Monday, August 31, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদৈনন্দিন খবরজাতিসংঘ, যৌন নির্যাতন এবং যে প্রশ্ন কখনো করা হয়না

জাতিসংঘ, যৌন নির্যাতন এবং যে প্রশ্ন কখনো করা হয়না

মাঝে মধ্যেই দেখা যায় জাতিসংঘ বিশেষ কিছু দেশের “নারী বিষয়ক” আলোচনা নিয়ে বেশ উৎসাহী হয়ে থাকে। মেয়েদের স্কুল বা নারীদের শিক্ষা নিয়ে জাতিসংঘের মাথা ব্যাথা দেখলে মনে হয় এই সংস্থা যেন নারীদের উদ্ধার করতেই জন্ম হয়েছে। আজ আমরা সেই জাতিসংঘেরই কিছু আমলনামা দেখাব ইনশাআল্লাহ।

এটা কোনো সাহিত্য নয় – এটা জাতিসংঘের নিজের রেকর্ড, নিজস্ব আমলনামা!

যখন সংখ্যা কথা বলে

২০২৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের নিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শান্তিরক্ষা ও রাজনৈতিক মিশনে যৌন নিপীড়ন ও শোষণের অভিযোগ ছিল ১০২টি, চিহ্নিত ভুক্তভোগী ১২৫ জন, যার মধ্যে ২৭ জন শিশু।[১] এর ৮২ শতাংশ, মানে প্রায় প্রতি পাঁচটির চারটি অভিযোগ, এসেছে মাত্র দুটি মিশন থেকে – কঙ্গো (৪৪টি) আর সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (৪০টি)।[১] ২০২৩ সালে ভুক্তভোগীর সংখ্যা ছিল আরও বেশি – ১৪৩ জন, যার ৯০ শতাংশই কঙ্গো ও সিএআর মিশন থেকে।[২]

এবার আরেকটু পেছনে যাই। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ১২ বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে ২০১৭ সালে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় – ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী ও কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ২,০০০টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ জমা পড়েছিল, যার ৩০০-র বেশি ছিল শিশুদের বিরুদ্ধে।[৩] দুই হাজার অভিযোগ। বারো বছরে। আর জেলে গিয়েছে কতজন? “শুধু একটা ভগ্নাংশ” – এপি নিজেই লিখেছে এই শব্দ।[৩]

হাইতি: একটা শিশু-যৌন চক্র যার নাম কেউ জানত না

২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত হাইতিতে অন্তত ১৩৪ জন শ্রীলঙ্কান শান্তিরক্ষী নয়টি হাইতিয়ান শিশুকে নিয়ে একটা যৌন-চক্র চালিয়েছিল।[৪] ফলাফল কী হলো? ১১৪ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হলো। একজনকেও অভিযুক্ত করা হয়নি, একজনকেও শাস্তি দেওয়া হয়নি।[৪] শুধু “বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া” – যেন এটা স্কুলের শাস্তি, অপরাধ নয়।

আর কঙ্গোয় ২০০৬ সালের একটা গোপন জাতিসংঘ তদন্তে ২১৭টি অভিযোগ পাওয়া যায়, কিশোরীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক থেকে শুরু করে ভুক্তভোগীদের “কুপিয়ে ফেলার” হুমকি পর্যন্ত। একজন ভুক্তভোগী বলেছিলেন, তদন্তকারীদের সাথে সহযোগিতা করলে এক শান্তিরক্ষী তাকে বার্তা পাঠায় — দেখা হলে “হ্যাক” (কুপিয়ে) করে দেবে।[৫] ৭৫ জন অভিযুক্তের মধ্যে প্রমাণ মিলেছিল মাত্র একজনের বিরুদ্ধে।[৫]

এখানেই থামেনি। ২০১৮ সালে ফাঁস হয় যে অক্সফামের কর্মীরা ২০১০ সালের ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত হাইতিতে যৌনকর্মী ভাড়া করেছিল, এমনকি অক্সফামের বাড়িতেই “সেক্স পার্টি” হতো, আর নাবালিকা জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকারও করা হয়নি। শুধু “প্রমাণিত হয়নি” বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল।[৬] হাইতির প্রেসিডেন্ট নিজেই বলেছিলেন – এটা “বরফখণ্ডের দৃশ্যমান অংশমাত্র।”[৬]

সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক: খাবারের বিনিময়ে ধর্ষণ

এবার আসি সেই ঘটনায়, যেটা জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়গুলোর একটা হিসেবে চিহ্নিত। ২০১৪ সালে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের বাঙ্গুই শহরের এম’পোকো বাস্তুচ্যুত-শিবিরে ফরাসি “সাঙ্গারিস” বাহিনীর সেনারা নয় বছর বয়সী শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন চালায়, বিনিময়ে দেওয়া হতো সামান্য খাবার বা কয়েক পয়সা।[৭] জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তকারীরা মে-জুন ২০১৪ সালে ছয়জন শিশুর সাক্ষাৎকার নেয়, যারা নিজেরাই নির্যাতিত হয়েছিল বা অন্য শিশুদের নির্যাতিত হতে দেখেছিল।[৮] অথচ জাতিসংঘ মিশনের প্রধান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। না শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়েছে, না ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।[৮]

এই ঘটনা প্রথম জানাজানি হয় যখন জাতিসংঘেরই একজন মানবাধিকার কর্মকর্তা গোপন প্রতিবেদনটি ফাঁস করে দেয় এইডস-ফ্রি ওয়ার্ল্ড নামের একটি অ্যাডভোকেসি সংস্থার কাছে – আর তার পুরস্কার ছিল, তাকেই সাসপেন্ড করা হয়।[৮]

পরে জাতিসংঘের নিজস্ব স্বাধীন পর্যালোচনা প্যানেল এই ঘটনাকে আখ্যা দেয় জাতিসংঘের “gross institutional failure” হিসেবে – যে ব্যর্থতা আরও নতুন নির্যাতনের পথ খুলে দিয়েছিল।[৯] এরপরও, ২০১৪ সালে শিশুদের দেওয়া অভিযুক্তদের নাম, ডাকনাম, শারীরিক বৈশিষ্ট্য পর্যন্ত ফরাসি কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হলেও, দুই বছর পার হয়ে গেলেও কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের হয়নি, শাস্তি অনেক দূরের বিষয়![১০]

একজন কিশোরী, যে চৌদ্দ বছর বয়সে বাঙ্গুইয়ে এক ফরাসি সেনার দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিল – নিজের নির্যাতনকারীর শারীরিক বর্ণনা, উচ্চতা, গঠন, ঘাড় থেকে হাত পর্যন্ত বিস্তৃত ট্যাটু – নিখুঁতভাবে তদন্তকারীদের জানিয়েছিল। তারপরও কোনো অভিযোগ দাঁড়ায়নি। তার সোজা কথা ছিল – বিচার দরকার, কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই।[১১] এই একটি বাক্যেই যেন গোটা প্রতিবেদনের সারমর্ম ধরা পড়ে।

দ্য নিউ হিউম্যানিটারিয়ানের চার মাসব্যাপী অনুসন্ধানে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের একটি মাঝারি শহরেই দেড়শোর বেশি নারীকে সম্ভাব্য ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, আর গ্যাবন ও বুরুন্ডির ৪১ জন শান্তিরক্ষীকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়।[১১] প্রতিবেদকরা লিখেছে – এই শহরে প্রায় প্রত্যেকেই কাউকে না কাউকে চেনে, যে শান্তিরক্ষীর হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।[১১]

জাতিসংঘের নিজের কর্মীরাই আর বিশ্বাস করে না

এখানে সবচেয়ে আত্মঘাতী পরিসংখ্যানটা আসে জাতিসংঘের নিজস্ব ২০২৪ সালের অভ্যন্তরীণ জরিপ থেকে। জাতিসংঘের নিজস্ব কর্মী জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩,৭০০ জন কর্মী, মোট উত্তরদাতার ৬ শতাংশ খোলাখুলি জানিয়েছে, যৌন নিপীড়ন ও শোষণ মোকাবেলায় নেতৃত্বের সক্ষমতার ওপর তাদের আস্থা নেই। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৩ শতাংশ। মাত্র এক বছরে অনাস্থা দ্বিগুণ হয়ে গেছে।[১] প্রতিবেদনেই “উদ্বেগজনক” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।[১] এটা কোনো বহিরাগত সমালোচকের বক্তব্য নয়, এটা জাতিসংঘের নিজস্ব ঘরের লোকদের রায়।

ইমিউনিটি নামের একটা শব্দ, যা আসলে দায়মুক্তির আরেক নাম

এত অভিযোগ, তবু এত কম শাস্তি? উত্তরটা লুকিয়ে আছে জাতিসংঘের নিজের আইনি কাঠামোয়। শান্তিরক্ষীরা স্বাগতিক দেশের বিচারব্যবস্থার আওতায় পড়ে না – জাতিসংঘের কাছে তাদের শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার নেই, শুধু আছে দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা। বিচার নির্ভর করে সেই শান্তিরক্ষীর নিজের দেশের ইচ্ছার ওপর, আর বেশিরভাগ দেশ সেই ইচ্ছা দেখায় না।[১][৩] ২০০৬ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৭৫০টি পিতৃত্ব ও শিশু-ভরণপোষণের দাবি নথিভুক্ত হয়েছে, যার ৫০০-র বেশি এখনো অমীমাংসিত পড়ে আছে।[১] অর্থাৎ, একজন নারী ধর্ষিত হয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছেন, আর সেই সন্তানের ভরণপোষণের দাবিটাও বছরের পর বছর ফাইলবন্দি।

এটাই সেই কাঠামোগত নীরবতা, যাকে বলা যায় প্রাতিষ্ঠানিক জিম্মাদারি এড়ানোর এক নিখুঁত নকশা – জবাবদিহিতা না থাকার একটা বৈধ, স্বাক্ষরিত পথ। “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা প্রতি বছর ঘোষণা করা হয়,[১] কিন্তু নীতি আর বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব, সেখানেই লক্ষাধিক ভুক্তভোগীর নীরব কান্না জমা হয়ে আছে।

আমরা কেন জানি না — বা জানতে চাই না

এখানে একটা প্রশ্ন সততার সাথে নিজেকে জিজ্ঞেস করা দরকার। আমরা যারা জাতিসংঘকে “আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতীক” বলে বড় হয়েছি, আমরা কি জানতাম এই সংখ্যাগুলো? বাংলাদেশও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা পাঠানোর দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় – আমাদের সৈনিকরা যান “শান্তি রক্ষা”-র নামে, বৈদেশিক মুদ্রা আসে, সম্মান আসে। কিন্তু এই একই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরেই যে জবাবদিহিতাহীনতার একটা গর্ত আছে, সেই আলোচনা আমাদের গণমাধ্যমে কতটা হয়? জাতিসংঘকে প্রশ্ন করাটাকে আমরা প্রায় ধর্মদ্রোহিতার মতো দেখি, যেন এটা একটা নিরপেক্ষ, পবিত্র প্রতিষ্ঠান, যার ভুল হতে পারে না।

এইখানেই “রক্ষক যখন ভক্ষক” কথাটার আসল ওজন। যে প্রতিষ্ঠান নিজেকে মানবাধিকারের সর্বোচ্চ প্রহরী বলে দাবি করে, তার নিজের সেনাবাহিনীর মধ্যে যদি হাজার হাজার ধর্ষণের অভিযোগ চাপা পড়ে থাকে, আর বিচার হয় “ভগ্নাংশ” পরিমাণে, তাহলে প্রশ্নটা ব্যক্তি-অপরাধীর চেয়েও বেশি – প্রশ্নটা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক কর্তৃত্বের।

ভাবার জায়গা

একটা কথা ভাবুন- যে সংস্থার মূল সনদই বলে “মানবাধিকার রক্ষা”, সেই সংস্থার কাঠামোতেই যদি জবাবদিহিতার এমন একটা ফাঁক রাখা হয়ে থাকে যেখানে অপরাধী নিজের দেশে ফিরে গিয়ে অভিযোগমুক্ত থেকে যায় তাহলে এটা কি নিছক ব্যর্থতা, নাকি একটা ডিজাইন? কেন আমরা এই প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি?

যে সংস্থা নিজের সুসজ্জিত কার্যালয় থেকে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের সনদ বিতরণ করে, তাদের নিজেদের পতাকাতলে যখন শতাব্দীর অন্যতম নিকৃষ্টতম শিশু নির্যাতন ও কাঠামোগত নিপীড়ন প্রশ্রয় পায়, তখন তাদের Moral Authority শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকে। জাতিসংঘ যখন একদিকে নিজের শান্তিরক্ষীদের হাজার হাজার অপরাধ ধামাচাপা দেয় আর অন্যদিকে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্ন বা সাজানো ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে “বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদন” পেশ করে, তখন এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রকৃত উদ্দেশ্য উন্মোচিত হয়ে পড়ে।

এটি আর কেবল কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা কয়েকজন ‘বিপথগামী’ শান্তিরক্ষীর অপরাধ নয়; এটি একটি সুসংগঠিত, বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত বৈশ্বিক চক্রান্তের রূপ। নীল হেলমেটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই চরম বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে – জাতিসংঘ আদতে কোনো বিশ্বশান্তির নিরপেক্ষ রক্ষক নয়, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি ও পশ্চিমা অক্ষের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশলগত হাতিয়ার মাত্র।

আমরা কোনো গল্প বা রূপকথা রচনা করিনি; আন্তর্জাতিক আদালতের নথি, তাদের নিজস্ব তদন্ত রিপোর্ট এবং ভিকটিমদের রক্তভেজা সাক্ষ্যের আলোকেই এই নির্মম সত্য তুলে ধরেছি। এবার আপানাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে – ‘শান্তির দূত’ হিসেবে প্রচারিত এই নীল হেলমেট কি সত্যিই মুক্তির প্রতীক?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

8 − 1 =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য