কল্পনা করেন, একজন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলো। তার বিরুদ্ধে মামলা হলো, তাকে জেলে পাঠানো হলো, তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্র তাকে শাস্তি দিল।
এটা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক দমন হতে পারে। কিন্তু এখানে অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার যে, রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
এখন দৃশ্যটা একটু বদলাই।
একজন মাদ্রাসার ছাত্র রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। অথবা একজন দাড়ি-টুপি পরা মানুষ কোনো মিছিলে এসেছে।
তারপর তার পোশাক সন্দেহের কারণ হলো। তার শিক্ষা সন্দেহের কারণ হলো।
তার ধর্মীয় পরিচয় সন্দেহের কারণ হলো। এবার রাষ্ট্র শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আক্রমণটা তার পুরো পরিচয়ের ওপর চলে যাচ্ছে।
এই দুটোকে কি একই ধরনের নিপীড়ন বলা যায়? দূর থেকে দেখলে দুটোই রাষ্ট্রের দমন-পীড়ন। কিন্তু একটু গভীরে গেলে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বিরোধীকে রাষ্ট্র শত্রু হিসেবে দেখতে পারে তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। কিন্তু তাকে তার পোশাক, তার ধর্মীয় অনুশীলন কিংবা তার জীবনযাপনের কারণে ‘অপর’ বানানোর প্রয়োজন হয় না।
তার দাড়ি তাকে অপরাধী বানায় না। তার টুপি তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় না। তার পোশাক কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে ধরে নেওয়া হয় না।
কিন্তু মাদ্রাসার ছাত্র বা দাড়ি-টুপি পরা কোনো মানুষ যখন একই রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়ায়, তখন অনেক সময় তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আগেই তার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়টি সামনে চলে আসে।
এখানেই নিপীড়নের ধরন বদলে যায়। এটা আর শুধু রাজনীতি থাকে না। রাজনীতি সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই পার্থক্যটা বোঝার মতো কিছু ঘটনা আছে।
২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের দিকে তাকানো যাক।
মাদ্রাসার ছাত্ররা সেখানে জড়ো হয়েছিল। তাদের অনেকেই ছিল তরুণ। কেউ হয়তো কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় কর্মী, কেউ হয়তো ছিল না। কিন্তু তাদের ওপর রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের পর সমাজের প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন।
এর সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়। জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চলার পর রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে যে পরিমাণ ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, শাপলা চত্বরে মাদ্রাসার ছাত্রদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
কেন?
দুটো ঘটনা একই নয়; এটা ঠিক।
কিন্তু মানুষের মৃত্যুর পর সমাজের প্রতিক্রিয়া কেন এত আলাদা হলো, এই প্রশ্নটা তো থেকেই যায়।
সম্ভবত কারণটা শুধু রাষ্ট্রের আচরণে নেই।
সমস্যাটা রাষ্ট্রের আগেই সমাজের মধ্যে কোথাও তৈরি হয়ে ছিল।
আমরা কিছু মানুষকে খুব সহজেই ‘আমাদের’ মধ্যে রাখি। আবার কিছু মানুষকে ‘ওদের’ মধ্যে।
শহুরে শিক্ষিত সমাজের চোখে মাদ্রাসার ছাত্র হয়তো ‘ব্যাকডেটেড’।
দাড়ি-টুপি পরা মানুষ হয়তো ‘মৌলবাদী’। কোনো ধর্মীয় পরিচয় হয়তো ‘উ\গ্রতার’ ইঙ্গিত। অর্থাৎ একজন মানুষকে তার ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে না দেখে একটি পূর্বনির্ধারিত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে দেখা শুরু হয়।
এখানেই ‘অপর’ তৈরি হয়। ‘অপর’ তৈরি করার জন্য কাউকে আইন করে নাগরিকত্ব থেকে বাদ দিতে হয় না।
আরও সহজ একটা পদ্ধতি আছে। তার পরিচয়টাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যেন সে স্বাভাবিক সমাজের অংশ নয়। তখন একজন মাদ্রাসার ছাত্র আর শুধু ছাত্র থাকে না। সে ‘মাদ্রাসার ছাত্র’।একজন দাড়িওয়ালা মানুষ আর শুধু একজন মানুষ থাকে না। সে ‘ওই ধরনের মানুষ’।
তারপর তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে আমরা তার ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে ভাবার আগেই তার পরিচয়ের দিকে তাকাই।
সে কী করেছে, প্রশ্নটা পিছিয়ে যায়। সে কে, প্রশ্নটা সামনে চলে আসে। এই পরিবর্তনটাই বিপজ্জনক।
কারণ একজন রাজনৈতিক বিরোধীকে দমন করা আর একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে সন্দেহের প্রতীক বানানো এক বিষয় নয়।
প্রথমটি রাজনৈতিক নিপীড়ন। দ্বিতীয়টি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরি করে।
আর এই কাঠামো একবার তৈরি হলে রাষ্ট্রের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। রাষ্ট্রকে প্রতিবার নতুন করে কাউকে ‘বিপজ্জনক’ প্রমাণ করতে হয় না।
সমাজের ভেতরেই তার পরিচয়ের সঙ্গে বিপদের একটা ধারণা জুড়ে দেওয়া থাকে।
রাষ্ট্র শুধু সেই ধারণাটাকে ক্ষমতা দিয়ে বাস্তব করে।এখানে মিডিয়ার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘অপর’ শুধু পুলিশের হাতে তৈরি হয় না।
এটা তৈরি হতে পারে সংবাদে।
ক্লাসরুমে,আড্ডায়, বইয়ের পাতায় কিংবা সামাজিক আলোচনায়।
একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, অবদান ও অভিজ্ঞতা যদি জাতীয় স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের সম্পর্কে সমাজের ধারণাটাও একপেশে হয়ে যায়। তাদের কথা শোনা হয় না। তাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাদের কষ্ট জাতীয় আলোচনার বিষয় হয় না।
কিন্তু তাদের সংখ্যা দরকার হতে পারে। ভোটের সময় দরকার হতে পারে। রাজপথের আন্দোলনে দরকার হতে পারে। রাজনৈতিক হিসাবের সময় দরকার হতে পারে। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সংখ্যা হিসেবে তাদের মূল্যায়ন করা হয়। এটা আরও অদ্ভুত এক বৈপরীত্য তৈরি করে।
যখন তাদের ভোট দরকার, তখন তারা নাগরিক। যখন তাদের জনসমর্থন দরকার, তখন তারা জনগণ।
কিন্তু যখন তাদের নিজেদের পরিচয় নিয়ে জনপরিসরে দাঁড়ানোর পালা আসে, তখন সেই পরিচয়ই হয়ে যেতে পারে নিরাপত্তার সমস্যা।
তখন তাদের নাগরিকত্ব আর নিঃশর্ত থাকে না। এই কারণেই ইসলামকে সবসময় একটি ‘অন্য’ পরিচয় হিসেবে দেখা এবং মুসলিম পরিচয়কে বিপজ্জনকতার প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা নিছক রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিষয় নয়।
কারণ এখানে লক্ষ্য শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়। লক্ষ্য তার পরিচয়। তার বিশ্বাস।তার পোশাক। তার শিক্ষা। তার জীবনযাপন। তার সামাজিক অবস্থান।
অর্থাৎ আক্রমণটা একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার পুরো অস্তিত্বই সন্দেহের আওতায় চলে আসে।
এখানেই ‘অপর নির্মাণ’ তার পূর্ণ রূপ পায়। এখন প্রশ্ন হলো, এই বৈষম্য কি শুধু কিছু মানুষের আচরণের সমস্যা?
না।
যখন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রের মাপকাঠি আলাদা হতে শুরু করে, তখন বিষয়টি ব্যক্তিগত বিদ্বেষের পর্যায়ে থাকে না।
ধরুন, একই অপরাধে দুই ধরনের বিচারিক আচরণ হলো। একদল নাগরিকের জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া প্রযোজ্য, অন্য একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তার বাইরে অন্য কোনো প্রক্রিয়া কাজ করল। অথবা আইনে আলাদা কিছু লেখা না থাকলেও তাদেরকে শুরু থেকেই নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলো। তাহলে বৈষম্য আর কেবল কারও ব্যক্তিগত পক্ষপাত নয়।
এটা রাষ্ট্রের কাঠামোর অংশ হয়ে যায়।
একটি রাষ্ট্রের আইন তখন কাগজে এক রকম, বাস্তবে আরেক রকম।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটা সেখানেই। যদি কোনো নির্দিষ্ট পরিচয়ের মানুষকে নাগরিকের বদলে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়, যদি তাদের জন্য অলিখিত আলাদা মাপকাঠি তৈরি হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা কোনো একটি ঘটনা নয়।
সমস্যাটা কাঠামোগত।
আর রাষ্ট্রের এই আচরণ আসলে আরও গভীর একটি সামাজিক অসুখের লক্ষণ। যে অসুখের শুরু শুধু সচিবালয়ে নয়। তার শুরু হতে পারে আমাদের ক্লাসরুমে। আমাদের আড্ডায়। আমাদের বইয়ে।আমাদের মিডিয়ায়। আমাদের প্রতিদিনের কথাবার্তায়।
একজন মানুষকে ‘অপর’ বানানোর কাজটা অনেক সময় রাষ্ট্রের হাতে পৌঁছানোর আগেই সমাজ শেষ করে ফেলে।
রাষ্ট্র তখন শুধু সেই তৈরি করা পরিচয়ের ওপর তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এই কারণেই কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা দেখা হয় না।
কারণ রাজনৈতিক নিপীড়ন একদিন শেষ হতে পারে।
কিন্তু যে সমাজ একটি মানুষকে আগে থেকেই ‘অপর’ হিসেবে দেখতে শিখে গেছে, সেই সমাজে নিপীড়নের সম্ভাবনা থেকে যায়। তখন রাষ্ট্র বদলালেও কাঠামো থেকে যেতে পারে।
শাসক বদলালেও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যেতে পারে।
আইন বদলালেও মানুষের চোখে তৈরি সেই ‘অপর’ পরিচয়টি থেকে যেতে পারে।
আর তখনই বোঝা যায়,সমস্যাটা শুধু কে ক্ষমতায় আছে, সেটা নয়।
সমস্যাটা হলো, কার জীবনকে আমরা স্বাভাবিকভাবে মূল্যবান বলে মনে করি। কার মৃত্যুতে আমরা রাস্তায় নামি। কার মৃত্যুতে আমরা নীরব থাকি। কার পরিচয়কে আমরা নাগরিকত্বের স্বাভাবিক অংশ মনে করি।
আর কার পরিচয় দেখলেই মনে হয়, এখানে নিশ্চয়ই কোনো বিপদ আছে।
মুখে যতই বলা হোক, রাষ্ট্রের চোখে সবাই সমান।বাস্তবতা যদি কাউকে তার পরিচয়ের কারণে কম সুরক্ষা দেয়, কম গুরুত্ব দেয়, কম মানবিক মর্যাদা দেয়, তাহলে সেই সমতা কেবল মুখের কথা। সব মানুষ সমান; এই কথাটা তখনও সত্যি শোনায়। শুধু রাষ্ট্র, সমাজ আর আমাদের নিজেদের আচরণ নিঃশব্দে তার পরের বাক্যটা লিখে ফেলে, “কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে একটু বেশি সমান”।
