সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের মধ্যাঞ্চলে ভারি বৃষ্টিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের জেলার রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৃষ্টিগতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও যাতায়াতসহ দৈনন্দিন কাজকর্মে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গতকাল কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রেললাইন তলিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হয়। ঢাকার সাভারসহ বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
নেত্রকোনা, জামালপুর, নাটোর, বগুড়াসহ কয়েকটি জেলার নিচু এলাকার ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। মাটির দেয়াল ধসে গাজীপুর ও যশোরে দুই শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী ও ময়মনসিংহে কয়েক শ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।
ময়মনসিংহে বাড়িঘরেও পানি
ময়মনসিংহে পাঁচ দশকের মধ্যে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বৃষ্টিতে নগরীর নিচু এলাকায় পানি জমতে থাকে। ধীরে ধীরে পুরো শহরই ডুবে যায়। প্রধান সড়ক গাঙিনার পাড়, স্টেশন রোড, নতুন বাজার, আকুয়া, সিকে ঘোষ রোড, চরপাড়া, নওমহল, ভাটিকাশর, কাচিঝুলি, আকুয়াসহ সব এলাকায় পানি ওঠে। এক পর্যায়ে সড়ক উপচে পানি বাড়িঘর ও দোকানপাটে উঠে যায়। সড়কে যান চলাচল কমে যায়।
জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে বাইরে বের হয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সড়কে হাঁটু সমান পানি ভেঙে মানুষকে যাতায়াত করতে হয়।
বৃষ্টিতে সড়কের পাশের ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সিকে ঘোষ রোড এলাকার ব্যবসায়ী আবুল হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর কাগজের দোকান। পানি ঢুকে দোকানের মেঝেতে থাকা প্রায় সব কাগজ নষ্ট হয়ে গেছে।
ব্রাহ্মপল্লী এলাকার বাসিন্দা নূপুর জানান, ৫০ বছরের জীবনে এত পানি দেখেননি। তিনি বলেন, ‘লোকজন সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। পানির সঙ্গে ঘরে ময়লা ঢুকে গেছে। আজ (গতকাল) সকাল থেকেই লোকজন পানি নিষ্কাশনে নেমেছে। রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না।’
বাঘমারা এলাকার সালিম হোসেন বলেন, ‘ঘরে চৌকি ডুবে গেছে। ঘরের সব জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে।’
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটু বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকে তাঁরা কাজ করছেন। আশা করছেন, দ্রুত জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে।
জেলার ভালুকায় দুই দিনের প্রবল বর্ষণে কয়েক হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ও বিভিন্ন সবজি জাতীয় ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পার ভেঙে ও পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট-বড় শতাধিক মাছের খামার। পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিচু এলাকার শত শত বাসাবাড়িতে পানি ঢুকেছে। পৌরসভার বিভিন্ন রাস্তাঘাট তলিয়ে আছে। এলাকার রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
গাজীপুরে জলজট, দেয়াল ধসে তিন মৃত্যু
গাজীপুরে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় সড়ক-মহাসড়ক। কয়েকটি ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। গতকাল বেশি ভোগান্তি পোহান গার্মেন্ট ও শিল্প-কারখানাগামী শ্রমিকরা।
নগরীর কোনাবাড়ীর পশ্চিম বাইমাইল এলাকায় দেয়াল ধসে ফরিদুল ইসলাম (৬) নামের এক শিশু মারা যায়। সে স্থানীয় মতিবুর রহমানের ছেলে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঘরের দেয়াল ধসে সে আহত হয়। গতকাল সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া জেলার কালিয়াকৈরের রতনপুর নলিপাড়া এলাকায় গত বৃহস্পতিবার রাতে মাটির ঘরের দেয়াল ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেন স্থানীয় বাসিন্দা এমারত হোসেন (৬৫) ও আছিমা বেগম (৬০)। এমারত সফিপুর বাজার এলাকায় চালের ব্যবসা করতেন।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে নগরীর প্রধান রাজবাড়ী সড়কের পৌর মার্কেট, শিববাড়ী, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস, হোসেন মার্কেট, টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায় দেড় থেকে তিন ফুট পানি জমে। যান চলাচল অচল হয়ে পড়ে। নগরীর শিববাড়ীর ব্যাংকপাড়া, চান্দনা চৌরাস্তার চান্দনা, বারবৈকা, দিঘিরচালা, নগপাড়া, জৈনউদ্দিন সড়ক, ভোগড়া, বাসন, আমবাগ, খাইলকৈর, সাইনবোর্ড, কুনিয়া, এরশাদনগর, মুক্তারবাড়ী সড়ক, শফিউদ্দিন সড়ক, আউচপাড়া এলাকায় জলাবদ্ধতার পরিমাণ বেশি। জয়দেবপুর-ধীরাশ্রম বনমালা সড়কের বেশির ভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় সড়ক ভেঙে গেছে।
শহীদ স্মৃতি সড়কের বাসিন্দা গার্মেন্ট শ্রমিক আলেয়া খাতুন বলেন, ঘরে পানি। বিছনাপত্র তলিয়ে গেছে। দুপুরে রান্না করতে পারেননি। ঘরের জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থা এলাকার ঘরে ঘরে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আকবর হোসেন জানান, নগরীতে গত কয়েক বছরে বহু ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়।
কেশবপুরে দেয়াল ধসে শিশুর মৃত্যু
যশোরের কেশবপুরে মাটির দেয়াল ধসে ইয়াসমিন খাতুন (৭) নামের এক শিশু বৃহস্পতিবার আহত হয়। শিশুটিকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল ভোরে সে মারা যায়। সে উপজেলার তেঘরি গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর মোড়লের মেয়ে এবং স্থানীয় কওমি মাদরাসার শিশু শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
নেত্রকোনায় ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা
নেত্রকোনায় বৃষ্টিতে নদ-নদী উপচে ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। নিচু এলাকার রোপা আমন ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। কৃষকরা বলছেন, পানি দ্রুত না সরলে কচি ধানগাছ পানির নিচে থেকে পচে যাবে। আর ধানগাছ নষ্ট হলে এখন শেষ মৌসুমে এসব জমিতে আর ধান লাগানো সম্ভব হবে না। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। পানি দ্রুত নেমে গেলে তলিয়ে যাওয়া রোপা আমনের তেমন ক্ষতি হবে না।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর পর্যন্ত নিচু এলাকার প্রায় ১১ হাজার ৪৮২ হেক্টর জমির রোপা আমন ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে কেন্দুয়ায় তিন হাজার ৫০০ হেক্টর জমি, সদর উপজেলায় দুই হাজার ৪৭০ হেক্টর, পূর্বধলায় দুই হাজার ৩৬০ হেক্টর, দুর্গাপুরে ৪৫ হেক্টর, কলমাকান্দায় ১৮০ হেক্টর, মোহনগঞ্জে এক হাজার ২০০ হেক্টর, বারহাট্টায় ২১৫ হেক্টর, আটপাড়ায় এক হাজার হেক্টর, মদনে ৫০০ হেক্টর ও খালিয়াজুরী উপজেলায় ১২ হেক্টর জমির রোপা আমন ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জে তলিয়ে গেল রেললাইন
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের মূল সড়কসহ অলিগলি সব জায়গায় পানি জমে গেছে। বহু বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি উঠেছে। তলিয়ে গেছে কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রেলপথের প্রায় দুই কিলোমিটার। এতে গতকাল সকাল থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল ৩টা নাগাদ পানি নামলে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বিশেষ করে শহরতলির বাসাবাড়িতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। মূল রাস্তা ও অলিগলিতে পানি জমেছে তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত।
অন্যান্য স্থানে জলাবদ্ধতা
বুধবার থেকে টানা ভারি বৃষ্টিপাতে নাটোর পৌরসভায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পৌরসভার অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকায় পান্দিবন্দি হয়ে পড়েছে পৌরবাসী। জেলার বেশির ভাগ মাঠের ফসল এখন পানির নিচে। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা ও পৌরসভায় তিন শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়ির সামনে হাঁটুপানি। কিছু কিছু বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে।
রাজশাহী নগরীর অনেক এলাকায় গতকালও জলাবদ্ধতা ছিল। অনেক বাড়ির ভেতরেও পানি ছিল। গতকাল বিকেলে নগরীর তেরোখাদিয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা আসলাম উদ্দিন বলেন, বাড়ির মধ্যে এখনো পানি। ড্রেন উপচে পানি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। খুব কষ্টে গেছে দুই দিন।
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘জেলার সব উপজেলায় কথা বলে জেনেছি, প্রায় ৫০০ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনো বলা যাচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেলে তা বলা যাবে।’
জামালপুর পৌর এলাকার ফুলবাড়িয়া ফিশারিপাড়া, বাগেরহাটা, কাছারীপাড়া, খুপিবাড়ী, বেলটিয়া, চালাপাড়াসহ বেশ কিছু এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গতকাল বেশির ভাগ এলাকা থেকে পানি সরে গেছে। তবে শহরের ফুলবাড়িয়া ফিশারিপাড়া এলাকায় অন্তত তিন শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
ঢাকার সড়কে পানি
বৃষ্টিতে গতকাল রাজধানী ঢাকার কিছু জায়গায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিজয়নগর, শান্তিনগর, মালিবাগ ছাড়াও পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোড, সিদ্দিকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
রাজধানীর অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়ক তলিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া টানা বর্ষণে সড়কটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইপাইল-জামগড়ায় কোথাও কোমর, কোথাও হাঁটুসমান পানি উঠে পড়ে। যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে মানুষ। মোরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনে পানি ঢুকে বিকল হয়ে সড়কে আটকে থাকে। কাজের প্রয়োজনে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি মাড়িয়ে অনেকে চেষ্টা করেন গন্তব্যে পৌঁছানোর। বাইপাইলের কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী মো. সোহেল হোসেন বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরেই একটু বৃষ্টি হলেই বাইপাইল সড়ক ডুবে যায়। আজ (গতকাল) তো ভারি বৃষ্টি হয়েছে। সব ডুবে গেছে। আমাদের ব্যবসা সব শেষ।’ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের শিমুলতলায় সাভার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
