২০২৫ সালে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে—যা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার ওপরও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সীমান্তে বিএসএফের হাতে অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনের পর মারা যান। অথচ একই বছর আগস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৫৬তম বিজিবি–বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বিএসএফ আবারও ‘শূন্য হত্যা’ নীতির প্রতিশ্রুতি দেয়।
শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, বিগত বছরের মে মাস থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২,৪৩৬ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গাও রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, ড্রোন উড়ানো ও গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে, যা সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, ১৯৭২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিএসএফের হাতে কমপক্ষে ১,৯৪৭ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। শুধু গত এক দশকেই প্রাণ গেছে ৩০৫ জনের, আহত হয়েছেন আরও ২৮২ জন। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর বড় অংশ ঘটেছে বিতর্কিত ‘শুট-অন-সাইট’ নীতির আওতায়—যেখানে সন্দেহভাজন চোরাকারবারি বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অনেক সময় নিরীহ মানুষকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো—এই নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই শিশু ও কিশোর।
২০১১ সালে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িতে ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ড আজও সীমান্তে নৃশংসতার প্রতীক। (ঢাকার গুলশান-২ কূটনৈতিক এলাকায় একটি সড়কের নাম পরিবর্তন করে ‘ফেলানী অ্যাভিনিউ’ রাখা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে গুলশান-২ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কটির নতুন নামকরণ করে।)
২০২০ সালে শিমন রায় ও সামসের প্রামাণিক, ২০২৪ সালে স্বর্ণা দাস—এদের সবাই কিশোর বয়সে প্রাণ হারিয়েছে।
এই পরিস্থিতি কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের ঘোষিত নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। সীমান্ত নিরাপত্তার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর জবাবদিহি ও নীতি পরিবর্তনের। সীমান্ত হত্যা বন্ধে যৌথ নজরদারি, প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ এবং প্রতিটি হত্যার স্বচ্ছ তদন্ত ব্যতীত ‘শূন্য হত্যা’ কেবল একটি ফাঁপা স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।
তথ্যসূত্রঃ
