রমজান মাসেও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর পাঠদান ও ওয়াজ চলত। বসরায় অবস্থানকালে কয়েক বছর তিনি সেখানে রমজান কাটান ও ইফতার করেন। তখন প্রতিদিন এশার নামাজের পর সাধারণ মানুষের উদ্দেশে তিনি সংক্ষিপ্ত কথা বলতেন। ইবনে আসাকির তাঁর তারিখে দিমাশক গ্রন্থে লেখেন, এক রাতে ইবনে আব্বাস (রা.) মানুষের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্বিন। অঙ্গীকার পালন তোমাদের সম্পর্ক সুদৃঢ় করবে। জ্ঞান তোমাদের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য বাড়াবে এবং সহনশীলতা তোমাদের নিরাপদ রাখবে। ভালো কাজ তোমাদের প্রাচুর্য এনে দেবে। আল্লাহ তোমাদের জীবিকার দায়িত্ব নিয়েছেন। তোমরা সাধ্যমতো আল্লাহকে ভয় কোরো।
রমজান উপলক্ষে মুসলিম শাসক ও আমিরদের মধ্যে ইবাদতের পাশাপাশি ওয়াজ ও নসিহত শোনার চর্চা ছিল। অনেকে সাহরি পর্যন্ত ঐতিহাসিক নানা ঘটনার বর্ণনাও শুনতেন। ভারতবর্ষে ঘুরী সুলতানদের মধ্যে রমজান মাসে এই রীতি দেখা গেছে। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক শাহ (মৃত্যু ৭৫২ হি.) রমজান মাসে রাতভর আলেমদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতেন। আল-উমারি তাঁর মাসালিকুল আবসার গ্রন্থে লেখেন, রমজান মাসে তাঁর কাছে আলেমরা উপস্থিত হতেন এবং সেখানেই ইফতার করতেন। প্রতি রাতে সুলতান উপস্থিত আলেমদের একটি বিষয়ে আলোচনা করতে বলতেন। তখন আলেমরা পারস্পরিক গবেষণামূলক আলোচনা শুরু করতেন। সুলতান নিজেও আলেমদের আলোচনায় অংশ নিতেন এবং নিজ মত প্রকাশ করতেন। কখনো তা গ্রহণ করা হতো আবার কখনো তা অগ্রাহ্য হতো।
আবুল আরব আত-তামিমি তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে লিখেছেন, তিউনিশিয়ার বনু আগলাবের গভর্নররা রমজান মাসে ইতিহাস বর্ণনাকারী ইসহাক বিন আবদুল মালিক আল-মালশুনিকে খবর পাঠাতেন। তিনি ভোর পর্যন্ত তাদের নানা ধরনের বিস্ময়কর ঘটনা শোনাতেন।
আল-খুতাত গ্রন্থে আল-মাকরিজি বলেছেন, রমজান মাসের রাতে ফাতেমি খলিফা নিজ প্রাসাদের বারান্দায় গিয়ে বসতেন। সেখানে কারিরা সুন্দর কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত করত। এরপর সাহরির সময় মুয়াজ্জিনরা এসে তাকবির ধ্বনি দিত। তখন ওয়ায়েজরা রমজান ও সাহরির ফজিলত নিয়ে আলোচনা করতেন। অতঃপর দোয়ার মাধ্যমে মজলিস শেষ হতো।
রমজান মাসে মিসর ও শামের মামলুক সুলতানরা হাদিসের মজলিস তৈরি করতেন। সুলতান আল-আশরাফ শাবানের (মৃত্যু ৭৭৫ হি.) মাধ্যমে এই ধারার প্রচলন শুরু হয় বলে মনে করা হয়। আল-মাকরিজি তাঁর আল-সুলুক গ্রন্থে বলেন, সুলতান আল-আশরাফ তার প্রাসাদের কাছে রমজানের প্রতিদিন সহিহ বুখারি পাঠের রীতি চালু করেন। হাদিস পড়ার বরকত অর্জন করতে বিচারক, আলেম ও ফকিহরা সেখানে উপস্থিত থাকতেন।
খোরাসানের সামানি বাদশাহরাও রমজান মাসের রাতে আলোচনায় অংশ নিতেন। জেরুজালেমের পরিব্রাজক আল-মাকদিসি বলেন, রমজানে সুলতানের উপস্থিতিতে বিতর্ক অনুষ্ঠান করা হতো। তিনি কোনো এক বিষয়ে প্রশ্ন করতেন এবং অন্যরা তা নিয়ে আলোচনা শুরু করতেন। আল-সাআলাবি তাঁর ইয়াতিমাতুদ দাহর গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রমজানের এক রাতে আমি মন্ত্রী ইবনুল আমিদের মজলিসে উপস্থিত হই। সেখানে ফকিহ ও আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। সবাই নানা বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান করতেন।
রমজান মাসে অনেক নারী মুহাদ্দিসের আলোচনাসভা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস আলামুদ্দিন আল-বিরজালি (মৃত্যু ৭৩৯ হি.) শাইখা আসমান বিনতে মুহাম্মদ দামেশকিয়্যার কাছে হাদিস শুনতেন। আয়ানুল আসর গ্রন্থে বলা হয়, আল-বিরজালি ৬৮৩ হিজরির রমজান মাসে শাইখার কাছে হাদিস পড়েন। সেই নারী সব সময় ইবাদতে মগ্ন থাকতেন এবং অধিক পরিমাণে দান ও সদকা করতেন।
