কিন্তু,সেসব আমি পেতাম না।
সারাদিন-রাত একা সব কাজ করেও শাশুড়ীর মন পাই নি।
একদিন রাগে-দুঃখে বলে ফেলেছিলাম, “আপনি কেন আমার সাথে এমন করেন?আমার অপরাধ কী?”
উনি বললেন, “তুই আমাদের ছেলেকে বশ করে বিয়েটা করেছিস।তুই এ বাড়ির পূত্রবধু হওয়ার যোগ্য না।”
অনেক কষ্টে হেসে বললাম, “আপনার ছেলেই তো আমাকে ভালো কথা বলে বিয়েটা করল।আমি কখনোই ভাবি নি, এমন হবে।আজ যা খুশী তা আপনারা আমার সাথে করেন।যে আমাকে পছন্দ করে বিয়ে করল,সেও আমার সাথে বাজে ব্যবহার করে।দোষ আমার নয়।আপনার ছেলেকে বলুন,কেন সে আমার সাথে এমন করল?”
“বেয়াদব মেয়ে!মুখে মুখে তর্ক?এ বলে সেদিন আমার গালে তিনি দুটি থাপ্পড় মেরেছিলেন।”
রাতে আমার স্বামী বাসায় আসার পর বিচার দিলেন, “তোর বউ আমার কথা শুনে না।সারাক্ষণ তর্ক করে।”
ঐ রাতে প্রথম তিনি আমার গায়ে হাত তুলেন।আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
কোনো রকমে নিজেকে সামলাই।
আমার গর্ভে উনার সন্তান,এটা জেনেও কীভাবে গায়ে হাত তুলতে পারলেন?আমার কথা না-ই ভাবুন, সন্তানের কথা তো ভাবতে পারতেন?
মাথাটা ঝিম ধরে রইল।একের পর এক ভাবনা উঁকি দিতে লাগল।একটা মানুষ কীভাবে এত দ্রুত বদলে যেতে পারে?
আচ্ছা!আমার ভাবনা কি ভুল ছিল?আমার চাওয়া কি অকল্পনীয় ছিল?একটি সুন্দর মনোভাব নিয়েই তো এ জীবনে এগিয়েছিলাম।তবে কেন রঙিন জীবন আজ ধূসরে ঢেকে গেল?সবকিছু কি আগের মত হবে?আমি কি পারব এ লড়াইয়ে জিততে?
সারারাত এসব নিয়ে কান্নাকাটি করে কাটিয়ে দিলাম।
আমাকে এর শেষটা দেখতে হবে।আমার সন্তানের জন্য হলেও সুস্থ থাকতে হবে।এখানে থাকলে মরে যাব।তাই বাবার বাড়িতে চলে আসলাম।
তারপর অপেক্ষা শেষে আমি এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের মা হই।
আমার মেয়ের জন্মের পর কিছুটা হলেও তিনি পরিবর্তন হলেন।যখন-তখন আর অহেতুক রাগারাগি করতেন না।দীর্ঘ ৯ মাস আমার যত্ন না নিলেও এখন কীভাবে জানি আমার যত্ন নেওয়া শুরু করলেন।
আমিও তা দেখে ক্ষমা করে দিলাম।যাক!মানুষটা অন্তত এখন আমার যত্ন নিচ্ছে।
আমার মেয়ে ছিল শ্বশুর-শ্বাশুড়ী ও ননদ সবার নয়নের মণি ।তার দিকটা ভেবে সবাই আমাকে কিছুটা যন্ত্রণা দেওয়া বন্ধ করল।
শ্বাশুড়িও আমাকে মানসিকভাবে টর্চার করা বন্ধ করলেন।আমার মেয়েটাকে সারাক্ষণ উনিই দেখে রাখতেন।অনেক ভালোবাসতেন।
আমি শত লাঞ্ছণার মধ্যে একটু আশার আলো দেখলাম।এবার বুঝি সবাই বুঝবে।একটু শুধরাবে।
কিন্তু, কে জানত এখানেই সব শেষ নয়?
একদিন জানতে পারলাম, আমার স্বামীর প্রায় অনেকগুলো মেয়ের সাথে সম্পর্ক।দীর্ঘরাত ধরে চ্যাট, অফিস শেষে মেয়ে কলিগ নিয়ে ঘুরাঘুরি। দেরী করে বাসায় ফিরা।
আমার স্বামীর সাথে সম্পর্কটা আগের মত আর হয়ে উঠে নি।মেয়ের জন্য তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলেও সেই আগের মত রাত জেগে বিভিন্ন মেয়ের সাথে চ্যাট করতেন।কোনোদিন আবার বাসায় ফিরতেন না।কোথায় যেতেন,তা না জানলেও বুঝতে বাকি রইল না।স্ত্রী হিসেবে নিজেকে খুব জঘন্য মনে হতে লাগল।অনেক চেষ্টা করেও উনাকে ফিরাতে পারি নি।
নামাজ পড়ে দোয়া করে কান্নাকাটি করতাম।কত-শত দোয়া ছিল,উনি যাতে বদলে যান।কিন্তু, বদলে যাওয়ার কপাল হয়তো উনার ছিল না।
একদিন হঠাৎ উনার মোবাইলে একটা মেয়ের সাথে বেশকিছু আপত্তিকর ছবি দেখতে পাই।আমার তখন দম বন্ধ হয়ে আসছিল।এই পরিস্থিতি যে কতটা শ্বাসরুদ্ধকর তা আমার মত নারীরা বুঝতে পারবে।
এটা নিয়ে জিজ্ঞেস করায়, আমার গায়ে উনি হাত তুলেন।আর বললেন, শীঘ্রই আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবেন।…

আমার গায়ে উনি হাত তুলেন।আর বললেন, শীঘ্রই আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবেন।
এমনকি এটাও বললেন যে, “এই সন্তান তিনি চান না।সন্তানের কোনো দায়িত্ব নিতে পারবেন না।”
আমি বুঝতে পারলাম, খুব বাজেভাবে প্রতারণার স্বীকার হয়েছি।তারপরেও আমার মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে এ সংসার করতে চেয়েছিলাম।কিন্তু, আজকের কথাগুলো শুনে সত্যি ভীষণ অবাক হলাম।তাহলে কি উনার সন্তানের প্রতি এত ভালোবাসা মিথ্যা ছিল ?
আমি শাশুড়ীকে জানালাম।উনার জবাব ছিল,
“আমার ছেলের আরো অনেক বাচ্চাকাচ্চা হবে।শুধুমাত্র এই মেয়ের জন্য সংসার টিকিয়ে রাখার কী দরকার? তাছাড়া ছেলে হলেও একটা কথা ছিল।আমাদের বংশধর হত।কিন্তু, এ তো মেয়ে।”
উনার কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম।এই আধুনিক যুগে এসেও কি কেউ জাহেলি যুগের মত চিন্তাভাবনা করতে পারে?
মেয়েরা কি বংশের কেউ না?তাদের কি কোনো মূল্য নেই?
ভেবেছিলাম, মেয়ের জন্য হলেও ওরা আমাকে দূরে সরিয়ে দিবে না।কিন্তু, আমি ভুল ছিলাম।আমার হাতে ডিভোর্স পেপার তুলে দেওয়া হল।তখন কেবল একটাই ভাবনা মাথায় ঘুরছিল, নাতনির জন্য তাদের ভালোবাসা কি মিথ্যা ছিল?এতদিন কি সবাই শুধু অভিনয় করে গেছে?
আমার ননদও সেদিন বলেছিল,
“এত আপসেট হওয়ার কী আছে? পৃথিবীতে আর কোনো সিঙ্গেল মাদার নেই? অযথা আমাদেরকে বিরক্ত না করে তুমি নিজেই তো চলে যেতে পারো?”
আমি আর কোনোরূপ কথা না বলে ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিলাম।বেঁচে থেকেও যেন মরে গিয়েছি।
আসলেও চরিত্রহীনের সাথে থাকা যায় না।বিকৃত মানষিকতার পরিবারে মানিয়ে নেওয়া যায় না।মেয়ের দিকটা ভেবে সব-ই মেনে নিয়েছিলাম।কিন্তু, যখন এই মেয়েকে তারা স্বীকৃতি না দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল,তখন আর কী দরকার এখানে থেকে?
মেয়েও জানবে, তার বাবা মারা গেছে। সে বড় হবে এতিম নামে।আমি কোনোদিন তার পিতৃ পরিচয় দিব না।
আমি ও আমার মেয়ের সবকিছু থেকে তাদেরকে দায়-মুক্ত করে দিলাম।মন থেকে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম।কোনো অভিযোগ রাখলাম না।
৬ মাসের মেয়েকে কোলে করে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে গেলাম।সেদিন আমার বাবাও আমার সাথে অনেক রাগারাগি করলেন।সবকিছুর জন্য আমাকে দায়ী করলেন।বারবার বুঝিয়ে ছিলেন।কিন্তু,আমি বুঝার চেষ্টা করি নি।
এখন সবকিছু বুঝতে পারছি। এমন যে হবে, কে জানত?
আসলে আমার জীবন অনেক সহজ ছিল।তাই সবকিছুকে সহজ ভেবেছিলাম।এ পৃথিবীতে কত যে মুখোশ পরা মানুষ রয়েছে, তা সম্পর্কে জানতাম না।আমি অনেক বড় ভুল করেছি।নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আশে-পাশে থাকা মানুষগুলোর কথায় আরো ভেঙ্গে পড়লাম।এ সমাজে ডিভোর্সী নারীরা কতটা অপমানিত হয়ে জীবন পাড় করে,তা এখন ভালোভাবে বুঝতে পারছি।আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী যে-ই আসে, তাদের একটাই কথা, “আরে এ কেমন স্ত্রী?যে কি না নিজের স্বামীকে ধরে রাখতে পারে নি।”
কীভাবে বুঝাব তাদেরকে, “যার মন স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়,তাকে খাঁচাবন্ধি রাখা যায় না।”
এখন কী করব?কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব?এসব চিন্তা আমায় ক্ষুরে ক্ষুরে খাচ্ছিল।কতবার যে মরে যেতে চেয়েছি।কিন্তু, যখন মেয়েটার মুখ দেখতাম,তখন আর পারতাম না কিছু করতে।আমি সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখলাম।রাত জেগে নামাজ পড়ে কান্নাকাটি করে দোয়া করতাম,
“হে আমার সৃষ্টিকর্তা! আমি আপনাকে দেখি নি।তবুও অনুভব করি।আপনাকে বিশ্বাস করি।এটাও মানি, আপনি অনর্থক কিছু সৃষ্টি করেন নি।নিশ্চয়ই আমাকেও অহেতুক পৃথিবীতে পাঠান নি।আমি জানতে চাই, তবে কেন আমার জীবন এত কঠিন হয়ে গেল?আপনি থাকা সত্ত্বেও কেন আমায় এত যন্ত্রণা পেতে হচ্ছে? যা আমি সহ্য করতে পারছি না।
আমার প্রভু আমার জীবন বদলে দিন।দোহাই লাগে!আমার এ বিষাদময় জীবন পরিবর্তন করে দিন।আমি ছাড়া আপনার অনেক প্রিয় বান্দা-বান্দী থাকলেও আমার তো আপনি ছাড়া আর কেউ নেই।”
সত্যিই আমার জীবন পুরোপুরি বদলে গেল।বাবার কাঁধে বোঝা না হয়ে মেয়েকে নিয়ে একটা মহিলা মাদ্রাসায় চলে গেলাম।ওখানে শিক্ষকতা করতে লাগলাম।
ক্ষতগুলো সারিয়ে উঠতে না উঠতেই বাবা পুনরায় আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে-পরে গেলেন।কিন্তু, আমার মনে ভয় ঢুকে গেল।সবার প্রতি থাকা বিশ্বাস উঠে গেল।আমি আর কাউকেই বিশ্বাস করতে পারি নি।আমার মনে হল, সব পুরুষেরা বুঝি এমন।প্রথমে মিষ্টি করে কথা বলে মন গলাবে।আর প্রয়োজন শেষ হলে পরে আসল রূপ দেখিয়ে দিবে।
অপরদিকে আবার মেয়ের কথা ভাবছিলাম। আমার মেয়েকে আমি কোনো অবস্থায় ছাড়তে পারব না।আমার বিয়ে হলে ওর কী হবে?এসবকিছু নিয়ে বাবার সাথে অনেক তর্কবিতর্ক হল।
বাবার রাগারাগির জন্য তীব্র অভিমান হয়েছিল।তাই আর বাড়িতে ফিরতাম না।মা অনেক কান্নাকাটি করেও আমাকে নিয়ে যেতে পারেন নি।বাবাও বুঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন।
বললেন, “এত জিদ ভালো না।এর আগেও তুমি জিদ ধরে জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছো।আর আজ মেয়েকে নিয়ে ধ্বংশের মুখে আছো।”
আমি তাও আমার কথায় অটল রইলাম।একদিক দিয়ে ভালোই হল, মানুষের অকথ্য কথা আর আমাকে শুনতে হবে না।
জানি না,এভাবে কতদিন ঘর-বাড়ী ছাড়া মাদ্রাসায় থাকব।কতদিন ঠিকানাবিহীন জীবন কাটাব।
এটাও জানি না,মেঘের আড়ালে পুনরায় সূর্য উদিত হবে কি না?আমার সেই রঙিন জীবন ফিরে পাব কি না?আজ সমগ্র সুখ হয়ে গেছে শোক।হাসিগুলো বদলে গেছে চোখের নোনাজলে।স্বর্গীয় স্বপ্নগুলো যেন আমায় উপহাস করছে।
ধরেই নিয়ে ছিলাম আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।কিন্তু, কে জানত এটা থেকেই আমার নতুন জীবনের সূচনা?

ধরেই নিয়ে ছিলাম আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।কিন্তু, কে জানত এটা থেকেই আমার নতুন জীবনের সূচনা?
ডিভোর্সের পর আমার অনেক বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল।কিন্তু শর্ত ছিল, আমি আমার মেয়েকে পাশে রাখতে পারব না।বরং তাকে ছেড়ে সংসার করতে হবে।কোনো মা এমন প্রস্তাবে কখনোই রাজি হবে না।আমিও রাজি হই নি।
আমার ইচ্ছে ছিল আমার মেয়েকে একজন বাবা উপহার দেওয়ার। কেউ যদি আমার মেয়ের বাবা হতে পারে,তবেই আমি তার স্ত্রী হব।বেশ কয়েকমাস পর একটি বিয়ের প্রস্তাব আসে।যেখানে আমার মেয়েকে নিয়ে কোনো আপত্তি নেই।আমার আবার বিয়ে হল।ভয় পাচ্ছিলাম যদি কোনোদিন আমার মেয়েকে ছাড়তে বলে?
কিন্তু, এমনটা আজও হয় নি।আমার শাশুড়ী অনেক আমলদার মহিলা।তিনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন।আমার মেয়েটাকে নিজের নাতনির চোখে দেখেন।
আর আমার স্বামীর যেন কলিজা ছিল আমার মেয়েটি।তাকে বাবার মত ভালোবাসতেন।এই সংসারে আমার আরো ২টি ছেলে মেয়ের জন্ম হয়।আমার মেয়েটাকে কেউ কোনদিন আলাদা করে নি।অন্য চোখে দেখে নি।সত্যি বলতে, এত সুন্দর একটি জীবন যে আমি পাব,তা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারি নি।আমার দিনকাল অনেক সুন্দরভাবে কেটে যাচ্ছিল।কিন্তু, হঠাৎ
২০১৯ সালে বেশ ঝামেলায় পরি।
আমার সেই প্রাক্তন স্বামী তার মডার্ন স্ত্রীর নামে ভ্রুণ হত্যার মামলা দেয়।শরীর নষ্ট হবে বলে বাচ্চা নিতে চাইতো না।কিন্তু, প্রাক্তন চাইতো একটি সন্তান।কতদিন-ই বা একা একা আনন্দ করে জীবন কাটানো যায়?
ঘটনা ছিল তার স্ত্রী হঠাৎ করে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় কাউকে না জানিয়ে গর্ভপাত করে ফেলে।পরে এটা শুনে তার স্বামী রাগে-দুঃখে মামলা করে।মামলার পর উল্টো সে তখন তার স্বামীর নামে যৌতুক ও নারী নির্যাতনের মামলা দেয়।এমনকি এটাও উল্লেখ করে, লোকটার আগের স্ত্রী নির্যাতনের স্বীকার হয়ে সংসার ত্যাগ করেছে।
এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাকেও ডাকা হয়।
সেদিন থানায় প্রাক্তন শাশুড়ীকে দেখতে পাই।আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করতে লাগলেন।উনার থেকে জানতে পারলাম শ্বশুর মারা গেছেন অনেক আগে।মারা যাওয়ার আগে না-কি আমাকে ও নাতনিকে অনেক দেখতে চেয়েছিলেন।আমার সেই ননদ! যে কি না বলেছিল,
“এত আপসেট হওয়ার কী আছে? পৃথিবীতে আর কোনো সিঙ্গেল মাদার নেই? অযথা আমাদেরকে বিরক্ত না করে তুমি নিজেই তো চলে যেতে পারো?”
সে অবৈধভাবে গর্ভধারণ করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।বর্তমানে দেশের বাহিরে আছে।ওখানে না-কি খুব নোংরা একটি কাজে জড়িত।আজ যদি তার দেখা পেতাম, তাহলে জিজ্ঞেস করতাম “সিঙ্গেল মাদার হয়ে বেঁচে থাকার আপত্তি ছিল কেন তোমার?
আরো জানলাম, প্রাক্তনের স্ত্রী সারাক্ষণ তার শাশুড়ীর সাথে ঝগড়াঝাটি করত।প্রায় না-কি আমাকে টেনে কথা বলে নানারকম গালিগালাজ করত।এক প্রকার মনে হত, ও আমার হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে।
কিন্তু, আমি কখনো এমনটা চাই নি।সবাইকে ক্ষমা করেছিলাম কোনো অভিযোগ ছাড়া।আর সে জন্য হয়তো সৃষ্টিকর্তা তাদের বিচার করেছেন।
এসব মামলার জন্য প্রাক্তনের অনেক টাকা খরচ হয়।চাকরীও চলে যায়। সব হারিয়ে সে নিঃস্ব।তার অবস্থা দেখে ইচ্ছে হয় নি কোর্টে সব সত্যিটা বলতে।এতটুকু বলেছিলাম, তার চরিত্রহীনতার জন্য আমাদের ডিভোর্স হয়।
আমি ভেবেছি,আমার এই উপকারে সে নত হবে।কিন্তু, মামলা থেকে খারিজ হওয়ার পর সে আমার মেয়েটাকে নেওয়ার জন্য উঠে-পরে যেতে লাগল।আমার জীবনেও এমন অকৃতজ্ঞ মানুষ দেখি নি।
আমি তখন মেয়েকে হারানোর ভয়ে ভেঙ্গে পরেছিলাম।কিন্তু, আমার স্বামী আমাকে ভরসা দিয়ে সব সময় আমার পাশে থেকেছেন।
কোর্টের নির্দেশমত তদন্তের পর জানা গেল, এ যাবত সে আমার মেয়ের জন্য একটুও খরচ করে নি।কোনো খুঁজ নেয় নি।তখন উল্টো তার উপর পিতার দায়িত্ব পালন না করার জন্য জরিমানার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আমি সব ক্ষমা করে দিয়ে কোর্টে আবেদন করলাম, আমার মেয়েটা যেন আমার কাছে থাকে।অনেক ঝড়-ঝাপটার পরে আমার পক্ষে রায় হয়।
প্রাক্তন এবং তার মা একটিবারের জন্য আমার মেয়েকে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, আমি রাজি হই নি।তাদের কান্না সেদিন আমার একটুও মন গলাতে পারে নি।চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম, “মেয়েরা বংশের কেউ না।তাদেরকে যত্ন করে রাখতে হয় না।ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়।”
আমি ভুল করেছি।অল্প বয়সে আবেগী হয়ে মানুষকে অনেক সহজ ভেবেছি।আমার ধারণা ভুল ছিল।এই পৃথিবীতে আসলে কেউ কারো জন্য কখনোই বদলায় না।দু’দিনের মোহে হাতে হাত রেখে সবাই ঠিকই বদলে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।কিন্তু, মোহ শেষে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দ্বিধাবোধ করে না।
আমার জীবন এত নাটকীয় হবে, তা কোনদিন কল্পনা করতে পারি নি।সবশেষে চোখের সামনে অন্যায়কারীদের পরিণতি দেখতে পারব,তা স্বপ্নেও ভাবি নি।
একজন পুরুষ আমায় ভেঙ্গে দিয়েছিল।আর অন্য আরেকজন পুরুষ পুনরায় আমাকে গড়ে তুলেছিল।
আজও কিছু পুরুষের জন্য আমরা নারীরা চমৎকার এক জীবন উপভোগ করতে পারছি।তবে জগতের সব পুরুষ এক না।আমি সাবধান করছি আমার দ্বীনি ছোট বোনদেরকে।আবেগের বশে কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিও না।সবার কপালে আমার বর্তমান স্বামীর মত পুরুষ জুঠে না।
ভুল মানুষকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা না করে, বরং তুমি যেমন ঠিক তোমার মত কাউকে বেছে নিও।
এই পৃথিবীর সব পুরুষ এক না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty + 5 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য