বিশাল জনগোষ্ঠীর শহর ঢাকায় যানজটের ফলে যে শুধু সময় নষ্ট হয়, তা নয়। ক্ষতি হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও। আরও বড় ক্ষতি হয় মানুষের কর্মঘণ্টা। আর এই যানজট শুরু হয় সপ্তাহের একেবারে প্রথম দিনটি থেকেই। ঢাকা শহরে যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যা জাতীয় বাজেটের ১১ ভাগের এক ভাগ। পৃথিবীর সব শহরের গতি বাড়লেও ঢাকার গতি দিনদিন কমছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে। ওই বছরের মে মাসে এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরেন এআরআইয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন। এদিকে ঢাকার শহরের যানজট কমানোর জন্য অনেক উন্নয়ন কাজ হাতে নিয়েছে সরকার, এরমধ্যে অনেক কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কিছু উন্নয়ন কাজ চলমান। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন কাজের জন্য ঢাকার শহরে যানজটের বড় কারণ। আবার অনেক উন্নয়ন কাজে সুফল পাচ্ছে না মানুষ। ঢাকা বিশ্বে দ্রুত গতিশীল মেগাসিটির একটি। জাতিসংঘের বসতিসংক্রান্ত উপাত্তের বিচারে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। এরপরই ভারতের মুম্বাইয়ের অবস্থান। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব পৌরায়ন সম্ভাবনা : ২০১৮ সালের সংশোধন নামক প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী ১ কোটির বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত অতিমহানগরীসমূহের মধ্যে ঢাকা শহরের অবস্থান ৯ম।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) ঢাকার যানবাহন, সড়ক দুর্ঘটনা, যানজটের নানা দিক নিয়ে একই গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ২০১৫ সালের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ যাত্রা (ট্রিপ) হয়। একজন মানুষ কোনো একটি বাহনে উঠে নির্ধারিত গন্তব্যে নামলে একটি যাত্রা বা ট্রিপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে যানজটে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ঢাকা শহরে গণপরিবহনগুলা প্রতিদিন ৩৬ লাখ ট্রিপে ৩৫ শতাংশ যাত্রীকে কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যায়। যানজটের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে নানা ধরণের গবেষণা হয়েছে। ২০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ক্ষতির হিসাব দেয়া হচ্ছে। তার সেইসব হিসেবের গড় করে এআরআই যানজটের কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বলে হিসেব করেছে। সড়ক খাতে বিনিয়োগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও যানজট নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই ক্ষতির অন্তত ৬০ শতাংশ বা ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
এদিকে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুই বছরের বেশি সময় আগে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটি গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি এই কমিটি। কবে নাগাদ শৃঙ্খলা ফিরবে তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টদের কেউ। ফলে নগরের প্রতিটি রাস্তায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রাণ যাচ্ছে পথচারীর। আবার অঙ্গহানি হয়ে জীবনের তরে চলার ক্ষমতা হারাচ্ছেন অনেকে। এছাড়া যানবাহনের গতি কমে যাওয়ার বড় কারণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের জন্য বাতিগুলো কাজ না করা। বাতিগুলো বসানো হলেও মুখে বাঁশি, হাতে লাঠি এবং রাস্তায় দড়ি টেনে কাজটি করতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। দুই বছর আগে এই মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালগুলো স্থাপন করতে দেখেছি। কিন্তু এগুলো কে চালাবে, কীভাবে চলবে বা নিয়ন্ত্রিত হবে সে বিষয়ে আমাদের কেউ কোনো নির্দেশনা দেয়নি।
যানজটের কারণে ঢাকার সড়কের গতি শ্লথ হয়ে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে বলে বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৭ প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে এই তথ্য বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ বছরে ঢাকায় যান চলাচলের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে ৭ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে এসেছে। যানজটের কারণে বাংলাদেশের রাজধানীতে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে বলে বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব। পরিবেশ আন্দোলন বাংলাদেশের ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখানো হয়, যানজটের কারণে দিনে ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২০১৩ সালে তার এক গবেষণায় দেখানো হয়, শুধু যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্টের জন্য বছরে ক্ষতি হয় ১২ হাজার কোটি টাকা।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় বিশ্বব্যাংক আয়োজিত মেট্রো ঢাকা ট্রান্সফরমেশন প্লাটফর্ম : ট্রান্সফরমিং মেট্রো ঢাকা ইনটু এ লিভঅ্যাবল প্রসপারুয়াস অ্যান্ড রিজিলিয়েন্ট মেগাসিটি’ শীর্ষক সেমিনারে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যমতে, ঢাকায় যানজটের কারণে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। যেখানে হাঁটার গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। রাজধানীতে হাঁটার চেয়ে সামান্য বেশি গাড়ির গতি। যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ (৩ দশমিক ২ মিলিয়ন) কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন বা সাড়ে ২৫ হাজার কোটি থেকে সাড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকা।
টোয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা নামে এক অনুষ্ঠানে ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে সৃষ্ট সমস্যা ও বিশৃঙ্খলার বিষয়টি উঠে আসে। ২০১৭ সালে বিশ্ব ব্যাংক আয়োজিত টোয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা নামে এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সড়ক বেড়েছিল ৫ শতাংশ; বিপরীতে সড়কে যান চলাচল বেড়েছিল ১৩৪ শতাংশ। মানুষ বেড়েছিল ৫০ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ঢাকার নগরায়ন কেন্দ্র থেকে উত্তর দিকে এবং এখন পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে। নগরীর পূর্ব দিকের এলাকাগুলো এখনও গ্রামীণ। মহানগরীর এলাকার প্রায় ৪০ শতাংশের সমান পূর্ব ঢাকা, গুলশানের মতো সমৃদ্ধ এলাকার ৫ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে পূর্ব ঢাকার দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন যানজট ও পরিবেশের আরও অবনতি ঘটাবে। বাংলাদেশের শহুরে জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশের ঢাকায় বসবাসের তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালে বিশ্ব ব্যাংকের ঐ সময়ের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান সে অনুষ্ঠানে বলেন, বর্তমান হারে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে সাড়ে তিন কোটি। মহানগরীর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ঢাকার জন্য অবশ্যই সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন গণমাধ্যমকে আরও বলেন, নগরের যানজট যদি ৬০ শতাংশ কমানো যায় তবে ২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো কারণই নেই। করোনার কারণে হয়তো কিছুদিন হালকা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এ অবস্থার উন্নতি হয়নি। সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেন তিনি। অনেক দেশে দেখেছি যে, অনেক ছোট রাস্তায়ও ট্রাফিক আইন মানিয়ে জ্যাম কমাতে তারা সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রশস্ত রাস্তা আছে, তবে আমরা নিয়ম মানছি না। তিনি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ঢাকায় যানজটের কারণে পিক আওয়ারে গণপরিবহনগুলোর গতিবেগ ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতিও ৫ কিলোমিটার। তার মানে হল পিক আওয়ারে গাড়ির গতি এবং হাঁটার গতি একই।
২০১৭ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালে ঢাকায় মাত্র ৫ শতাংশ সড়কের পরিমাণ বাড়লেও জনসংখ্যা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। আর যানবাহন বেড়েছে ১৩৪ শতাংশ। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ১৯৮০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৩ মিলিয়ন এবং ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৮ মিলিয়নের বেশি। ১৯৮০ সালে গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার এবং এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটারেরও কম। এতে যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ২০৩৫ সালে ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২৫ মিলিয়নে। ফলে যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে যানজট। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের সেমিনারে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ঢাকায় গাড়ির গতি প্রতি ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। হাঁটার গতি হচ্ছে প্রতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতি বছর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে আনুমানিক ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরিন আহমেদ মাহবুব গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা প্রতি বছর এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করি না। কয়েক বছর আগে এটা নিয়ে আমরা কাজ করেছিলাম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে সামনে যানজট ও আর্থিক ক্ষতি দুটোই বাড়বে।
এ বিষয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে যানজট নিরসনে ট্রাফিকের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, দেখছি। তারপরও যে খুব বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে, সেটা চোখে পড়ছে না। আবার এটাও ঠিক, বেশ কিছু কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। হয়তো যেগুলোর সুফল আমরা আরও পরে পাবো। সে কারণেও তো ট্রাফিক জ্যাম হচ্ছে। এই মুহূর্তে হিসাব করলে আমরা ট্রাফিক জ্যামের কারণে ক্ষতির প্রকৃত চিত্রটা বুঝবো না। কারণ এটার ফল পেতে আরেকটু সময় লাগবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, শিগগির সিগন্যাল বাতিগুলো ব্যবহার না করা হলে নষ্ট হয়ে যাবে। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, এসব বাতি জ্বালাতে পুলিশের প্রকৌশল বিভাগের প্রয়োজন পড়ে না। রিমোটের মাধ্যমেই চালানো সম্ভব। সিগন্যাল বাতিগুলো এখনই কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় যত বড় বড় প্রকল্পই হাতে নেয়া হোক না কেন, সুফল মিলবে না।
সিগন্যাল বাতি জ্বলে না, হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ: উল্লিখিত পয়েন্টটি ছাড়াও গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বর, মহাখালী রেল ক্রসিং (জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সামনে), বিজয় সরণি, মিরপুর রোড, পল্টন মোড়, কাকরাইলসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। অথচ গত ২০ বছরে ঢাকা শহরে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৭০ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মুখ দেখেনি। তাই এখনো ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ভরসা পুলিশের সেই হাতের ইশারা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল দফতর সূত্র জানায়, ২০০০ সালে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে (প্রায় ২৫ কোটি টাকা) ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ ৭০টি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত বাতি বসানোর কাজ শুরু হয়। ২০০৯ সালের নভেম্বরে নগরের অর্ধশতাধিক মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় বাতি ব্যবহার শুরু করে পুলিশ। কিন্তু তিন-চারদিনের মাথায় সেই পুরোনো পদ্ধতি অর্থাৎ হাত ও বাঁশিতে ফিরে যায় পুলিশ।
কেইস প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, তারা ট্রাফিক সংকেত বাতিগুলো সচল অবস্থায় ডিএমপিকে হস্তান্তর করেছেন। তবে মেট্রোরেল প্রকল্পের কারণে আগেই কিছু বাতি উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে সব সড়কে একসঙ্গে বাতিগুলো ব্যবহার করতে পারবে পুলিশ। বিক্ষিপ্তভাবে সিগন্যাল বাতি জ্বালিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতোমধ্যে তারা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে ২১৯টি রুটের পরিবর্তে ৪২টি রুটে ২২ কোম্পানির মাধ্যমে গণপরিবহন পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে। নগরীতে চলাচল করা দুই হাজার ৫০০ কোম্পানির প্রায় ৩০ হাজার বাসের পরিবর্তে নয় হাজার ২৭টি গণপরিবহন পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে। যে গতিতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটি কাজ করছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই-তিন বছরেও ঢাকা শহরে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না
এছাড়া বিরুলিয়ার বাটুলিয়া, সাভারের হেমায়েতপুর, কেরানীগঞ্জের বাঘাইর ও কাঁচপুরে পৃথক চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই চারটি জায়গায় আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল স্থাপন করলে ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমবে। সায়েদাবাদ, গাবতলী এবং মহাখালী বাস টার্মিনালগুলো তখন সিটি টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির এ সুপারিশ কতদিনে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে, তা কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। দীর্ঘ দুই বছর সমীক্ষা করে পরামর্শকরা গত বছরের ১০ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেন। এই প্রতিবেদনে ২২টি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনা, ৪২টি রুটে ছয় রঙের বাস, আন্তঃজেলা বাসগুলো রাজধানীতে প্রবেশ বন্ধ, বিদ্যমান বাস ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে টিকিট ব্যবস্থাপনা, রাজধানীর বাইরে ১০টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণ, কোন রঙের (নীল, মেরুন, কমলা, সবুজ, বেগুনি) বাস কোন রুটে চলবে তার নির্দেশনা দেয়া হয়।
বর্তমানে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। এক সভা শেষে শেখ তাপস সাংবাদিকদের বলেন, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল করার জন্য চিহ্নিত ১০টি জায়গার কয়েকটি আমরা পরিদর্শন করেছি। সরেজমিন পরিদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিরুলিয়ার বাটুলিয়ায় একটি জায়গা নির্ধারণ করেছি। সেখানে আন্তঃজেলা একটি টার্মিনাল হবে। মূলত উত্তরাঞ্চলের যে বাসগুলো আছে, সেখানে এসব বাস থাকবে। তিনি আরও বলেন, সাভারের হেমায়েতপুরে একটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল করা হবে। দক্ষিণাঞ্চলের জন্য কেরানীগঞ্জের বাঘাইরে একটি জায়গা নির্ধারণ করেছি এবং আরেকটি জায়গা কাঁচপুরে। এই চারটি জায়গায় আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল স্থাপন করলে ঢাকা শহরের ওপর থেকে চাপ কমবে। তখন সায়েদাবাদ, গাবতলী এবং মহাখালী টার্মিনালকে আমরা সিটি টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারব। প্রাথমিকভাবে এ সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগির সিদ্ধান্তের বিষয়টি সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব। বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির আরেক সদস্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বাস রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে নগরে যানজট কমবে। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে কাজের গতি আরও বাড়াতে ওই কমিটির পরবর্তী সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হবে।
