‘২৪ ঘণ্টার জন্য পৃথিবী থেকে সব পুরুষ উধাও হয়ে গেলে আপনি কী করবেন?’ গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক সাক্ষাৎকারে এক তরুণীর জবাব ছিল, ‘রাতে একা হাঁটতাম। রাত তিনটা বাজে হেঁটে দেখব কেমন লাগে?’ এই এক লাইনে ধরা পড়ে নারীর নিরাপদে, স্বাধীনভাবে চলাচলের আকাঙ্ক্ষা।
অথচ নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার বদলে দোষ চাপানো হয় নারীর ওপরই। কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার ১৫ বছরের কিশোরীও রেহাই পায়নি। তার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ তাকে নিয়েই করেছেন অশালীন মন্তব্য ও বিদ্রূপ।
এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো ফেলছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ। সংবাদ ও আলোচিত ঘটনার নিচে নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় ও আইডির লিংক প্রকাশ করছে তারা। তালিকায় প্রবাসী, চিকিৎসক, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, নানা বয়সী পুরুষ। কিছু মন্তব্য এতটাই নোংরা যে ছাপার অযোগ্য।
গত বছরের ২ নভেম্বর যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির সদস্য এখন ৩০ হাজারের বেশি। এর জন্মের পেছনে আছে হবিগঞ্জের জালাল স্টেডিয়ামের একটি কনসার্ট। বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার মধ্যে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হন। সেই খবরের নিচে এক ফেসবুক আইডি থেকে এক নারীর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের ঘটনা কদর্য ভাষায় বর্ণনা করা হয়। মন্তব্যের নিচে জমে ওঠে ‘হা হা’ প্রতিক্রিয়া।
ক্ষুব্ধ হন আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তাঁর দুই সহযোগী। তাঁদের মনে হয়, হেনস্তা নিয়ে গর্ব বা হাসাহাসিরও জবাবদিহি থাকা দরকার। গড়ে ওঠে গ্রুপটি। ওই আইডির পরিচয় প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক ছড়ালে আইডির মালিক দাবি করেন, মুঠোফোন হারানোর পর হ্যাক করে অন্য কেউ মন্তব্যটি করেছে। তিনি ক্ষমা চান এবং হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি ও আয়োজকদের কাছে পৃথক অবহিতপত্র ও অঙ্গীকারনামা দেওয়ার কথা জানান।
লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট পিয়াস বলেন, ‘কমেন্টে যা ইচ্ছা বলব, কী আর হবে এই চিন্তা থেকে বের হতে হবে। অনলাইনে করা মন্তব্যও সামাজিক আচরণের অংশ। গ্রুপের উদ্দেশ্য একটাই, নীরব না থাকা।’ মডারেটর দুজন উদ্যোক্তা উম্মে সুরাইয়া সুমি ও উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী জাকিয়া হোসেন।
গ্রুপটির দাবি, এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মন্তব্যের স্ক্রিনশট গেছে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসে।
মেয়ের কলেজজীবন শুরুর ছবি দেওয়া এক বাবার পোস্টে অশালীন মন্তব্য করেছিলেন এক ব্যক্তি। পোস্ট ছড়াতেই তিনি অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করেন। গ্রুপের দাবি, তাঁর বাড়ি ফেনীতে, কাজ করেন সাইপ্রাসের একটি রেস্তোরাঁয়। ভারতে অবস্থিত সাইপ্রাস দূতাবাস, রেস্তোরাঁ ও ওই শহরের আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষকে ই-মেইলে স্ক্রিনশট পাঠানো হয়।
ফরিদপুরের এক তরুণ বোনের সঙ্গে অরুচিকর আচরণের ভিডিও বানাতেন। গ্রুপে পোস্টের পর পুলিশ তাঁকে আটক করে বলে গ্রুপের দাবি। পরে তিনি ক্ষমা চেয়ে এমন ভিডিও না বানানোর অঙ্গীকার করেন।
স্লিপার বাসে আগুনের খবরের নিচে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা ছয়জনের একজন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী। স্ক্রিনশট যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কর্মস্থল তাঁকে সতর্ক করেছে, তিনি দুঃখিত
কুমিল্লায় নিহত কিশোরকে নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটর টুম্পা মাকসুদার পোস্টের নিচে তাঁকে ও তাঁর মাকে জড়িয়ে যৌন সহিংসতামূলক মন্তব্য করেন যশোর মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী। স্ক্রিনশট যায় কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। ওই শিক্ষার্থী বলেন, শব্দচয়ন ‘আসলেই খারাপ ছিল’, প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। তাঁকে জানানো হয়েছে, আবার ঘটলে এক বছরের বহিষ্কার।
কক্সবাজারের হোটেলের শৌচাগারে নারীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের খবরের ফটোকার্ডের নিচে মন্তব্যকারী ছয়জন, সাভারে বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগের খবরে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্যকারী পাঁচজনের পরিচয়ও প্রকাশ করেছে গ্রুপটি। ইসিবি চত্বরে ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রতিবাদ করে গালিগালাজের শিকার হন কনটেন্ট ক্রিয়েটর শারমিন রিয়া। তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদের সঙ্গে কেউ একমত না-ও হতে পারেন, কিন্তু কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।’
তবে এই ‘সামাজিক বিচারের’ গায়ে আছে ভুলের ঝুঁকি। কুমিল্লার কিশোরীর মায়ের বিচার চাওয়ার খবরের নিচে অশালীন মন্তব্য করেন এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরিচয় প্রকাশের পর বিশ্বরঙ বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই। ভুয়া অ্যাকাউন্টের আড়ালে অন্য কেউ মন্তব্য করলে নির্দোষ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় নারীর শালীনতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে শব্দ বা অঙ্গভঙ্গিতে অপমানে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর উপাদান প্রকাশে নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
ব্লাস্টের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্মের ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাস বলেন, এ ধরনের ঘটনায় নারীরা আইনি প্রতিকার কম নেন, ফলে অপরাধীরা সাহস পান। তাঁর মতে, মন্তব্যে দায়বদ্ধতা জরুরি, আইনের শাস্তি জানিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নজরদারি যাঁরা করছেন, তাঁদেরও পরিচয় প্রকাশের আগে যাচাই করতে হবে।
কমেন্ট বক্সের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকার দিন কি শেষ হচ্ছে? নাকি জবাবদিহির নামে নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সমাজ।
সূত্রঃ প্রথম আলো
