আধুনিক প্রজন্মের মানুষদের মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা ও দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে একধরনের ইল্যুশন তৈরি হয়েছে। তারা মনে করে বসে আছে যে, কেবল ভালোবাসা দিয়েই জীবন পার করে দেবে।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভাঙা পরিবার ভাঙার হিড়িক পড়ে গেছে, ঘরে ঘরে অসুখী দাম্পত্য এবং পারিবারিক কলহ। অথচ একসময় তারা একে অপরকে ভালোবেসেই ঘর বেঁধেছিল।
প্রশ্ন হলো—যদি ভালোবাসাই যথেষ্ট হতো, তাহলে একসময় এত গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক কিছু দিন, কিছু মাস বা কিছু বছর পর ফিকে হয়ে যায় কেন? কেন ক্লান্ত হয়ে ওঠে জীবন, কেন ভেঙে যায় সংসার?
এর অন্যতম কারণ হলো, মানুষ ভালোবাসার গুরুত্বকে যতটা বুঝেছে, আচরণের গুরুত্বকে ততটা বুঝেনি।
কুরআন ও সুন্নাহর দিকে তাকালেও একটি গভীর সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলাম বারবার ন্যায়বিচার, দয়া, সম্মান, সদাচার এবং দায়িত্ব পালনের কথা বলেছে, একবারও ভালোবাসার কথা বলেনি। বলেনি, স্বামীকে ভালোবাসো, স্ত্রীকে ভালোবাসো, সন্তানকে ভালোবাসো কিংবা পিতামাতাকে ভালোবাসো। এ ধরনের নির্দেশনা ইসলামের মূল ভাষ্যে আমরা খুঁজে পাই না।
পিতামাতার ক্ষেত্রে নির্দেশ এসেছে সম্মান ও বিনয়ের।
সন্তানদের ক্ষেত্রে এসেছে দয়া, লালন-পালন ও উত্তম শিক্ষার কথা।
স্বামীর ক্ষেত্রে এসেছে স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করার কথা।
স্ত্রীর ক্ষেত্রে এসেছে স্বামীর আনুগত্যের কথা।
অর্থাৎ ইসলাম মানুষের সম্পর্ককে ক্ষণস্থায়ী আবেগের ওপর নয়, বরং স্থায়ী নৈতিকতার ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছে।
কারণ নিত্য পরিবর্তনশীল মনের আবেগ সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, কিন্তু চেষ্টা করলে আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ এবং উত্তম আচরণ—এসব এমন গুণ, যা মানুষ সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ধরে রাখতে পারে। এ কারণেই ইসলাম সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে আবেগ নয়, চরিত্রকে বেছে নিয়েছে।
মানুষের অন্তরে অবশ্যই কিছু সহজাত ভালোবাসা রয়েছে। মা তার সন্তানকে ভালোবাসেন। সন্তান তার পিতামাতার প্রতি টান অনুভব করে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আকর্ষণ ও মমতা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ মানুষের প্রকৃতির মধ্যেই এসব অনুভূতি স্থাপন করে দিয়েছেন।
কিন্তু এই ভালোবাসা পাথরে খোদাই করা কোনো স্থায়ী জিনিস নয়।
একটি ফুলগাছের কথা চিন্তা করুন। মাটিতে তার বীজ আছে, জীবনও আছে। কিন্তু নিয়মিত পানি, আলো ও যত্ন না পেলে গাছটি শুকিয়ে যায়। মানুষের সম্পর্কও ঠিক তেমন।
ভালোবাসা বীজ হতে পারে, কিন্তু উত্তম আচরণই সেই বীজকে বৃক্ষে পরিণত করে।
দাম্পত্য জীবনে আমরা প্রায়ই একটি ভুল করি। আমরা ভালোবাসা চাই, কিন্তু এমন আচরণ করি না, যা ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখে।
অনেক স্ত্রী আছেন, যারা স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা প্রত্যাশা করেন, কিন্তু তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন না; তার পছন্দ-অপছন্দকে ততক্ষণই দাম দেন, যতক্ষণ তা নিজের পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে মেলে; না মিললে আর দাম দেন না। স্বামীর আত্মমর্যাদাকে গুরুত্ব দেন না, তার সংগ্রাম কিংবা মানসিক চাপের প্রতি কোনো সহমর্মিতা দেখান না। তার নিত্যদিনের সংগ্রামকে স্বাভাবিক ধরে নেন, ভুলগুলোকে বড় করে দেখেন, ভালো কাজগুলোকে ভুলে যান।
বিপরীতে অনেক স্বামী আছেন, যারা সংসারের জন্য সব করেন, স্ত্রীর জন্য বাড়ি বানান, গহনা কেনেন, খরচ দেন—কিন্তু কখনো একটি আন্তরিক ধন্যবাদ দেন না, কখনো তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন না, কখনো তার কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করেন না। উল্টো তাকে ছোট করেন, অপমান করেন, খোঁটা দেন।
…..
বাস্তবতা হলো, মানুষ কারও সঙ্গ দীর্ঘদিন উপভোগ করে তার প্রতি ভালোবাসার দাবির কারণে নয়; বরং তার সান্নিধ্যে শান্তি পাওয়ার কারণে।
যে মানুষ প্রতিনিয়ত অভিযোগ করে, অপমান করে, নেতিবাচকতা ছড়ায়—তার প্রতি ভালোবাসা থাকলেও তার সঙ্গ ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।
আর যে মানুষ সম্মান দেয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ভুল ক্ষমা করে, উৎসাহ দেয়, প্রশান্তি সৃষ্টি করে—তার সঙ্গ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উপভোগ করে। কথিত ভালোবাসা যদি কিছুটা কমও থাকে, তবুও সম্পর্ক ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে না; বরং উত্তম আচরণের কারণে ভালোবাসা প্রতিনিয়ত বেড়ে যায় এবং সম্পর্ক সবুজ থেকে সবুজতর হয়।
তাই দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত “সে আমাকে কতটুকু ভালোবাসে?” নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“আমি কি এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে বসবাস করা সহজ?”
“আমার উপস্থিতি কি আমার জীবনসঙ্গীর জন্য স্বস্তির কারণ, নাকি মানসিক চাপের কারণ?”
“আমি কি তার হৃদয়ে নিরাপত্তা সৃষ্টি করি, নাকি অস্থিরতা সৃষ্টি করি?”
আমরা প্রায়ই অন্যের হৃদয় পরিবর্তন করতে চাই, অথচ নিজের আচরণ পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করি না।
কিন্তু সত্য হলো, অধিকাংশ সম্পর্ক ভাঙে ভালোবাসার অভাবে নয়; ভাঙে সম্মানের অভাবে, কৃতজ্ঞতার অভাবে, ধৈর্যের অভাবে এবং সুন্দর আচরণের অভাবে।
তাই আপনি যদি চান আপনার জীবনসঙ্গী আপনাকে আরও বেশি ভালোবাসুক, তাহলে প্রথমে নিজের আচরণকে ভালোবাসার উপযোগী করে তুলুন। ন্যায়পরায়ণতা আর উত্তম আচরণ এমন এক জাদুর কাঠি, যা আপনার বাকি সব সমস্যা সমাধান করে দেবে।
