গত জুলাই ২০২৬ এ আজাদ কাশ্মীরে যা ঘটে গেল, সেটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা ছিল একটা আয়নার মত। পাকিস্তান রাষ্ট্র সেই আয়নায় নিজের আসল চেহারা দেখতে বাধ্য হয়েছে। ঘটনাটা উপলক্ষ মাত্র; আসল বিষয় হলো – এই রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে জমে থাকা কাঠামোগত মিথ্যাচার, জুলুম এবং অহংকারের প্রতিচ্ছবি!
Global War On Terror এর মূল্য – যা পাকিস্তান নিজেই শোধ করছে:
দুই দশক ধরে পাকিস্তান নিজেকে “war on terror”এর ফ্রন্টলাইন ‘মিত্র’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বিক্রি করেছে. বিনিময়ে মার্কিন অস্ত্র, ঋণ মওকুফ, কূটনৈতিক আশ্রয় এবং IMF-এর কাছে বারবার নতুন বেলআউটের সুযোগ পেয়েছে। এই লেনদেনের একটা লুকানো মূল্য ছিল, যা এখন প্রকাশ্যে আসছে।
জাতীয় নিরাপত্তার নামে যে বিশাল আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল – সন্ত্রাসবিরোধী আইন, গোয়েন্দা নজরদারি, সামরিক আদালত, দাবি করা হত – তার লক্ষ্য ছিল বহিঃশত্রু ঠেকানো। বাস্তবে এই অবকাঠামো ধীরে ধীরে অভ্যন্তরমুখী হয়ে উঠেছিল। সেই আইন এখন প্রয়োগ হচ্ছে বিদ্যুৎ ভর্তুকির দাবিতে রাস্তায় নামা সাধারণ কাশ্মীরি নাগরিকদের বিরুদ্ধে। ৫ জুন ২০২৬-এ JAAC-কে “proscribed organization” ঘোষণা এই মিলিটারাইজড স্টেট মডেলের এর সরাসরি ফসল।[১]
বৈদেশিক নিরাপত্তা-অংশীদারিত্ব যে দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করেছিল, তা আজ পাকিস্তান নিজের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, সুরক্ষা এবং রক্তের বিনিময়ে শোধ করছে। সিস্টেমটিই এমন এই দানব তৈরি করলে তাকে খেতে দিতেই হবে। যখন বাইরে কিছু কররা নেই তখন দেশের ভিত্রেই সেই দানব আছড়ে পড়ে!
যত গর্জে তত বর্ষে নাঃ
পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে পারমাণবিক শক্তিধর, আঞ্চলিক ভারসাম্যের রক্ষক, “Muslim world”এর প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে উপস্থাপন করে। এই ভাবমূর্তি এতটাই সযত্নে নির্মিত যে বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানকে প্রায়ই একটা সুসংহত, আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র মনে হয়। কিন্তু এই ভাবমূর্তির ভেতরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নিজেরই প্রশাসনাধীন আজাদ কাশ্মীরে যখন জনগণ বিদ্যুৎ ভর্তুকি আর গমের আটার মতো মৌলিক দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে, রাষ্ট্রের হাতে তখন সংলাপের কোনো ভাষা থাকে না, জবাব আসে গুলি আর যোগাযোগ ব্ল্যাকআউট দিয়ে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে নির্বাচন পূর্ব সহিংসতায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, যার সিংহভাগই বেসামরিক বিক্ষোভকারী।[২] একটা রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের ন্যূনতম অর্থনৈতিক দাবির মুখে এতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তখন আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে – তার ভিতরের স্থিতিশীলতা আসলে কতটা নাজুক!
Labelling – রাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরনো অস্ত্রঃ
যখনই কোনো রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের ন্যায্য দাবির মুখোমুখি হয়, তখন প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় সংলাপ নয়, লেবেলিং। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ কাশ্মীরি বিক্ষোভকারীদের “ভারতের মতো শত্রু” বলে আখ্যায়িত করেছে।[৩]
এই একই প্যাটার্ন সীমানার ওপারেও দেখা যায়: ভারতে কৃষক ও নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনকারী এবং সাম্প্রতিক সময়ে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভে রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতৃত্ব সাধারণ নাগরিকদের “টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং” ও “অ্যান্টি ন্যাশনাল” বলে ট্যাগিং দিয়েছিল, যদিও তাদের দাবি এবং বিক্ষোভের ভিত্তি ছিল সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ![৪]
বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছাত্রদের শেখ হাসিনা “রাজাকার”এর সাথে তুলনা করেছিল – একটি শব্দ যার ঐতিহাসিক ভার রাষ্ট্রদ্রোহের সমান, এবং যা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।[৫]
তিনটি ভিন্ন রাষ্ট্র, তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট – অথচ স্ক্রিপ্ট হুবহু এক: নিজের নাগরিকের ন্যায্য প্রতিবাদকে রাষ্ট্র প্রথমে “বিদেশি এজেন্ডা” বা “বিশ্বাসঘাতক” নাম দেয়, তারপর সেই লেবেলকে বলপ্রয়োগের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করে। এই ডি-লেজিটাইজেশন এর ভাষাই প্রমাণ করে দেয়, রাষ্ট্র নিজেই জানে তার নাগরিকের দাবি ন্যায্য – নইলে সত্যি কথা দিয়েই জবাব দেওয়া যেত, অপবাদ দিয়ে নয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই তিনটি ক্ষেত্রেই লেবেলিং এর পরপরই আসে বলপ্রয়োগ। কথার আঘাত আগে, তারপর শারীরিক আঘাত।
প্রথমে প্রতিবাদীকে জাতির শত্রু বানানো হয়, তারপর তার বিরুদ্ধে বল প্রয়োগকে জনগণের কাছে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। এই দুই ধাপের কৌশল দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর একটা সাধারণ চরিত্র হয়ে উঠেছে – গণতান্ত্রিক হোক বা কর্তৃত্ববাদী, প্রতিটি রাষ্ট্রই সংকটের মুহূর্তে একই স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে।
মিলিটারি গভার্নেন্স – দ্য ফ্রাঙ্কেনস্টাইনঃ
পাকিস্তানের প্রকৃত সমস্যা মূলত প্রশাসনিক – দুর্বল কর ব্যবস্থা, তীব্র প্রাদেশিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক এলিট শ্রেণীর সম্পদ ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান দরকার দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সংকটেই রাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিক্রিয়া হয় সামরিক মোতায়েন, প্যারামিলিটারি রেঞ্জার্স, ফ্রন্টিয়ার কনস্ট্যাবুলারি। রাওয়ালাকোটের ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটা একটা দীর্ঘদিনের প্যাটার্নের সর্বশেষ প্রকাশ, যেখানে রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার জায়গা বারবার দখল করে নেয় বন্দুক, আর গভর্ন্যান্সের ব্যর্থতা ঢাকা পড়ে যায় নিরাপত্তার আড়ালে।
পাকিস্তান রাষ্ট্র যেভাবে মিলিটারিকে ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মত গড়ে তুলেছে সেই দানবই বারবার তার নাগরিকদের উপরে আঘাত করেছে!
তুমি ভুল, তাই আমি ঠিকঃ
পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর (IOK)এর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সোচ্চার হয় – অথচ নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরে একই স্ক্রিপ্ট: ব্ল্যাকআউট, নির্বিচার গুলি, সংগঠন নিষিদ্ধকরণ। কাশ্মীর ইস্যু পাকিস্তানের কূটনৈতিক পুঁজি, কিন্তু কাশ্মীরিদের প্রকৃত অধিকার তার আগ্রহের বিষয় নয়, বরং ঐতিহাসিক ভাবেই পাকিস্তান কাশ্মিরকে ভারতের বিরুদ্ধে তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। কাশ্মিরের ব্যাপারে যেহেতু বিশ্ব দরবারে ইন্ডিয়া খারাপ, তাহলে নিশ্চয়ই পাকিস্তান ভালো! কিন্তু প্রকৃত অর্থে – পাকিস্তান এবং ইন্ডিয়া উভয়েই কাশ্মিরকে ব্যবহার করেছে, শোষণ করেছে নিজের স্বার্থে!
“মুসলিম” পরিচয়ের ব্যবহার ও অপব্যবহারঃ
পাকিস্তানের আদর্শগত সবচেয়ে বড় অন্যায়টি সম্ভবত এটি, আদর্শিক গাদ্দারি! পাকিস্তান নিজেকে উম্মাহর প্রতিনিধি হিসেবে জাহির করে, যা তাকে মুসলিম বিশ্বে নৈতিক লেভারেজ দেয়। কিন্তু নিজের মুসলিম নাগরিকদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে – বেলুচিস্তান, PTM, এবং এখন আজাদ কাশ্মীরে, সম্পূর্ণ ভিন পাকিস্তান দেখা যায়! পাকিস্তান “মুসলিম ব্রাদারহুড” এর ভাষা বাহ্যিক কূটনীতির জন্য সংরক্ষিত রাখে, আর নিজ ভূখণ্ডে কেবল জুলুম এবং গোত্র ভিত্তিক অহংকার!
আজাদ কাশ্মীরের এই সংকট তাই কেবল স্থানীয় নির্বাচনী সহিংসতা নয় বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোগত মিথ্যার একটা আবশ্যিক ফলাফল। যে রাষ্ট্র বাইরে উম্মাহ’র সৈনিক পরিচয় দিয়ে নিজের নাগরিকদের সাথে বুলেটের ভাষায় কথা বলে তাকে মুসলিম উম্মাহ’র রাহবার নয়, গাদ্দার বলা হবে!
