ডেঙ্গু জ্বর এখন আর সিজনাল রোগ নয়, এটি কম-বেশি বছর জুড়েই থাকবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু আগে সিজনাল রোগ বলা হতো। এর সিজন শুরু হতো—এপ্রিল-মে থেকে শুরু হয়ে শেষ হতো সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কম-বেশি ডেঙ্গু সারা বছরেই থাকছে। যদিও শীতে ডেঙ্গু কমারে কথা; তবে গত বছর ডেঙ্গু শীতেও কমেনি। তাই আমাদের ভয়—এবারও কমবে কি না; এটা তো বেড়েই যাচ্ছে। এ বছরও শীতে কমবে কি না তা বলা যাচ্ছে না। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শীতে ডেঙ্গু না বাড়লেও কম-বেশি থাকবে।
শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডেঙ্গু বিশেষায়িত ওয়ার্ড সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সেখানে নারী ওয়ার্ডে কোনো সিট ফাঁকা নেই। আর পুরুষ ওয়ার্ডে সাতটি মাত্র সিট ফাঁকা আছে—৬৪০ নম্বর নারী ওয়ার্ডে ২৭ নম্বর বেডে থাকা শুক্ররণ নেসার (৫২) সঙ্গে কথা হয়। সাভার কাটগড়া থেকে এসেছেন তিনি। সঙ্গে থাকা মেয়ে খাদিজা আক্তার জানান, টানা আট দিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত তিনি। জ্বরের তৃতীয় দিনে দাঁতের মাড়িতে ও জিহবায় ঘা দেখা দেয়। এরপর দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত পড়া শুরু হলেও তিনি কাউকে কিছু জানাননি। এরপর শরীর বেশি দুর্বল হয়ে গেলে মেয়েকে জানান তার মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ছে। তখন স্থানীয় ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতাদের পরামর্শে মেয়ে খাদিজা মা শুক্ররনকে হাসপাতালে ভর্তি করান।
একই ওয়ার্ডে ৩০ নম্বর বিছানায় আছেন মোছা. মিনু (৪২)। তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছেন, জ্বর, বমি, পাতলা পায়খানা এবং পায়খানার সঙ্গে রক্ত যখন যাচ্ছিল, তখন তিনি তার ছেলের বউকে জানিয়েছের এবং ততক্ষণে তিনি অনেকটা অচেতন অবস্থা। মিনুর ছেলে ও ছেলের বউ হাসপাতালে এনে ভর্তি করানোর পর জানতে পারেন মিনু বেগমের ডেঙ্গু হয়েছে।
২৮ নম্বর বেডে আছেন নিপা আক্তার (২৮)। তিনি থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ৪ নম্বর সড়কে। তিনিও আজ সাত দিন হলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। অথচ গতকাল সকালে হাসপাতালে এসে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারেন তার ডেঙ্গু হয়েছে। তিনি হাসপাতালে আসেন, কারণ তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন, হাঁটতে পারছিলেন না, হাসপাতালে ভর্তির পরে জানতে পারেন তিনি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত।
৫২৯ নম্বর পুরুষ ডেঙ্গু বিশেষায়িত ওয়ার্ডের ৪ নম্বর বিছানায় আছেন নূর আলম (৩৯)। তিনি জ্বর আসার ষষ্ঠ দিনে শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে আসেন। তিনি গাবতলী আমিনবাজার থেকে এসেছেন। বলেন, আমার মুখে ঘা ছিল, পাতলা পায়খানা ও পরে ঠাণ্ডা লাগা ছিল। একই অবস্থা মাসুদ রানা (৩০) এর। তিনিও একই ওয়ার্ডে ৫৬ নম্বর বিছানায় আছেন। বলেন, ভেবেছিলাম সাধারণ জ্বর, এরপর শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে এলে চিকিৎসক জানায় তার ডেঙ্গু হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বর ও সিজনাল জ্বরের উপসর্গ প্রায় এক। তবে জ্বর হলে মানুষ মনে করেন, হয়তো আবহাওয়া বদলের কারণে জ্বর এসেছে। আর ঋতু পরিবর্তনের সময় এই জ্বর যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে, সেটা খুব স্বাভাবিক, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এই ভেবে সময়ক্ষেপণ করে রোগীরা শারীরিক অবস্থা জটিল হলে হাসপাতালে আসছেন। এতে হাসপাতালে যেমন ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে; তেমনি বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। তারা বলেন, সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটছে। জ্বর হলেই সেটি ডেঙ্গু জ্বর কি না, তা নিশ্চিত হতে জ্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনেই এসএস-১ পরীক্ষা করাতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ডেঙ্গু জ্বর এখন আর সিজনাল রোগ নয়, এটি এখন বছর জুড়েই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ডেঙ্গু আগে বলা হতো সিজনাল রোগ, এপ্রিল-মে মাসে শুরু হয়ে শেষ হতো সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কম-বেশি ডেঙ্গু সারা বছরেই থাকছে। যদিও শীতে ডেঙ্গু কমার কথা, তবে গত বছর কিন্তু শীতেও ডেঙ্গু ছিল। ফলে আমাদের ভয়— এবারও কমবে কি না; কারণ ডেঙ্গু তো বাড়ছেই। এ বছরও শীতে কমবে কি না তা বলা যাচ্ছে না। এই মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, শীতে ডেঙ্গু না বাড়লেও. কম-বেশি থাকবে। তবে সচেতন থাকতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা নিতে হবে। জ্বর হলেই সেটি ডেঙ্গু জ্বর কি না, তা নিশ্চিত হতে জ্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনেই এসএস-১ পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।
