ইউরোপজুড়ে মুসলিমবিরোধী প্রচারণা ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) গোপন ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইউএই সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি বেসরকারি গোয়েন্দা ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান Alp Services-কে নিয়োগ দেয় মুসলিম সংগঠন ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালাতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় সরকার ও ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে মুসলিম ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা এবং গণমাধ্যমে তাদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা। এই প্রচারণা “সন্ত্রাসবাদবিরোধী” তৎপরতার নামে পরিচালিত হলেও, বাস্তবে এটি ইউরোপজুড়ে ইসলামবিদ্বেষী ও কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তে বলা হয়, ২০১৭ সাল থেকে Alp Services ইউএই গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট তৈরি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, উইকিপিডিয়া সম্পাদনা এবং সাংবাদিক ও মিডিয়া নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নির্দিষ্ট মুসলিম ব্যক্তি ও সংগঠনকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
এই গোপন কার্যক্রমগুলো “Arnica” ও “Crocus” নামের কোডে পরিচালিত হতো, যেগুলো সুইস পাহাড়ি ফুলের নামে রাখা হয়েছিল। ২০১৭ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত প্রথম চুক্তির মূল্য ছিল প্রায় ৫.৭ মিলিয়ন ইউরো, যা ইউএই-ভিত্তিক আল-আরিয়াফ নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া হয়—যেটি তদন্তকারীদের মতে, গোয়েন্দা সংস্থার ছদ্মবেশ ছিল।
২০২৩ সালের ৮ জুলাই বেলজিয়ান রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম RTBF জানায়, বেলজিয়ামসহ একাধিক ইউরোপীয় দেশের তদন্তে দেখা গেছে, ইউএই প্রায় ১,০০০ ইউরোপীয় ব্যক্তি ও ৪০০টির বেশি সংগঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও মানহানিমূলক প্রচারণা চালিয়েছে।
এই তালিকায় বেলজিয়ামের অন্তত ১৬০ জন নাগরিক ছিলেন। ঘটনার পর বেলজিয়াম সরকার ব্রাসেলসে নিযুক্ত ইউএই রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ব্যাখ্যা দাবি করে। Middle East Eye ২০২৩ সালের ৯ জুলাই জানায়, ইউরোপজুড়ে এই প্রচারণার ফলে ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের আদালতে Alp Services-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১,০০০ ইউরোপীয় নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অবৈধভাবে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে, যা পরে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে ব্যবহৃত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ইউএই এই প্রচারণায় কিছু প্রভাবশালী ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে অর্থায়ন করেছে, যারা নিয়মিত পশ্চিমা দেশে মুসলিম ও ইসলামি আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। এর মধ্যে আমজাদ তাহা নামের এক পরিচিত ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
এই অভিযোগগুলো এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইউএই ইউরোপে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সমালোচকদের মতে, এই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের আড়ালে ইউরোপীয় সমাজে ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু ইউএই–ইউরোপ সম্পর্ক নয়, বরং ইউরোপে নাগরিক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অধিকারের জন্যও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দেবে।
সোর্স: s2jnews, alestiklal
