যেকোনো সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে বিশ্বাস ও সম্মানের ওপর। কিন্তু প্রতারণা সেই ভিত্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয় এবং একসময় সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে পরকীয়াকে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হলেও, তারকাদের নানা মন্তব্য ও আচরণ বিষয়টিকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে তুলছে বলে আলোচনা রয়েছে।
সম্প্রতি বলিউড অভিনেতা রাম কাপুর বলেছেন, সম্পর্কের কঠিন সময়ে একজন মানুষ ‘ভুল করে’ সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করে বসতে পারেন। এর আগে ‘টু মাচ’ অনুষ্ঠানে টুইংকেল খান্না ও কাজলের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সময় সঞ্চালক বলেছিলেন, ‘রাত গায়ি, বাত গায়ি’ (রাত পোহালেই কথা শেষ)। এ মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
দীর্ঘদিন ধরেই তারকাদের প্রেম ও সম্পর্কের গুঞ্জন ট্যাবলয়েডের আলোচনার বিষয় হয়ে আসছে। তবে এসব ঘটনার ধারাবাহিক প্রচার মানুষের মধ্যে পরকীয়া বা প্রতারণা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাচ্ছে বলেও মত রয়েছে।
প্রতারণা বা পরকীয়া কী
প্রতারণা বা পরকীয়ার সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। এটি পুরোপুরি সাদা-কালো কোনো বিষয়ও নয়।
ভারতের এশিয়ান হাসপাতালের কনসালট্যান্ট-ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. দীপিকা শর্মা বলেন, ‘প্রতারণা বলতে মূলত সম্পর্কের পারস্পরিক নির্ধারিত সীমানা লঙ্ঘন করাকে বোঝায়, যা বিশ্বাসের অমর্যাদা করে। শারীরিক ঘনিষ্ঠতা ছাড়াও পরকীয়া বিভিন্ন রূপ নিতে পারে। যেমন—আবেগের সম্পর্ক, গোপনে রোমান্টিক কথোপকথন, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারের কথা লুকিয়ে রাখা, অনলাইনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়ানো বা এমন কোনো মেলামেশা গোপন করা, যা সঙ্গীর জানার কথা।’
‘অ্যান্ডউইমেট’-এর প্রতিষ্ঠাতা শালিনী সিং বলেন, প্রতারণা শুধু শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ভাষায়, ‘মূলত প্রতারণা নির্দিষ্ট কোনো কাজের চেয়েও দুজন মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ও প্রত্যাশা ভেঙে দেওয়ার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।’
প্রতারণা কি আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে?
কোনো বিষয় বারবার সামনে এলে মানুষ ধীরে ধীরে সেটির প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। প্রতারণার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারকাদের পরকীয়া নিয়ে রসিকতা, সমর্থন বা যুক্তি তুলে ধরা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে।
গেটওয়ে অব হিলিং-এর প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও সাইকোথেরাপিস্ট ডা. চাঁদনি তুগনাইত বলেন, ‘তারকাদের বিভিন্ন মন্তব্য এবং হাই-প্রোফাইল পরকীয়ার খবর সমাজে কী স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য, সে সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করে। যখন জনপ্রিয় কোনো ব্যক্তি বলেন যে পরকীয়া কেবল একটি ভুল ছিল, তখন ধীরে ধীরে এটিকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা শুরু হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারকাদের আপস করে নেওয়া বা ক্ষমা করার বিষয়টির সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সরাসরি কোনো যোগসূত্র নিয়ে আনুষ্ঠানিক গবেষণা নেই। তবে এই প্রবণতা অস্বীকার করার উপায় নেই। যখন একজন নারী তার প্রতারক সঙ্গীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা করে দেন, তখন তার মহানুভবতার প্রশংসা করা হয়। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে একজন পুরুষ যখন ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তখন সেটাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।’
খ্যাতি কি বাড়তি সুবিধা দেয়?
কোনো তারকার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়ালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই পুরো ঘটনা না জেনেই পক্ষ নেন। অনেক ভক্ত তারকার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনকে আলাদা করে দেখেন।
ডা. দীপিকা শর্মা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে তারকাদের প্রায়ই সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যখন খ্যাতি, ক্ষমতা, অর্থ বা প্রতিভাধর কোনো ব্যক্তি তার স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণার মতো ক্ষতিকর আচরণ করেন, তখন তাদের মর্যাদার কারণে সেই আচরণ অনেক সময় বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হতে পারে।’
ডা. তুগনাইতের মতে, কেউ যথেষ্ট জনপ্রিয় হলে তাঁর আচরণের সমালোচনার চেয়ে ব্যাখ্যা বা সাফাই বেশি দেওয়া হয়। ফলে পরকীয়াকে সম্পর্কের ‘কঠিন সময়’ বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে ‘জটিল পরিস্থিতি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একই বিষয় ভিন্নভাবে দেখা হয়।
এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনা যখন রসালো গল্প হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তখন বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক আঘাত ও শোকের মতো বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যায়।
শালিনী সিং বলেন, ‘পিআর (জনসংযোগ) ন্যারেটিভ, গণমাধ্যমের খবর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবকিছুই কোনো ঘটনা কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা প্রভাবিত করে। ভক্তদের মনে রাখা উচিত, তারা কেবল ঘটনার একটি সাজানো অংশ দেখছেন। পুরো পরিস্থিতি না জেনে কাউকে সমর্থন বা নিন্দা করতে তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়।’
বর্তমান সময়ে প্রতারণা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। সমাজে এর উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। তবে শালিনী সিংয়ের মতে, ‘গত ১০ থেকে ২০ বছরে প্রতারণার বিষয়টি আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহের কারণে প্রতারণা নিয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে।’
ডা. তুগনাইত বলেন, বিশ্বাসভঙ্গের কারণে মানুষের কষ্টের অনুভূতি এখনো একই রকম থাকলেও প্রতারণার ধারণা ও কাঠামো বদলেছে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতারণা বলতে আসলে কী বোঝায়, তা নিয়ে এখন অনেক বেশি আলোচনা হয়। আর এ অস্পষ্টতার বড় একটি অংশ মানুষ অনলাইন ও তারকা সংস্কৃতি থেকে সরাসরি গ্রহণ করছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা নিয়ে বিতর্ক চললেও সম্পর্ক, তারকা সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে মানুষের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়টিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
