পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিভ্রমগুলোর একটি হলো—আমি পৃথিবীটাকে যেমন দেখি, পৃথিবী আসলেই তেমন।
আমরা পৃথিবীটাকে দেখি আমাদের জন্ম, পরিবার, শিক্ষা, ট্রমা, সম্পর্ক, সংস্কৃতি, ব্যর্থতা, সাফল্য, ভয়, আশা, ব্যক্তিত্ব—এসবের সম্মিলিত একটি জানালা দিয়ে। ফলে একই ঘটনা দুইজন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে অনুভব করতে পারে। কারণ তারা একই পৃথিবী দেখলেও, একই জীবন বাঁচেনি।
তবুও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা প্রায় সবাই মনে মনে ধরে নেই—আমি যেভাবে পৃথিবীটাকে দেখছি, এটাই স্বাভাবিক; অন্যদেরও ঠিক এভাবেই দেখা উচিত। কেউ ভিন্নভাবে দেখলে আমরা বিরক্ত হই, আহত হই, কখনো কখনো তার সততা, বুদ্ধিমত্তা বা নৈতিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করি।
এর পেছনে মানুষের একটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা কাজ করে। মনোবিজ্ঞানে একে Naive Realism বলা হয়। অর্থাৎ, মানুষ অবচেতনভাবে বিশ্বাস করে—সে বাস্তবতাকে যেমন আছে ঠিক তেমনই দেখছে। তাই যে তার সঙ্গে একমত নয়, সে হয় তথ্য জানে না, নয়তো পক্ষপাতদুষ্ট, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যকে অস্বীকার করছে।
Lee Ross এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিরপেক্ষ মনে করে, অথচ নিজের অজান্তেই নিজের অভিজ্ঞতার ভেতর বন্দী থাকে।
এর সঙ্গে যোগ হয় False Consensus Effect। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজের বিশ্বাস, পছন্দ এবং সিদ্ধান্তকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ মনে করে। অর্থাৎ, আমরা ভাবি—”আমি যেহেতু এভাবে ভাবছি, অধিকাংশ মানুষও নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে এভাবেই ভাবে।” বাস্তবে তা অনেক সময় সত্য হয় না।
কিন্তু এখানেই একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা হওয়া উচিত।
কারণ ইসলাম শেখায়, আমার অভিজ্ঞতা সত্যের উৎস নয়। সত্যের উৎস আল্লাহ।
আমার অনুভূতি সীমিত।
আমার পর্যবেক্ষণ সীমিত।
আমার যুক্তি সীমিত।
আমার বিচারও সীমিত।
আর আল্লাহর জ্ঞান সীমাহীন।
এই কারণেই ইসলামে সত্য নির্ধারণের মানদণ্ড ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; ওহী। কোনো কিছু আমার ভালো লাগলো কি লাগলো না, আমার জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিললো কি মিললো না—এসব দিয়ে সত্য নির্ধারিত হয় না। বরং আমার অভিজ্ঞতাকে সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে সংশোধন করাই একজন মুমিনের কাজ।
এখানেই বড় পার্থক্য।
অনুভূতির পার্থক্যকে অস্বীকার করা ভুল।
আবার অনুভূতিকেই সত্যের মানদণ্ড বানানোও ভুল।
দুইজন মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা হবেই। তাই তাদের ভয় আলাদা হবে, অগ্রাধিকার আলাদা হবে, দুর্বলতা আলাদা হবে, কোনো ঘটনাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও অনেক ক্ষেত্রে আলাদা হবে। একজন মুমিন তাই মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। সে বুঝতে চেষ্টা করে—এই মানুষটি কেন এমনভাবে ভাবছে।
কিন্তু সহানুভূতি মানে এই নয় যে সব দৃষ্টিভঙ্গিই সমান সত্য।
এখানেই আধুনিক আপেক্ষিকতাবাদ (relativism) এবং ইসলামের মৌলিক পার্থক্য।
ইসলাম বলে না, “তোমার সত্য তোমার, আমার সত্য আমার।”
ইসলাম বলে, সত্য একটাই। কিন্তু সেই সত্যে পৌঁছানোর পথে মানুষের সীমাবদ্ধতা ভিন্ন ভিন্ন।
তাই একজন মুমিন একদিকে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে বুঝবে, অন্যদিকে সত্যের মানদণ্ডকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার হাতে ছেড়ে দেবে না।
ইমাম আশ-শাফিঈ (রহ.)-এর একটি বিখ্যাত কথা আছে—
“আমার মতামত সঠিক, তবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর অন্যের মতামত ভুল, তবে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।”
এটি সত্যকে আপেক্ষিক বলা নয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা।
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা নিজের জানালাটাকেই পুরো পৃথিবী মনে করতে শুরু করি।
তখন আমরা আর সত্যের অনুসন্ধান করি না।
বরং চাই, পৃথিবী আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খেয়ে যাক।
একজন মুমিনের কাজ উল্টো।
সে নিজের অভিজ্ঞতাকে ওহীর আলোয় বিচার করে।
যেখানে নিজের অনুভূতি ভুল, সেখানে অনুভূতিকেই সংশোধন করে।
যেখানে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত, সেখানে আল্লাহর হিদায়াতকে অগ্রাধিকার দেয়।
কারণ সে জানে—
আমার চোখ যতদূর দেখে, সত্য তার চেয়েও অনেক বড়।
-মাহফুজ আলআমিন
