
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ আফগানিস্তানের সামাজিক ব্যবস্থা ও একটি নির্দিষ্ট প্রথা নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন যে, আফগানিস্তানের সরকার ও সমাজ ব্যবস্থাকে অনেকেই উদযাপন করেন, অথচ সেখানে ‘বাচ্চাবাজি’ নামক একটি প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তানে গেলে এমন কোনো ট্রাক চালক পাওয়া যাবে না, যে কিনা বাচ্চাবাজ নয়। তার এই মন্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর এর ঐতিহাসিক ও বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা যাচাই করে দেখেছে ‘বিটুইন দ্য লাইনস ডেস্ক’। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ববি হাজ্জাজের এই দাবি কেবল তথ্যগতভাবেই ভুল নয়, বরং এর আড়ালে থাকা আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বাচ্চাবাজি আসলে কী এবং এর সাথে কারা জড়িত?
বাচ্চাবাজি মূলত একটি প্রাচীন ও চরম নিন্দনীয় প্রথা, যেখানে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের যৌন শোষণ এবং বিনোদনের জন্য দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।[1] এই হতভাগ্য কিশোরদের সাধারণত নারীদের পোশাক পরিয়ে নাচতে বাধ্য করা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা পাশবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।[2] এরা মূলত আসে অত্যন্ত দরিদ্র, ছিন্নমূল বা এতিম পরিবার থেকে। অনেক সময় চরম দারিদ্র্যের কারণে পরিবার টাকার বিনিময়ে তাদের সন্তানদের তুলে দিতে বাধ্য হয়।[3]
তবে ববি হাজ্জাজ দাবি করেছেন যে, আফগানিস্তানের সব ট্রাক চালকই এই প্রথার সাথে যুক্ত, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আন্তর্জাতিক ও দাপ্তরিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাচ্চাবাজি কোনো সাধারণ শ্রমজীবী বা কর্মজীবী মানুষের কাজ নয়। এই জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত থাকে সমাজের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিত্তশালী অংশ। স্থানীয় পুলিশ কমান্ডার, সামরিক বাহিনীর সদস্য, উপজাতীয় নেতা, ওয়ারলর্ড এবং মাফিয়া প্রধানরাই মূলত তাদের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি এবং সম্পদের বিকৃত প্রতীক হিসেবে এই কিশোরদের ব্যবহার করে থাকে।[4] সাধারণ ট্রাক চালকদের ওপর এই দায় চাপানো তাই সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত।
আফগান ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন এবং তালেবানের কঠোর অবস্থান
বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ আফগানিস্তানকে সমর্থন বা উদযাপন করে সেখানকার কোনো বিকৃত সাংস্কৃতিক প্রথার জন্য নয়, বরং আফগানিস্তান একটি ইসলামী শরিআহ দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র বলে। যেকোনো সমাজেই কিছু নেতিবাচক বা নিন্দনীয় প্রথা থাকতে পারে, কিন্তু একটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিচার করতে হয় সেই রাষ্ট্র তার ভেতরের সামাজিক ব্যাধিগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করছে, তার ওপর ভিত্তি করে। আর ঠিক এই জায়গাতেই ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্যতাটি ধরা পড়ে।
বাচ্চাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তালেবান সরকারের জন্য কেবল একটি নীতি ছিল না, বরং তাদের ঐতিহাসিক উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণই ছিল এটি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মুজাহিদীন ওয়ারলর্ডদের দ্বারা সংঘটিত শিশু যৌন নির্যাতন ও বাচ্চাবাজির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই তালেবানদের জন্ম হয়েছিল।[5] ২০০২ সালে ‘দ্য টাইমস অব লন্ডন’-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমর দুই মিলিশিয়া কমান্ডারের হাত থেকে এক কিশোরকে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।[6] এরপর থেকে তারা এমন অসংখ্য কিশোরকে উদ্ধার করে এবং যারা বাচ্চাবাজির সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোল্লা ওমর ফতোয়া জারির মাধ্যমে বাচ্চাবাজিকে ইসলামী শরিয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে এর শাস্তি নির্ধারণ করেন মৃত্যুদণ্ড।[7] তালেবানদের এই কঠোর অবস্থানের কারণে সে সময় বাচ্চাবাজি প্রকাশ্যে আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং এটি একটি গোপন কার্যক্রমে পরিণত হতে বাধ্য হয়।
মার্কিন দখলদারিত্ব এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও অন্ধকারের অধ্যায়টি শুরু হয় ২০০১ সালে, যখন গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের ধ্বজা উড়িয়ে আমেরিকা আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়। তালেবানদের পতনের সাথে সাথে বাচ্চাবাজির বিরুদ্ধে থাকা শরিয়াহ ভিত্তিক মৃত্যুদণ্ডের আইনটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়।[8] নতুন আফগান আইনে এর কোনো বিকল্প শাস্তির বিধান না থাকায় মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতিতেই বাচ্চাবাজি নতুন করে তার ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।[9] সেক্যুলার পশ্চিমা শক্তি আফগানিস্তানে এই অপরাধ দমনে কোনো পদক্ষেপ তো নেয়ইনি, বরং তারা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ‘লুক দ্য আদার ওয়ে’ বা না দেখার ভান করার নীতি গ্রহণ করেছিল।[10]
একাধিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিল আফগান মিত্রদের দ্বারা সংঘটিত এই শিশু নির্যাতন দেখেও এড়িয়ে যেতে।[11] কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এটি নাকি আফগানদের সংস্কৃতি। মার্কিন ঘাঁটির ভেতরে আফগান পুলিশদের ক্যাম্পে আনা কিশোরদের আর্তনাদ শুনেও আমেরিকান সৈন্যদের হস্তক্ষেপ করার অনুমতি ছিল না। ২০১২ সালে এমন একটি ঘাঁটিতেই নিহত হওয়া ল্যান্স কর্পোরাল গ্রেগরি বাকলি জুনিয়র তার বাবাকে এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন।[12] শুধু তাই নয়, যেসব মার্কিন সেনা এই অপরাধ থামানোর চেষ্টা করেছিলেন, উল্টো তাদেরকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ডার ড্যান কুইন এবং সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস চার্লস মার্টল্যান্ড একজন মার্কিন-সমর্থিত মিলিশিয়া কমান্ডারকে একটি ছেলেকে শেকল দিয়ে বেঁধে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করার অপরাধে মারধোর করেছিলেন। এই সাহসিকতার জন্য পুরস্কৃত হওয়ার বদলে মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়।[13] মূলত তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আফগান মিলিশিয়াদের খুশি রাখতেই আমেরিকা এই ঘৃণ্য অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়েছিল।[14] অবশেষে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১৬ বছর পর, ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে বাচ্চাবাজির জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির আইন প্রণয়ন করা হয়।[15]
বাস্তবতার নিরিখে ববি হাজ্জাজের দাবি
ইতিহাসের এই বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আফগানিস্তানের বর্তমান ইসলামী সরকার বরাবরই বাচ্চাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং শরিয়াহ আইনের মাধ্যমেই একে শক্তভাবে দমন করেছে। ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি যে সেক্যুলার আইন ও সেক্যুলার ডেমোক্রেসির প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন, সেই আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সেক্যুলার সরকারের আমলেই আফগানিস্তানে বাচ্চাবাজির সবচেয়ে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছিল।8 সাধারণ ট্রাক চালকদের বাচ্চাবাজ বলে তিনি যে দাবি করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সুতরাং, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কোনো বিকৃত প্রথা দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে বিচার করার আগে, সেই রাষ্ট্র উক্ত প্রথাটি দমনে ঐতিহাসিকভাবে কী ভূমিকা পালন করেছে, তার প্রকৃত তথ্য জেনে মন্তব্য করাই যৌক্তিক। ববি হাজ্জাজের দাবিটি তাই ঐতিহাসিকভাবে অসত্য এবং ফ্যাকচুয়ালি ভুল।
