ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জাল আধার কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্র খুঁজে বের করার নামে ‘ঘুরপথে’ পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি (জাতীয় নাগরিকপঞ্জী) চালু করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠানো একটি চিঠি প্রকাশ করে সোমবার তিনি কলকাতায় বলেছেন, আধার কার্ড যাচাই-বাছাই করার জন্য এমনভাবে কিছু এলাকাকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে যাতে একটি ‘বিশেষ কমিউনিটি’-কে টার্গেট করা যায়।
ওই এলাকাগুলোর নাম ধরে ধরে উল্লেখ করে তিনি এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বিশেষ কমিউনিটি বলতে তিনি রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিমদের কথাই বলছেন। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এই অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়া হয়নি।
তবে দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এমন নয় যে বেআইনি আধার কার্ডের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু পশ্চিমবঙ্গকেই চালাতে বলা হয়েছে। বস্তুত একই ধরনের চিঠি দেশের অন্তত আটটি রাজ্যকে পাঠানো হয়েছে বলে ওই সূত্রটি জানিয়েছেন।
আগামীতে আরো রাজ্য সরকারের কাছেও এই মর্মে চিঠি পাঠানো হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, রাজ্যের বাংলাদেশ-সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ‘ডেমোগ্রাফি’ বা জনসংখ্যার চরিত্র এমনভাবে বদলে যাচ্ছে যে সেসব এলাকায় ‘এনআরসি অভিযান’ চালানো দরকার বলেই তাদের দল বিশ্বাস করে।
এনআরসি বিতর্ক
বেশ কয়েক বছর আগে উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামে যখন জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি তৈরির কাজ শুরু হয়। তখন থেকেই এই অভিযান নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
দেশের বহু বিরোধী দল বারেবারে অভিযোগ করেছে, এই পুরো অভিযানটাই মূলত মুসলিমদের ভারতের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার একটা চেষ্টা।
এরপর ২০১৯ -এর ডিসেম্বর যখন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-খ্রীষ্টানদের ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান দিয়ে নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) পাস করে, তারপর সেই বিতর্ক আরো চরমে ওঠে।
দেশব্যাপী তুমুল প্রতিবাদের মুখে এনআরসি-সিএএর বাস্তবায়ন অবশ্য আজ পর্যন্ত শুরুই করে ওঠা যায়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এখন বলছেন, বেআইনি আধার কার্ড শনাক্ত করার নামে কেন্দ্র এখন আবার তাদের রাজ্যে ঘুরপথে এনআরসি শুরু করতে চাইছে, যা তিনি কিছুতেই হতে দেবেন না।
তিনি বলেন, ‘এনআরসি তাস নিয়ে আবার ওরা আগুনের সাথে খেলছে । ২০১৪ সাল থেকে এটা করছে। যেহেতু দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়, তাই বন্ধ রেখেছিল। আমাদের কাছে চিঠি এসেছে। অঞ্চলে গিয়ে গিয়ে আমরা যেন আমাদের লোক পাঠিয়ে, ওদের যারা আছে লোক পাঠিয়ে, জয়েন্টলি এনকোয়ারি করে দেখি।’
মমতা ব্যানার্জি মন্তব্য করেন, ‘যদি একটা বাচ্চারও না থাকে সব বিদেশি। বুঝতেই পারছেন, সেই অসমের ডিটেনশন ক্যাম্প!।’
মুসলিম এলাকাতেই অভিযান?
কেন্দ্রীয় সরকারের পাঠানো চিঠি থেকে এলাকার নাম ধরে ধরে উল্লেখ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আরো দাবি করেছেন, রাজ্যের মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই বিশেষ করে এই অভিযান চালাতে বলা হয়েছে।
চিঠিটি থেকে সেই জায়গাগুলোর নাম পড়ে শুনিয়ে তিনি বলেন,‘বারাসত সাবডিভিশনের গোবরডাঙা, হাবড়া, অশোকনগর, দত্তপুকুর, মধ্যমগ্রাম রয়েছে। বসিরহাট সাবডিভিশনের স্বরূপনগর, বাদুড়িয়া, হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, ন্যাজাট, হেমনগর, কোস্টাল সন্দেশখালি, মাটিয়া। বনগাঁ সাবডিভিশনের বাগদা, পেট্রাপোল, গাইঘাটা, গোপালনগর। ব্যারাকপুর সাবডিভিশনের নৈহাটি, শিবদাসপুর, জগদ্দল, বাসুদেবপুর, মোহনপুর, রহড়া, খড়দহ, ঘোলা, নিমতা, নিউ ব্যারাকপুর, দমদম। কলকাতা, সল্টলেক, বাগুইআটি, লেকটাউন, রাজারহাট, নিউটাউন, বসিরহাট পানিটার, আকাহাপুর, হরিদাসপুর, জয়ন্তীপুর, বিড়া, সুটিয়া, ছায়াঘড়িয়া, বাগদা, বাসবঘাটা, গাঙ্গুলিয়া এরকম প্রচুর নাম আছে।’
একইসাথে তিনি বলেন, ‘আমি দেখছি, ওরা গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে সিলেক্ট করেছে। উত্তর ২৪ পরগনাকে সিলেক্ট করেছে। জেনেশুনে। একটা কমিউনিটিকে সরাতে।’
‘কমিউনাল টেনশন’ বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে বিজেপি এসব করাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মমতা ব্যানার্জি।
তবে বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে মমতা ব্যানার্জির যাবতীয় অভিযোগ নস্যাৎ করে বলা হয়েছে, বেআইনি আধার কার্ড শনাক্ত করা দরকার দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই। এর মধ্যে আদৌ কোনো সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা নেই!
সূত্র : বিবিসি
