একটা সময়ে স্পেনে শক্তিশালী ইসলামী সালতানাত ছিল। স্পেনের মতো এমন সমৃদ্ধ অঞ্চল তখন পুরো ইউরোপে ছিল না। কালের পরিক্রমায় স্পেনের মুসলিমরা বিভক্ত হয়ে যায়। স্পেনের বিভিন্ন অংশকে ‘তাইফাহ’ বলা হতো। এক তাইফাহর মুসলিম শাসক অন্য তাইফাহর মুসলিম শাসককে পরাজিত করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা আরম্ভ করল। এভাবে স্পেনের মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর শত্রুতা শুরু হয়ে গেল।
স্পেনের মুসলিমরা তখন অন্য মুসলিম তাইফাহকে হারানোর জন্য খ্রিষ্টান রাজাদের সাথে আঁতাত করার প্রতিযোগিতা শুরু করল। মুসলিমরা কয়েক শ’ বছর এত শক্তিশালী ছিল যে ইউরোপের খ্রিষ্টান রাজারা কল্পনাও করতে পারতো না নিজেদের সৈন্য নিয়ে মুসলিমদের তাইফাহর মধ্যে ঢুকবে। শক্তিশালী ইসলামী সালতানাত তখন স্পেন-ফ্রান্স সীমান্তের পিরিনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু অন্য মুসলিমকে হারানোর তীব্র নেশা তাদের এমনভাবে অন্ধ করে দিয়েছিল যে তারা নিজেরাই খ্রিষ্টান রাজাদেরকে নিজেদের তাইফাহর মধ্যে নিয়ে আসলো। এভাবে আস্তে আস্তে খ্রিষ্টান রাজারা মুসলিমদের উপরে ভর করে শক্তিশালী হওয়া আরম্ভ করলো। এবং ধীরে ধীরে তারা মুসলিমদেরকে পরাজিত করা আরম্ভ করল। একটা সময়ে তারা নিজেদের ‘মিত্র’ (?) মুসলিমদের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে গেল। এরপর তারা পুরো স্পেন থেকে সব মুসলিমদের পরাজিত করে একযোগে উৎখাত করে দিলো। যেই স্পেন থেকে ইমাম কুরতুবী(র.), ইমাম ইবন আব্দুল বার(র.) সহ বহু যুগশ্রেষ্ঠ আলেম-উলামার আবির্ভাব হয়েছিল, সেই স্পেনে ইসলাম ধর্ম পালন নিষিদ্ধ করে দেয়া হল। সেই স্পেনে আর ইসলামের চিহ্নও রইলো না। অথচ এর সূচনা হয়েছিল কিছু দুনিয়ালোভী মুসলিম শাসকের দ্বারা, যারা অন্য মুসলিমকে পরাজিত করার জন্য কা*ফিরদেরকে মিত্র হিসেবে নিয়েছিল। এবং নিজেদের ভূমিতে কা*ফিরদের সৈন্যবাহিনীকে জমায়েত করেছিল।
আমাদের ডারতীয় উপমহাদেশেও এমন নজির আছে। ব্রিটিশরা যখন বাংলার প্রতাপশালী নবাবকে পরাজিত করে ডারতবর্ষের একের পর এক জায়গা দখল করে নিয়ে সামনে আগাচ্ছিল, তখন তাদের সামনে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দক্ষিণ ডারতের এক সিংহপুরুষ। তাঁর নাম টিপু সুলতান। অত্যাচারী ব্রিটিশদের সামনে বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন ডারতবর্ষের কৃতি সন্তান শের ই মহিশুর টিপু সুলতান এবং তাঁর বাবা। ব্রিটিশরা আশঙ্কা করতো এই টিপু সুলতান যতদিন বেঁচে আছে, ডারতবর্ষে ইউনিয়ন জ্যাকের ঝাণ্ডা আর যিশু খ্রিষ্টের আধিপত্য বুঝি আর প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এই টিপু সুলতান বেঁচে থাকলে অবশ্যই তাদের শক্তিশালী বাহিনীকে ডারত মহাসাগরের ওপারে পালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু মহাবীর টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সাহায্যে এগিয়ে এলেন হায়দ্রাবাদের নিজাম। ব্রিটিশরা লোভী নিজামের সাহায্য নিয়ে টিপু সুলতানকে ক্রমে দুর্বল করে ফেলছিল। মারাঠা দস্যুরাও এই চক্রান্তে যোগ দিয়েছিল। অবশেষে ব্রিটিশদের সাথে পরাজিত হলেন টিপু সুলতান। ব্রিটিশরা ক্রমে পুরো ডারতবর্ষ কব্জা করে নিল। হায়দ্রাবাদের নিজামেরা পরে বুঝেছিল কী ভয়াবহ ভুল তারা করেছে।
ইতিহাসের সব থেকে বড় শিক্ষা হল – মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে। আজকের মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাঁকালেও আমরা এটাই দেখতে পাই। এককালের যে আরব ভূখণ্ডগুলো মুসলিমদের শক্তিশালী দুর্গ ছিল, আজ সেখানে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিতে ভরপুর। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটা মুসলিম দেশে এখন আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি আছে। এমনকি সেসব মুসলিম দেশের নিজেদের সামরিক বাহিনীও আমেরিকানদের উপর নানাভাবে নির্ভর করে। মুসলিম শাসকরা নিজেরাই নানা রকম জুজুর ভয় পেয়ে “নিরাপত্তা”র জন্য আর অন্য মুসলিম দেশের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমেরিকানদের সেখানে ডেকে এনেছে। ঠিক যেন মুসলিম স্পেনের তাইফার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। আমেরিকানরা একবার যেখানে সামরিক ঘাঁটি গাড়ে, আর কি কখনো সেখান থেকে চলে যায়? এখন তারা চাইলে নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহার করে ঐসব মুসলিম দেশের শাসকদেরকেও উৎখাত করে ফেলতে পারে যদি তারা আমেরিকার সাথে কোনো রকম ‘ঝামেলা’ করার চেষ্টা করে। তাই সেসব অঞ্চলের শাসকদের এখন কার্যত আমেরিকার ইচ্ছার উপর চলতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দেশ মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে বা হিজড়াইলের শক্তির ধারেকাছে যাবার উপক্রম করলেই ঘাঁটিগুলো দিয়ে আরামসে তাকে আক্রমণ করে শেষ করে দিচ্ছে আমেরিকা। মুসলিম দেশগুলো কেন শক্তিশালী হতে পারছে না এর পেছনে অনেক কারণ আছে। এর পেছনের অনেক কারণের একটা হল এটা।
এই উম্মতকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে এবং ‘স্বাধীন’ হতে হলে অবশ্যই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কা*ফিরদের ‘আওলিয়া’ হিসেবে নিতে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন সেটা অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে হবে। প্রতিটা মুসলিম ভূখণ্ড থেকে জালিমদের রাজা আমেরিকার সামরিক স্থাপনাগুলো সরিয়ে দিতে হবে। এই কাজটা খুবই কঠিন। কিন্তু এই কঠিন কাজটা সম্ভব করতে না পারলে ফিলিস-৩ এর মুক্তির স্বপ্ন শুধু স্বপ্ন হয়ে থাকবে। বাস্তব হবে না। আর মধ্যপ্রাচ্যকে ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে হিজড়াইল ও আমেরিকা।
