আমেরিকা এ পর্যন্ত পাকিস্তানে প্রায় ৫০০ এয়ারস্ট্রাইক করেছে এবং এতে প্রায় চার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।
ইয়েমেন প্রায় ৪০০ এয়ারস্ট্রাইক করেছে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার মানুষকে খু/ন করেছে।
সোমালিয়াতে প্রায় তিনশ এয়ার এন্ড গ্রাউন্ড স্ট্রাইক করেছে এবং প্রায় দুই হাজার মানুষ খু/ন করেছে।
লিবিয়াতে প্রায় ৫০০ স্ট্রাইক করেছে এবং প্রায় তিন শ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে।
এগুলো উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্য তথ্য, তবে বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে আরও অনেক বেশি হতে পারে। এদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাস্তবতা আরও অনেক ভয়াবহ।
রিসেন্ট ভেনিজুয়েলার ঘটনার আগে আমি বলতে চাই পানামার ঘটনা। পানামা ক্যানেল ছিল বিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী কেন্দ্র। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই ক্যানেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বাণিজ্য, নৌ-সামরিক চলাচল এবং বৈশ্বিক প্রভাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ। আগে থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে এই ক্যানেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অধীনেই নিয়ন্ত্রিত হত।
কিন্তু পানামা রাষ্ট্র যখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অধিকার জোরালোভাবে দাবি করতে শুরু করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সে সময়ে পানামার শাসক ছিলেন মানুয়েল নরিয়েগা। তিনি শুরুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করলেও ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থানে যান, যা ক্যানেল ঘিরে মার্কিন স্বার্থের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নরিয়েগা তখন আর কেবল একটি দেশের শাসক নন; তিনি হয়ে ওঠেন একটি “সমস্যা”। এই সমস্যার সমাধানও রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে হয়নি, হয়েছিলো সামরিক শক্তির মাধ্যমে।
১৯৮৯ সালে পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগের ভাষা ছিল ঠিক অনেকটা আজকের ভেনিজুয়েলার মাদুরোর মতোই: মাদক পাচার, অপরাধ স্বৈরতন্ত্র ব্লা ব্লা ব্লা।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকে তার শাসককে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আইনের শাসন, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী বিশ্ব মোড়লদের কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের রায় দরকার হয়নি, জাতিসংঘের অনুমোদন প্রয়োজন হয়নি। কথিত আন্তর্জাতিক আইন তখনও নীরবই ছিল।
নরিয়েগার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ক্যানেলের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আবার ঝুকিমুক্ত হয়।
এই ঘটনাটি কথিত আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতার ব্যাপারে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। এই ঘটনা সবাইকে তখনই দেখিয়ে দিয়েছিল যে এসব আইন কেবলই দুর্বলকে নিয়ন্ত্রণের একটা কৌশল, প্রয়োজনে শক্তিশালীরা যেকোনো সময় এগুলো উপেক্ষা করতে পারে এবং এরজন্য তাদেরকে কোনো জবাবদিহি করতে হয় না।
এই একই ভাষা, এই একই কাঠামো, কয়েক দশক পর আবার দেখা গেলো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে। এখানে রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরো বৈশ্বিক ক্ষমতাকেন্দ্রের সাথে রাজনৈতিক দন্দ্বে জড়িয়েছেন। তেলসম্পদ, আঞ্চলিক প্রভাব, স্বাধীন নীতি, সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা ধীরে ধীরে ক্ষমতাকেন্দ্রের অনুগত তালিকা থেকে সরে যায়।
এরপর শুরু হয় সেই পরিচিত প্রক্রিয়া। নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং মিডিয়ার মাধ্যমে তার চরিত্র নির্মাণ। মাদুরোকে “মাদকসম্রাট” “স্বৈরশাসক”, “অপরাধী”, “জনগণের শত্রু” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এই বয়ান তৈরি করে সেইসব মিডিয়া যাদেরকে আপনারা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য মনে করে থাকেন। মাদুরোকে ভিলেন সাব্যস্ত করার পর শক্তির ব্যবহার আর অস্বাভাবিক থাকে না। সামরিক হস্তক্ষেপ ও রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি তখন “ন্যায্য ব্যবস্থা” হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
নোরিয়েগা ও মাদুরোর মধ্যে পার্থক্য কেবল সময়ের। উভয় ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক আইন ন্যায়ের কোনো সীমা টানেনি। শক্তি আগে কাজ করেছে, আইন পরে এসে সেই কাজকে ব্যাখ্যা দিয়েছে, প্রয়োজনে নীরব থেকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে।
নোরিয়েগা থেকে মাদুরো—এই পথ দেখায় যে তথাকথিত আন্তর্জাতিক আইন আসলে একটি বোগাস নৈতিক আবরণ। এটি ন্যায়বিচার রক্ষা করে না; এটি কেবল শক্তিশালীদের নৃশংসতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে বৈধতা দেয়।
তাই যারা আন্তর্জাতিক আইন, সো কল্ড গনতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী অধিকার ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি যারা ব্যাপক শ্রদ্ধা রেখে কথা বলেন, আবার একইসাথে ইসলাম আর ইনসাফের কথা বলেন তারা যেন একটু একান্তে বসেন এবং চিন্তা করেন।
