সংখ্যার বিবেচনায় ইসলাম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। গোটা বিশ্ব ইসলাম ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। তবে বিশ্বজুড়ে অত্যাচারিত হওয়ার দিক থেকে মুসলিম জাতিই প্রথম স্থান দখল করে আছে। কিন্তু কেন? কেন আমরা এত অত্যাচারিত? কেন আজ ফিলিস্তিন বর্ণনাতীত ব্যথায় ব্যথিত? কেন চলছে আজ ভারতজুড়ে মুসলিম নিধন? কেন আজ আফ্রিকার বুকে চলছে রক্তের হোলি খেলা? কী আমাদের অপরাধ? কোথায় আমাদের দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো আজকের এই কলামে। ওমা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ।
ঈমানের দুর্বলতা: মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস সৈন্য সংখ্যা কিংবা অস্ত্র-সস্ত্র নয়। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস হচ্ছে ঈমান। ইতিহাসে বদর, খন্দক ইয়ারমুক, কাদিসিয়াসহ বহুযুদ্ধে আমরা তার নযির দেখতে পাই। এসব কোনো যুদ্ধেই সৈন্য কিংবা অস্ত্রের দিক দিয়ে মুসলমানরা এগিয়ে ছিল না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী প্রত্যেক যুদ্ধেই মুসলমানরা অভূতপূর্ব বিজয় আর কাফেররা সূচনীয় পরাজয় বরণ করেছিল। কিন্তু এখন আমরা আল্লাহর উপর সেই আস্থা ও বিশ্বাস যথাযথভাবে রাখছিনা। আমরা কেবলই নির্ভর করছি অস্ত্র আর সৈন্য সংখ্যার উপর।
নৈতিক পদস্থলন: আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) কে প্রেরণ করেছিলেন সর্বোত্তম চরিত্র দিয়ে। পবিত্র আল-কুরআন যাকে উল্লেখ করা হয়েছে খুলুকুন আযিম বলে। অসাধারণ চরিত্রের অধিকারী সেই ব্যক্তির অনুসারী হিসেবে আমাদের চরিত্রও হওয়া উচিত ছিল অন্য সবার চেয়ে ভিন্ন, অন্য সবার চেয়ে উন্নত। আমাদের দায়িত্ব ছিল অন্যদের চরিত্রকে সংশোধন করা। কিন্তু উল্টো আমরাই আজ অনৈতিকতার গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত।
মৃত্যুকে অধিক ভয় করা: যুগে যুগে মুসলিমরা ছিল মৃত্যু ভয়হীন অকুতোভয় যোদ্ধা। কাফেররা বেঁচে থাকাকে যতটা ভালোবাসতো মুসলিম বীরেরা শাহাদাতের মৃত্যুকে ঠিক ততটাই ভালোবাসতো। আর এই পার্থক্যটাই প্রতিটি ময়দানে মুসলমানদের কাফেরদের তুলনায় অধিক এগিয়ে রেখেছিল। কাফেররা যখন নিজের জীবন নিয়ে থাকত আতঙ্কগ্রস্ত, তখন মৃত্যু ভয়হীন মুসলিম বীরেরা নিজের জীবন বাজি রেখে পরিচালনা করত দুঃসাহসিক সব অভিযান। কারণ তারা রাসুলের হাদিসকে মনে-প্রাণে ধারণ করত- মৃত্যু মুমিনের জন্য উপহারস্বরূপ। কিন্তু সব ভুলে আজ আমরাও কাফেরদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। আমরাও দুনিয়ার জীবনকে এত বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছি যে, সত্য ও ন্যায়ের পথে ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতাই অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে ফেলেছি।
ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত থাকা: একটি জাতির ধ্বংসের জন্য ভোগ-বিলাসে গভীরভাবে ডুবে থাকা-ই যথেষ্ট। কেননা দুনিয়াবি এ ভোগ-বিলাস মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্যকে ভুলিয়ে দেয়। তারা ভুলে যায় কল্যাণ আর অকল্যাণের ভেদাভেদ। আরো চাই, আরো চাই মানসিকতা আমাদের ক্রমান্বয়ে ভোগের দাসে পরিণত করে এবং জাতীয় উন্নয়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত আরামকে অগ্রাধিকার দিতে শেখায়। যে জাতি শুধু ভোগ করতে শেখে, কিন্তু ত্যাগ করতে ভুলে যায়, সে জাতি কখনো শক্তিশালী জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারে না।
আত্মকেন্দ্রিকতা: ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে নিজের ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে উম্মাহর সামগ্রিক কল্যাণে কাজ করতে। কিন্তু আজ আমরা বড়ই স্বার্থপর হয়ে গেছি, বড়ই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি। কোনো কাজের শুরুতে একবারও হিসাব কষে দেখি না তাতে উম্মাহর কতটুকু লাভ, আর কতটুকু ক্ষতি। আমরা কেবলই দেখি শুধু নিজের লাভ আর ক্ষতির হিসাব।
যোগ্য নেতৃত্বের অভাব: মাঝিবিহীন নৌকা যেমন তীরে পৌঁছাতে পারে না, ঠিক তেমনিভাবে নেতৃত্ববিহীন একটি জাতি সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে না। একজন নেতাকে সত্যিকারের যোগ্য নেতা হয়ে উঠতে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, অধীনস্থদের মধ্যকার বিভেদ দূর করার ক্ষমতা এবং সংকট মোকাবিলার দক্ষতার মতো গুণাবলি থাকতে হয়। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে এইরকম নেতার বড্ড অভাব। যার দরুন মুসলমানরা আজ হাজারো গ্রুপে বিভক্ত আর স্থানে স্থানে হচ্ছে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা: কোনো জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা অনেকাংশে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাই নির্ধারণ করে দেয়। বর্তমানে মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। এক শ্রেণী হচ্ছে জাগতিক বিষয় তারা খুব পারদর্শী, তবে ধর্মীয় বিষয়গুলোতে জ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম। তারা সমাজে এলিট শ্রেণী নামে পরিচিত। আরেকটা শ্রেণী যারা জাগতিক বিষয়গুলোতে তুলনামূলক কম পারদর্শী, তবে ধর্মীয় বিষয়গুলোতে তারা খুব পারদর্শী। তারা সমাজে আলেম শ্রেণী নামে পরিচিত। ভিন্ন ভিন্ন দুই ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উঠে আসার কারণে তাদের মধ্যকার চিন্তা ধারায়, বোঝাপড়ায় ব্যাপক ফারাক থেকে যায়। কিন্তু আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে এই দুই শ্রেণীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।
মিডিয়া না থাকা: বর্তমান সময়ে মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র। মিডিয়ার ছোট্ট একটি হেডলাইন কিংবা থাম্বেল মূহুর্তেই পরিবর্তন করে দিতে পারে লাখো মানুষের চিন্তার জগত। তবে সেই জায়গায় আমাদের অবস্থান একেবারেই দুর্বল। অমুসলিমদের নিয়ন্ত্রিত শত শত প্রসিদ্ধ মিডিয়া থাকলেও মুসলিমদের নিয়ন্ত্রিত তাদের সমপর্যায়ের মিডিয়ার সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ি। অথচ বর্তমান যুগে যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না; তথ্য, সংবাদ, প্রচারণা ও জনমতও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা: বর্তমান যুগে মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে কোনো জাতির সামনে এগুনো সম্ভব নয়। আর একটা সময় মুসলমানরা ছিল জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অগ্রসরমান এক জাতি। তাদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখা। কিন্তু আমরা সেই সেক্টরে আজ শত শত বছর পিছিয়ে আছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব যখন নানাবিধ প্রযুক্তি আর অস্ত্র-সস্ত্র উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, আমরা তখন সেই খাতে বিনিয়োগ না করে পরনির্ভরতার পথকে বেছে নিয়েছি।
উপরিউক্ত পয়েন্টগুলো থেকে খুব সহজে অনুমান করা যায় যে, মুসলিম উম্মার বর্তমান অবস্থার জন্য কেবল বাহিরের শত্রুরাই দায়ী নয়, এর জন্য আমাদের ভেতরকার নানাবিধ দুর্বলতাও দায়ী।
