Saturday, April 18, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরইরান যুদ্ধে দুর্বিষহ জীবন বাংলাদেশি শ্রমিকদের

ইরান যুদ্ধে দুর্বিষহ জীবন বাংলাদেশি শ্রমিকদের

প্রবাসের যে শহরগুলো একদিন ছিল রুটি-রুজির নিশ্চিন্ত আশ্রয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সেগুলো আজ রূপ নিয়েছে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। কুয়েত, কাতার কিংবা লেবানন—মানচিত্রভেদে নাম বদলালেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের দুর্দশার চিত্র সবখানে একই। মাথার ওপর যুদ্ধের ড্রোন আর মিসাইলের গর্জন, পায়ের নিচে অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের মাটিÑদুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন আমাদের রেমিট্যান্সযোদ্ধারা।

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের ফলে কাতার ও কুয়েতে কঠোর বিধিনিষেধ আর অর্থনৈতিক স্থবিরতায় কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন শত শত শ্রমিক। অন্যদিকে লেবাননে ইসরাইলি হামলার লেলিহান শিখা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আশ্রয়হীন প্রবাসীদের। আকাশছোঁয়া বিমান ভাড়া আর পাসপোর্ট জটিলতায় দেশে ফেরার পথও আজ রুদ্ধ তাদের। প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে দেশছাড়া এই মানুষগুলো এখন অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরানো এই মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা দেবে কে?

কাতার : নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক ধস

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান কাতারে। প্রতিদিন আকাশে সন্দেহভাজন ড্রোন প্রতিরোধের ঘটনা এবং সমুদ্রবন্দর এলাকায় জাহাজে হামলার খবর সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলেছে। রাজধানীর মুশরিব ভিআইপি এলাকা, যেখানে একাধিক আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি রয়েছে, সেখান থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে কাতার কর্তৃপক্ষ ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ নিষিদ্ধ করাসহ নাগরিকদের অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।

কাতার প্রবাসী রিফাত আলম হিরো আমার দেশকে জানান, সরকারি বিধিনিষেধের কারণে জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। বিশেষ করে যারা ফ্রি ভিসায় এসে কাজের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তারা এখন কাজ ও আয় হারিয়ে দিশাহারা।

তিনি বলেন, অনেকের কাজ নেই, আয় নেই। ঘর ভাড়া আর খাবারের খরচ চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। দেশে ফিরতেও পারছেন না। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, অথচ আয় শূন্যের কোঠায়।

সংকট আরো বেড়েছে যাতায়াত ব্যবস্থায়। বর্তমানে শুধু কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চালু থাকায় টিকিটের দাম সাধারণ প্রবাসীর নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে পাসপোর্ট জটিলতা। প্রবাসীদের অভিযোগ, পাসপোর্ট নবায়নের জন্য জমা দিয়েও তারা তা সময়মতো ফেরত পাচ্ছেন না; ফলে জরুরি প্রয়োজনেও দেশে ফেরা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সংকটকালে পর্যাপ্ত সতর্কতা বা কার্যকর সহায়তা না পাওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

অন্যদিকে দোহার পুরোনো সমুদ্রবন্দরে একটি পর্যটকবাহী ক্রুজ জাহাজ আটকা পড়ে থাকায় সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত পরিসরে খুললেও স্বাভাবিক পরিবেশ এখনো ফিরে আসেনি।

কুয়েত ও লেবানন : আতঙ্কের জনপদ

কুয়েত থেকে জাহিদ হাসান অভি নামের এক বাংলাদেশি আমার দেশকে জানান, সেখানে যুদ্ধ আতঙ্কে জনজীবন থমকে গেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো স্থবির হয়ে পড়ায় প্রবাসীরা চাকরির স্থায়িত্ব নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বহু পর্যটক কুয়েতে এসে আটকা পড়েছেন; কারণ কোনো বিমান চলাচল করছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় স্থবিরতা নেমে এসেছে সর্বত্র।

অন্যদিকে লেবানন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় দেশটিতে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে; ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইসরাইলি বর্ডার এরিয়া, দাহিয়ে ও বৈরুতের বিভিন্ন স্থানে তীব্র হামলা চলছে।

লেবানন প্রবাসী আলমগীর আমার দেশকে জানান, বর্তমানে ৫০০-৬০০ বাংলাদেশি বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। লেবাননে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ৭০ শতাংশই অবৈধ হওয়ায় সেখান থেকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার হার খুবই কম। বর্তমানে হুন্ডি বা বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। কাজ হারিয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী সংকটে নিরাপত্তা শঙ্কা, অর্থনৈতিক চাপ এবং মানবিক দুর্ভোগের সবচেয়ে ভারী বোঝাটি বইতে হচ্ছে প্রবাসী শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকে। নিজ ভূমিতে ফেরার আকুতি আর প্রবাসে টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা আজ বড়ই একা।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ২০২৬-এর ডেটামতে, কাতারে বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। এটি দেশটির মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ। ২০২৫ সালের তথ্যমতে, কাতারে বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের প্রবাহে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৮৭৭ মিলিয়ন টাকা (বিডিটি)। নির্মাণ, সেবা ও ড্রাইভিং খাতে কর্মরত এসব বাংলাদেশি কাতারের আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

কুয়েতে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে জনশক্তি রপ্তানি ছিল মোট অভিবাসনের প্রায় চার শতাংশ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২০ হাজার ৬৪৪ মিলিয়ন টাকা (বিডিটি)। এখানকার সরকারি ক্লিনিং সেক্টর, ড্রাইভিং ও কৃষি খাতে বাংলাদেশিদের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে, যা গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত।

লেবাননে বর্তমানে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, যাদের এক বড় অংশ নারী গৃহকর্মী এবং পুরুষ কৃষি ও গ্যারেজ মেকানিক। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, লেবাননের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি অত্যন্ত মানবেতর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, যাদের অনেকেই দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কর্মরত। অর্থনৈতিক মন্দা এবং বর্তমান অস্থিতিশীলতার কারণে লেবানন থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty + eleven =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য