কলকাতার দক্ষিণ শহরতলির বারুইপুরে ১১ বছরের এক মুসলিম কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ওই এলাকায় এক যুবককে পিটিয়েও মারা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে ক্ষুব্ধ জনতার রোষেই তার মৃত্যু হয়। রোববার বারুইপুর থানার পুলিশ এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। পরে আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তিনজনকে আটক করা হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ১৬৩ ধারা (আগের ১৪৪ ধারা) অনুযায়ী বারুইপুরে পাঁচজনের বেশি জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। কোনো রকম সংঘাত ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ ও গ্রেফতারদের জবানবন্দি মিলিয়ে তদন্তকারীরা এখন ঘটনার পুনর্গঠন করছেন। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, কিশোরীকে জীবিত অবস্থাতেই বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, শনিবার বিকেল ৪টার দিকে খাবার কিনতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই কিশোরী নিখোঁজ ছিল। রবিবার সকালে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, খুনের আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। পরে পুলিশ পকসো আইনে ধর্ষণ ও খুনের মামলা রুজু করে।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে কিশোরীর ফুসফুসে কাদা পানি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, খুনের পর দেহ পানিতে ফেলা হলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। ফলে তাদের ধারণা, পানিতে ফেলার সময়ও কিশোরী জীবিত ছিল। রিপোর্টে তার যৌনাঙ্গে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং মাথায় গুরুতর আঘাতের কথাও বলা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও পানিতে ডুবে শ্বাসরোধ—মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে শনিবার বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে সূর্যপুর বাজারের মূল রাস্তা দিয়ে কিশোরীকে হাঁটতে দেখা যায়। তার কয়েক কদম পেছনে লাল টি-শার্ট পরা এক যুবককে দেখা যায়, যাকে স্থানীয়রা প্রভাস মণ্ডল বলে শনাক্ত করেন। প্রভাসকে জেরা করে পরে আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করেছে, তিনজনকে আটক করেছে।
জেরায় প্রভাস মণ্ডল প্রথমে কিছুই জানেন না বলে দাবি করলেও পরে বলেন, চারজন কিশোরীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, আনন্দ সর্দার নামের এক ব্যক্তি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, তার বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্যেও অসংগতি পেয়েছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের একাংশের ধারণা, ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। একটি সম্ভাবনা হিসেবে তারা বলছেন, নির্যাতিতা অভিযুক্তদের চিনে ফেলায় প্রমাণ লোপাটে তাকে হত্যা করা হয়। আরেকটি সম্ভাবনা, নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ধরা পড়ার আশঙ্কায় তাকে মাথায় আঘাত করে অচেতন করে বস্তাবন্দি অবস্থায় পুকুরে ফেলা হয়। এক প্রতিবেশীর দাবি, বস্তা ছেঁড়া ছিল, যা থেকে কিশোরীর বের হওয়ার শেষ চেষ্টা বোঝা যায়।
এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়ায়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। একইসঙ্গে এক অভিযুক্তকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে; জনরোষে তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বারুইপুরে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং ১৬৩ ধারা অনুযায়ী পাঁচজনের বেশি জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।
এ ঘটনায় একটি বিশেষ তদন্তকারী দলও গঠন করেছে পুলিশ। প্রেসিডেন্সি রেঞ্জের আইজি কঙ্করপ্রসাদ বারুই জানিয়েছেন, সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নির্যাতিতার পরিবারের পাশে থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। দলের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পুলিশ প্রশাসন কালীঘাটে মমতা ব্যানার্জীর চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বিরোধী মহলে বিষয়টি নিয়ে পাল্টা বক্তব্যও এসেছে।
ঘটনাটি নিয়ে রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, তারা ন্যায়বিচারের দাবি তুললেও পুলিশ তাদেরই বাধা দিচ্ছে। পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে বারুইপুর ও সংলগ্ন এলাকায় এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
