Wednesday, June 3, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeবিবিধধর্ম ব্যবসা

ধর্ম ব্যবসা

১৫২৬ সালে হিব্রু এবং গ্রীক ভাষা থেকে ইংরেজিতে বাইবেল অনুবাদ করেন উইলিয়াম টিন্ডেল। এরকম ধর্মীয় কিতাব কেনো তিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় প্রকাশ করবেন? ধর্মীয় জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হলে পোপ-বিশপরা আছেন কেনো? সাধারণ মানুষের ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করার ‘অপরাধে’ ১৫৩৬ সালে উইলিয়াম টিন্ডেলকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়!

উইলিয়াম টিন্ডেলের হত্যাকাণ্ড বুঝতে হলে আরেকটু পেছনে যেতে হবে। টিন্ডেলকে হত্যা করার প্রায় তিনশো বছর আগে ১২৩৪ সালে Council of Tarragona –এ স্প্যানিশ বিশপ ঘোষণা করেন, “(সাধারণ) কারো কাছে বাইবেলের কোনো কপি থাকতে পারবে না। যদি থেকে থাকে, তাহলে আটদিনের মধ্যে সেগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এই নির্দেশ যদি কেউ অমান্য করে, তাহলে সে ‘হেরেটিক’ (অর্থাৎ ধর্মচূত) বলে গণ্য হবে।” [১]

এই দুই ঘটনার মধবর্তী সময় যদি দেখি, তাহলে দেখতে পাই ১৪০৮ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়- অনুমতি ছাড়া নতুন করে কেউ বাইবেল অনুবাদ করতে পারবে না [২]। অথচ উইলিয়াম টিন্ডেল অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি, তিনি ইংল্যান্ড থেকে জার্মানি যান বাইবেল অনুবাদ করার জন্য। লুকিয়ে লুকিয়ে অনুবাদ করেন, প্রকাশ করেন। একসময় যখন ধরা পড়েন, তখন তাকে হত্যা করা হয়।

উইলিয়াম টিন্ডেল মৃত্যুর আগে এক পাদ্রীকে বলেছিলেন, “If God spare my life ere many years, I will cause the boy that driveth the plough shall know more of scriptures than thou doest.”

অর্থাৎ, “গড যদি আমাকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলে আমি বাইবেলকে এতোটাই সহজসাধ্য করবো যে, একটা রাখাল বালকও তোমাদের চেয়ে বেশি ধর্মজ্ঞান রাখবে।”

চার্চের যাজকরা ধর্মীয় জ্ঞানকে নিজেদের কাছে কুক্ষিগত করে রেখেছিলো। তারা ছাড়া আর কাউকে ধর্মীয় কিতাবাদি পড়তে দিতো না। গডের সাথে সম্পর্ক রাখতে তারা নিজেদেরকে ‘মাধ্যম’ হিশেবে উপস্থাপন করতো। তারা প্রচার করতো- সাধারণ মানুষ সরাসরি গডের কাছে কিছু চাইতে পারবে না, অবশ্যই চার্চের বিশপের মাধ্যমে চাইতে হবে। চার্চ কর্তৃপক্ষ পাপমোচনের ছাড়পত্র বিক্রি শুরু করলো যা Indulgence নামে পরিচিত।

তারা মানুষকে বুঝাতো, গডের কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া যায় না। গডের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হলে ক্ষমার ‘ছাড়পত্র’ কিনতে হবে, এটা কিনলে পাপমোচন হবে [৩]। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে চার্চ এসে দাঁড়িয়েছিলো মধ্যবর্তী সত্তা হিশেবে। চার্চ ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো পড়তে গেলে মনে পড়ে আল্লামা ইকবালের একটা কবিতা।

“কিষাণ মজুর পায় না যে মাঠে শ্রমের ফল
সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও।
স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির মাঝে কেন আড়াল?
মধ্যবর্তী মোল্লাকে আজ হাঁকিয়ে দাও।”

মধবর্তী মোল্লাকে হাঁকিয়ে দেবার বেলায় সবচেয়ে সফল ভূমিকা পালন করেছিলেন মার্টিন লুথার। University of Wittenberg –এ তিনি টাঙ্গিয়ে দেন তার বিখ্যাত ‘Ninety-five Theses’। এই থিসিসের মাধ্যমে তিনি চার্চ কর্তৃপক্ষের ঠিকাদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেন, রিফিউট করেন। প্রায় তেরো-চৌদ্দশো বছরের চার্চের আধিপত্যের বাইরে গিয়ে মার্টিন লুথার যে ধারা সৃষ্টি করেন তা প্রোটেসট্যান্ট আন্দোলন নামে পরিচিত।

প্রোটেসট্যান্ট মুভমেন্ট কতোটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তার একটা উদাহরণ দিলেই বুঝা যাবে। বর্তমানের ডোনাল্ড ট্র্যাম্প থেকে অতীতের জর্জ ওয়াশিংটন, জিমি কার্টার, বিল ক্লিনটন, থিওডোর রুজভেল্ট, উড্রো উইলসন, রোনাল্ড রিগ্যান, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা সহ অ্যামেরিকার বেশিরভাগ প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রোটেসট্যান্ট। বলা হয়ে থাকে, অ্যামেরিকার একমাত্র ক্যাথোলিক প্রেসিডেন্ট ছিলেন জন. এফ. কেনেডি।

৩১২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার আগে খ্রিস্টান ধর্ম ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের ‘Persecuted religion’. খ্রিস্টানদেরকে যেখানে পাওয়া হতো, হত্যা করা হতো। কালের পরিক্রমায় সেই ধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের ধর্ম হলো। ঠিক তেমনি, ক্যাথোলিক আধিপত্যের বাইরে গিয়ে যারা ফাদারদের ধর্মীয় শোষণ থেকে খ্রিস্টানদের ‘মুক্ত’ করেন, আজকে তাদের জয়জয়কার। অথচ জীবদ্দশায় তাদেরকেই হত্যা করা হয়েছে, অত্যাচার করা হয়েছে, কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আধিপত্যবাদীদের আগ্রাসন থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার যে আন্দোলন তারা করেছিলেন, যে আইডিয়া নিয়ে এসেছিলেন, সেটা চার্চ কর্তৃপক্ষ দমিয়ে রাখতে পারেনি।

চার্চের আধিপত্য থেকে না হয় সাধারণ খ্রিস্টান মুক্তি পেলো, কিন্তু এর চূড়ান্ত ফল কী ছিলো? প্রোটেসট্যান্ট মুভমেন্টের ফলে (Consequence) ইউরোপে উত্থান হয়েছে লিবারেল, সেক্যুলার মুভমেন্ট। তার পরবর্তীতে সেটা পরিণত হয়েছে নাস্তিকতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং হাল আমলের LGBT মুভমেন্টে। চার্চের আধিপত্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা সমাজ এখন আন্দোলন করছে সরাসরি ধর্মের বিরুদ্ধে।

সবার মুখ বন্ধ করে দিলে মানুষ যখন হুট করে মুখ খোলার স্বাধীনতা পাবে, সেই স্বাধীনতা পেয়ে সে মুখ দিয়ে এমন কিছু বলবে যেটা একসময় চিন্তাও করা যেতো না। ‘অতি রক্ষণশীল’ একটা সমাজ ‘অতি উদার’ হবার পর পরিণতি কী ঘটে সেটা ইউরোপের গতো পাঁচশো বছরের ইতিহাস পড়লে আমরা দেখতে পাবো।

ধর্মীয় জ্ঞানকে কিছু ব্যক্তির মধ্যে পুঞ্জীভূত রাখার ফলে জ্ঞানের রক্ষকদের মধ্যে যে আধিপত্যবাদী মনোভাব চলে আসে সেটা আমরা খ্রিস্টধর্মের যাজকদের মধ্যে দেখলাম।

ধর্মতত্ত্ব ইতিহাসের হালআমলের জনপ্রিয় ইতিহাসবিদ ক্যারেন আর্মস্ট্রং। তার রচিত ‘Buddha’ বইয়ে গৌতম বুদ্ধের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন হিন্দু ধর্মের আলোচনা করেন। সেখানে তিনি দেখান ধর্মীয় জ্ঞান মুষ্টিমেয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক থাকায়, বাকিদেরকে বঞ্চিত রাখায় কিভাবে তা ‘কাল্ট’ –এ পরিণত হয়।

তিনি লিখেন:

“উপমহাদেশে লেখার প্রচলন না থাকায় বেদ লিখা হয় নি। ফলে ব্রাহ্মণদের দায়িত্ব ছিলো এইসব চিরন্তন সত্য মুখস্ত করে প্রজন্ম পরস্পরায় সংরক্ষণ করা। উত্তরাধিকারের এই কাহিনী বাবা হতে পুত্রকে দান করা হতো, যেহেতু এই পবিত্র জ্ঞান মানুষের জগৎকে পবিত্র করে তোলা ও টিকে থাকতে সক্ষম করা মৌল নীতি ব্রহ্মার সংস্পর্শে পৌঁছে দিতো। শতো শতো বছরের পরিক্রমায় আদি আর্য গোত্রসমূহের ভাষা সংস্কৃতি স্থানীয় কথ্য ভাষার কাছে হার মানে। ফলে তা ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সবার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে এটাই অনিবার্যভাবে ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা ও মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সমগ্র জগতের অস্তিত্ব বজায় রাখে যে বেদ, সেখানে উল্লিখিত উৎসের উপাচার কেবল তাঁরাই জানতেন।” [৪]

যে ‘বেদ’ হবার কথা ছিলো সবার কাছে উন্মুক্ত, সেই ‘বেদ’ হয়ে উঠে নির্দিষ্ট একটা শ্রেণীর কাছে পুঞ্জীভূত। তারা বাদে বাকি কেউ ‘বেদ’ (শ্রুতি) পড়া তো দূরে থাক, স্পর্শ করাকে ‘পাপ’ হিশেবে বিবেচনা করা হতো!

রাষ্ট্রক্ষমতায় যেমন স্বৈরাচারী ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে, ধর্মীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রেও তেমনি ‘Sole Authority’ (একক কর্তৃপক্ষ) হিশেবে আত্মপ্রকাশ করে আরেক ধরণের স্বৈরাচারী। কখনো বা ‘যাজক’, ‘পাদ্রী’, ‘ফাদার’ নামে; কখনোবা ‘পুরোহিত’ নামে।

ইসলাম এই জায়গায় অনন্য। অন্যান্য ধর্মের চেয়ে ইসলামের সৌন্দর্যের জায়গা হলো এখানে। জ্ঞানার্জনকে ইসলাম উৎসাহিত করেছে, মূর্খ থাকাকে ক্রিটিসাইজ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

“জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪]

কেবলমাত্র সমাজের নির্দিষ্ট কয়েকজনকে জ্ঞানার্জন করতে বলেনি। ইসলাম সবাইকে জ্ঞানার্জন করতে বলেছে। ধর্মীয় জ্ঞান, পাশাপাশি দুনিয়া পরিচালনার জ্ঞান। হালাল রুজি করা যেমন ফরজ, হালাল রুজি করতে গিয়ে জ্ঞানার্জন (অ্যাকাডেমিক, টেকনিক্যাল) করাটাও ফরজ।

ইসলাম জ্ঞানকে মোটাদাগে কেন্দ্রীভূত করেনি, বরং ছড়িয়ে দিতে বলেছে। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

“আমার পক্ষ থেকে একটা আয়াত হলেও তোমরা সেটা পৌঁছে দাও।” [সহীহ বুখারী: ৩৪৬১]

যে জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করে, রাস্তায় বের হয় তার ফযিলত কেমন? নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

“যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” [সহীহ মুসলিম: ৬৭৪৬]

জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদা নিয়ে নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরেকটা কম্প্রিহেন্সিভ হাদীস আছে। তিনি বলেন:

“যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার পরিবর্তে তাকে জান্নাতের পথসমূহের মধ্যে কোনো একটি পথে পৌঁছে দেন। ফেরেশতারা জ্ঞান অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেয়। জ্ঞানীর জন্য আসমান ও জমিনে যারা আছে তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও দু’আ প্রার্থনা করে; এমনকি পানির গভীরে বসবাসকারী মাছও। আবেদ (সাধারণ ইবাদাতগুজারী) ব্যক্তির উপর আলিমের ফযিলত হলো সমস্ত তারকার উপর পূর্ণিমার চাঁদের মতো। জ্ঞানীরা হলেন নবীদের উত্তরসূরি। নবীগণ কোনো দিনার বা দিরহাম রেখে যান না, তারা উত্তরাধিকার সূত্রে শুধু ইলম রেখে যান। সুতরাং, যে ইলম অর্জন করেছে, সে পূর্ণ অংশগ্রহণ করেছে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৪১]

জ্ঞানার্জনের গুরুত্বের একটা বাস্তব উদাহরণ দেখতে পাই বদর যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে। বদর যুদ্ধের কয়েকজন যুদ্ধবন্দীর মুক্তিপণ দেবার মতো অর্থ ছিলো না। তারা পড়ালেখা জানতো। অন্যদিকে মদীনার বাচ্চারা পড়ালেখা জানতেন না। ঐসব যুদ্ধবন্দীদেরকে এই শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়- তারা প্রত্যেকে দশজন শিশুকে পড়ালেখা শেখাবে। শিশুরা পড়ালেখা শিখলে সেটাই হবে তাদের মুক্তিপণ [৫]

জ্ঞানার্জনের রাস্তা ইসলাম সবার জন্য উমুক্ত রেখেছে। যে কেউ গঠনমূলক উপায়ে, কাঠামোগত পদ্ধতিতে প্রবেশ করে আলেম হতে পারেন। আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই একসময়ের অনেক মদ্যপায়ী লোকেরা পরবর্তীতে ইমামদের ইমাম (শিক্ষক) পর্যন্ত হয়েছিলেন।

ইসলাম মোটাদাগে জ্ঞানকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে, সমাজের সবার মধ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে বলেছে, শিক্ষা দিতে বলেছে। পাশাপাশি ইসলাম জ্ঞানকে কেন্দ্রীকরণও করেছে। সবাই সমান লেভেলের জ্ঞানী হবে না, কেউ কেউ হবে এক্সপার্ট। সাধারণ মানুষ (জ্ঞানী) বিশেষ প্রয়োজনে সেই এক্সপার্টদের কাছে যাবে। আর এক্সপার্টরা তাদের জীবনটাই ব্যয় করবেন জ্ঞানার্জনে, জ্ঞান-বিতরণে।

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:

“আর মুমিনদের জন্য সঙ্গত নয় যে, তারা সবাই একসঙ্গে অভিযানে বের হবে। অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক যেনো বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং আপন সম্প্রদায় যখন তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে তখন তাদেরকে সতর্ক করতে পারবে, যাতে তারা (গুনাহ থেকে) বেঁচে থাকে।” [সূরা তাওবা ৯:১২২]

যারা নিজেদের জীবনকে জ্ঞানার্জনের পেছনে ব্যয় করেছেন, ইসলামের ইতিহাসে তারা আলেম-উলামা, ইমাম, সালাফ নামে পরিচিত। ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম আশ-শাফে’ঈ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম যাহাবী, ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (আল্লাহ সবার উপর রহম করুন) প্রত্যেকেই আমাদের কাছে সম্মানিত আলেম। রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসানুযায়ী তাঁরা পূর্ণিমার চাঁদের মতো। রাতের আকাশের ঝিলিমিলি তারার মতো তাঁরা ইসলামি জ্ঞানের আঙ্গিনায় জ্বলছেন, পথ দেখিয়ে গেছেন, পথ দেখাচ্ছেন।

ইসলামি জ্ঞানের ইতিহাস, জ্ঞানের বিবর্তন সম্পর্কে ভালো জানাশোনা আছে এমন কেউই আমাদের ইমামদেরকে ‘আধিপত্যবাদী’ বলার মতো দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। অন্তত মেইন্সট্রিম কোনো গ্রুপ ইসলামের ইতিহাসে তারকাখ্যাত আলেমদেরকে ‘আধিপতবাদী’ বা ‘জ্ঞানের একক ঠিকাদার’ বলে অভিহিত করেছে বলে আমার জানা নেই।

কেনো প্রটেসট্যান্ট মুভমেন্টের মতো এক বিশাল শ্রেণী আমাদের পূর্ববর্তী আলেমদেরকে ‘স্বৈরাচারী’ বলতে পারছে না? কারণ, তাঁদের জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য আধিপত্য-কায়েম ছিলো না, তাঁদের জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য সমাজের বাকি সবার মুখকে স্তব্ধ করে দেবার জন্য ছিলো না।

নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তাঁরা জ্ঞানচর্চা করেছেন, আল্লাহর ভয়কে পূঁজি করে সেই জ্ঞান মানুষের কাছে প্রচার করেছেন। একটা ফতোয়া দিতে গিয়ে তাঁরা ‘লোকে কিসে তুষ্ট হবে, খুশি হবে’ এই চিন্তা না করে চিন্তা করেছেন- আল্লাহ খুশি হবেন তো? যার ফলে, তাঁদের মেথোডোলজি, তাঁদের ফতোয়া, তাঁদের আলোচনা সময়কে অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক।

একজন আরেকজনের সাথে কতো শতো বিষয়ে দ্বিমত করেছেন, একজন আরেকজনের মতের বিপক্ষে কতো বই লিখেছেন, তবুও তাঁরা একজন আরেকজনকে ছুঁড়ে ফেলেননি। ‘আদাবুল ইখতিলাফ’ (Ethics of disagreements) মেনেই তাঁরা আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। সাধারণ মানুষকে তাঁদের বিরোধী পক্ষের ব্যাপারে উস্কানি দেননি, তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলেননি।

মানুষজন ইমাম আবু হানিফার (রাহি:) প্রশংসা যেমন করতো, তেমনি সমালোচনার তীর নিক্ষেপ করতো। সেই খবরগুলো তাঁর কাছে পৌঁছাতো। বকর ইবনু জাফর (রাহি:) বলেন:

“মাঝে মাঝে কিছু লোক ইমাম আবু হানিফার (রাহি:) নিকট এসে অন্যদের নামে এটা-সেটা বলতে চাইতো। তিনি তাদের বলতেন, ‘এসব বাদ দাও, আগে বলো অমুক মাসআলা সম্পর্কে তোমার কী মতামত?’ তখন তারা থেমে যেতো।”

তিনি নিজে যেমন অন্যের সমালোচনা করতে অপছন্দ করতেন, তেমনি কেউ তাঁর তীর্যক সমালোচনা করলে সেই খবরটাও যেনো তাঁকে জানিয়ে মেজাজ উত্তপ্ত করা না হয় সেই ব্যাপারে ছাত্রদেরকে বলতেন। সমালোচনার জবাব দিতে দিতে সময় নষ্ট না করে তিনি বরং কাজ করে যেতেন। তিনি বলতেন:

“অন্যের দোষত্রুটি আমার নিকট বর্ণনা করবে না (আমাকে নিয়ে কে কী বললো তা আমার জানার দরকার নেই)। কেউ যদি আমার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। আর যদি ভালো কিছু বলে, তবে আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন। কে কী মন্তব্য করলো, কে কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো, সে বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজেদের কাজে মনোযোগী হও! দ্বীনের বিষয়ে পুরোপুরি বুৎপত্তি লাভ করো; দেখবে মানুষ এমনিতেই তোমার প্রতি ঝুঁকে পড়বে! একদিন সকলকেই তোমার দ্বারস্থ হতে হবে।” [৬]

স্বর্ণযুগের আলেমগণ জ্ঞান-গরিমায় যেমন শ্রেষ্ঠ ছিলেন, আদব-আখলাকের বেলায়ও ছিলেন শ্রেষ্ঠ। ইসলামে জ্ঞানের যে কেন্দ্রীকরণ-বিকেন্দ্রীকরণ করেছে, তাঁরা সেগুলো মেনে চলেছেন। যারফলে এক আলেমের মতকে অন্য আলেম, সাধারণ মানুষ অনুসরণ না করলেও সেই আলেমের বিরুদ্ধে মোটাদাগে সবাই ‘বিদ্রোহ’ করেনি। জ্ঞানচর্চার পথ এবং পাথেয় দুটোই ছিলো উন্মুক্ত, পুঞ্জীভূত নয়। উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চা করতে করতে যখন কোনো নব্য ফিরকার আবির্ভাব ঘটেছে, সমকালীন আলেমগণ সেগুলোকে অ্যাকাডেমিক রিফিউট করেন।

ক্ষতিকর জ্ঞানকে (ফিরকা) রিফিউট করা হয় উপকারী জ্ঞান দিয়ে, তরবারির আঘাতকে রিফিউট করা হয় তরবারি দিয়ে। সাধারণ মানুষ তাঁদের কাছে গেলে তাঁরা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলেননি- ‘তুমি কী জানো?’ বরং তাকে জানানোর চেষ্টায় তাঁরা লিপ্ত ছিলেন। তাঁদের চারিত্রিক মুগ্ধতায় অনেক মদ্যপায়ী, দুশ্চরিত্রের লোক তাঁদের ছাত্র হয়েছেন, পরবর্তীতে তাঁরাই বড়ো বড়ো আলেম হয়েছেন।

ইসলামি জ্ঞানের কেন্দ্রীকরণ-বিকেন্দ্রীকরণ যখন হাতে হাত মিলিয়ে চলবে, এই দুটো যতোক্ষণ ব্যালেন্স গতিতে আগাবে, সমাজে ততোক্ষণ পর্যন্ত আলেম-সাধারণের দ্বন্দ্ব লাগবে না। যারা কেন্দ্রে থাকবে তাঁরা যদি কম-জ্ঞানীদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, আধিপত্যবাদী মনোভাব পোষণ করে তখন সেই কম-জ্ঞানীরা আরো নিকৃষ্ট ভাষায় বেশি-জ্ঞানীদেরকে আঘাত করবে। শুরু হবে সেই ক্যাথোলিক-প্রোটেসট্যান্ট দ্বন্দ্ব। শুরু হবে পুরোহিত-পূজারীর দ্বন্দ্ব। শুরু হবে আশরাফ-আতরাফের দ্বন্দ্ব।

একটা সমাজে সেই দ্বন্দ্ব কোন অবস্থানে আছে সেটা বুঝতে হলে দেখতে হবে- সমাজের আলেমরা সাধারণের ব্যাপারে কী মন্তব্য করছে আর সমাজের সাধারণ মানুষরা আলেমদের ব্যাপারে কী মনোভাব পোষণ করছে।

সমাজের এই আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্বটি চিরন্তন। একজনের একটা মন্তব্য, একটা শব্দ সেই বারুদে আগুন লাগাতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটি আর জগন্নাথ ভার্সিটির শিক্ষকের মন্তব্যে অনলাইন-অফলাইন কতোটা উত্তাল হয়েছিলো আমরা দেখেছি।

উইলিয়াম টিন্ডেলকে পুড়িয়ে হত্যা করে কি ক্যাথোলিকরা জিতেছিলো? না, উল্টো হেরেছিলো। ১৬১১ সালে বাইবেলের কিং জেমস ভার্সনের যখন কাজ হয়, তখন ঐ ৪৭ জন স্কলার বাইবেলের সংস্করণ লিখতে গিয়ে সাহায্য নেন উইলিয়াম টইন্ডেলের অনূদিত বাইবেলের [৭]।

ক্রসচেক কর দেখা গেছে King James Version –এর নিউ টেস্টামেন্টের ৮৩% শব্দ হলো উইলিয়াম টিন্ডেলের ব্যবহৃত শব্দ, ওল্ড টেস্টামেন্টের ৭৬% শব্দ [৮]। মৃত টিন্ডেল তার কাজের মধ্যে জীবিত হয়ে উঠেন, কবরে শুয়েও ‘প্রতিশোধ’ নেন!

হয়তো এজন্যই কবি বলেছিলেন:

“মানুষের বৈপরীত্য নিয়ে কেউ আশাহত হয়ো না।
কারণ পরস্পর বিরোধীতার মধ্যেই জীবন।
কেউ প্রতিবাদ করে তরবারি নিয়ে
আর কেউ প্রতিবাদ করে তরবারির নিচে মাথা দিয়ে।”

তথ্যসূত্র:

১। D. Lortsch, Historie de la Bible en France, 1910, page 14.

২। Smyth, John Paterson. How We Got Our Bible: An Answer to Questions Suggested by the Late , page 56–72.

৩। Peters, Edward (2008). A Modern Guide to Indulgences: Rediscovering This Often Misinterpreted Teaching. page 13.

৪। ক্যারেন আর্মস্ট্রং, বুদ্ধ, পৃষ্ঠা ৩৮ (রোদেলা প্রকাশনী)।

৫। ছফিউর রহমান মোবারকপূরী, আর রাহীকুল মাখতূম (আল কোরআন একাডেমী লন্ডন), পৃষ্ঠা ২৩৬।

৬। কারদারি, মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা, পৃষ্ঠা ৩৫৪।

৭। Harding, Nathan (2012). Christ: Lost in the word.

৮। Tadmor, Naomi (2010), The Social Universe of the English Bible: Scripture, Society, and Culture in Early Modern England, Cambridge UP, page 16.


|| জ্ঞানের কেন্দ্রীকরণ বনাম বিকেন্দ্রীকরণ ||

  • আরিফুল ইসলাম
    ৭ আগস্ট ২০২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

five × 4 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য