Monday, September 7, 2026
No menu items!

আমাদের মুসলিমউম্মাহ ডট নিউজে পরিবেশিত সংবাদ মূলত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সমাহার। পরিবেশিত সংবাদের সত্যায়ন এই স্বল্প সময়ে পরিসরে সম্ভব নয় বিধায় আমরা সৌজন্যতার সাথে আহরিত সংবাদ সহ পত্রিকার নাম লিপিবদ্ধ করেছি। পরবর্তীতে যদি উক্ত সংবাদ সংশ্লিষ্ট কোন সংশোধন আমরা পাই তবে সত্যতার নিরিখে সংশোধনটা প্রকাশ করবো। সম্পাদক

Homeদাওয়াডিজিটাল যুগে অন্তরের নীরব মৃত্যু!

ডিজিটাল যুগে অন্তরের নীরব মৃত্যু!

দিনের যেকোনো একটা মুহূর্ত – বাসে বসে, কাজের ফাঁকে বিরতিতে, খাবার টেবিলে, কিংবা ঘুমানোর আগে হাতে ফোন, উদ্দেশ্য ছিল সামান্য – পাঁচ মিনিট একটু রিফ্রেশ হওয়া, দু’একটা মেসেজের উত্তর, নোটিফিকেশন চেক তারপর কাজে ফেরা। কিন্তু অ্যালগরিদম টেনে নিয়ে গেল এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে। একটা দৃশ্য অস্বস্তিকর, পরেরটা অশ্লীল; কোথাও ঠাট্টার ছলে বলা কুফরি কথা, কোথাও ধর্ম নিয়ে বিদ্রূপ, কোথাও এমন বিনোদন যা চোখকে আটকে রাখে কিন্তু ভেতরটা খালি করে দেয়। সব একসাথে, একই স্রোতে, একই গতিতে বয়ে যাচ্ছে – এখানে পাপ আলাদা করে চেনা যায় না, কারণ এই পরিবেশে পাপ আর পাপ না বরং এই জগতে পাপের পরিচয় – কনটেন্ট। যতক্ষণে আমরা চোখ সরাই, ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে! – দৃশ্যটা কি আমাদের পরিচিত মনে হয়?

এই দৃশ্য কোনো নির্দিষ্ট সময়ের না। এটা রাতেও ঘটে, দুপুরেও ঘটে, কাজের মাঝখানেও ঘটে। সমস্যাটা সময়ের না, সমস্যাটা প্যাটার্নের – আমরা প্রতিদিন বহুবার এই একই ফাঁদে পড়ি অথচ খেয়াল’ই করতে পারিনা।

কোন পাপ যখন অন্তরে তীক্ষ্ণ খোঁচা মারে তখন অজুহাত দেই – “এটা তো হঠাৎ সামনে চলে এসেছিল।” হয়ত, প্রথম দৃশ্যটা অনেক সময় আমাদের নিয়ন্ত্রনে থাকেনা, কিন্তু পরের কয়েক সেকেন্ড? সেখানেই শুরু হয় আসল পরীক্ষা। আঙুল কি সরে যাবে, নাকি চোখ একটু বেশি সময় থাকবে? আমরা অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। আর হুঁশ যখন ফিরে আসে, ততক্ষণে গুনাহ হয়ে গেছে – অথচ আশ্চর্যের বিষয়, আমরা সেটাকে গুনাহ বলেই চিনতে পারি না। কেমন জানি একটু ভোঁতা অনুভূতি হয় বটে, কি যেন একটু অস্বস্তিকর – ব্যস এরপরে আবার এগিয়ে চলে সবকিছু!

বিপদটা এখানেই ভয়ংকর – গুনাহ শুধু বেড়ে যায়নি, গুনাহ তার পরিচয়টাই লুকিয়ে ফেলেছে। আগে কোনো ভুল কাজের দিকে যেতে হলে মানুষকে কয়েক রকম দরজা পেরোতে হতো, লজ্জা অতিক্রম করতে হতো, নিজের সাথে একরকম যুদ্ধ করতে হতো। এখন একটা নোটিফিকেশন, একটা “For You” ফিড’ই যথেষ্ট। পাপ যেন বন্যার পানির মতো নেমে আসে, কেউ ইচ্ছে করে ভেসে যায় না, কিন্তু ভেসে আসা তোড়ের মত পাপ এত দ্রুত আর এতদিক থেকে আসে যে পা মাটিতে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা টেরও পাই না কখন ভেসে গেছি!

আল্লাহ তাআলা কুরআনে এই অবস্থার জন্য একটা নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেছেন – “رَانَ”

كَلَّا‌ۖ بَلْۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُواْ يَكْسِبُونَ

“কখনোই নয়, বরং তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের অন্তরের ওপর মরচে পড়ে গেছে।”[১]

ইমাম গাযযালী (রহ:) তাঁর “ইহইয়া উলুমুদ্দীন” গ্রন্থে অন্তরকে একটা আয়নার সাথে তুলনা করেছেন। প্রতিটা গুনাহ সেই আয়নায় এক পোঁচ প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। প্রথমে আয়না একটু অস্পষ্ট হয়, তবু প্রতিফলন দেখায়। কিন্তু প্রলেপ জমতে জমতে একসময় আয়না আর কিছুই দেখায় না – তখন সেটা শুধু একটা কালো জড় বস্তু হয়ে থাকে।[২] তিনি আরও বলেছেন – ইন্দ্রিয় ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রতিটা কাজ শেষ পর্যন্ত এই অন্তরের অবস্থাকেই প্রভাবিত করে। তাই চোখের অবাধ্যতা কখনো শুধু চোখের সমস্যা থাকে না, ধীরে ধীরে তা অন্তরের অভ্যাসে পরিণত হয়।[৩]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন – বান্দা যখন একটা গুনাহ করে, অন্তরে একটা কালো দাগ পড়ে যায়। সে তওবা করলে, ফিরে এলে, ক্ষমা চাইলে অন্তর আবার পরিষ্কার হয়। কিন্তু আবার গুনাহ করলে দাগ বাড়তে থাকে, যতক্ষণ না পুরো অন্তরটাই ঢেকে যায়।[৪] অন্তর একদিনে কালো হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট ছাড়, অদৃশ্য আপোষ, “আরেকটু দেখি”, মজার কনটেন্ট তো – বলে উদাসীন মুহূর্তগুলো জমতে জমতেই অন্তর ভারী হয়ে যায়।

এই “না চেনা” টাই ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.)-এর কাছে সবচেয়ে বড় বিপদ মনে হয়েছিল। তাঁর “তালবীসু ইবলীস” গ্রন্থে তিনি লিখেছেন – শয়তানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র সরাসরি পাপের দিকে টানা নয়, বরং পাপকে এমন সাজে হাজির করা যেন তা স্বাভাবিক, নিরীহ, গ্রহণযোগ্য মনে হয়।[৫]

আজকের ডিজিটাল জগতে এই প্রতারণা আরও সূক্ষ্ম। গুনাহকে আর গুনাহের পোশাকে আসতে হয় না; কখনো তা আসে হাসির ভিডিও হয়ে, কখনো ট্রেন্ড হয়ে, কখনো “সবাই তো দেখছে” এই যুক্তি হয়ে। প্রতিবার দেখার পর অন্তরের সংবেদনশীলতা একটু কমে যায় – প্রথমবার অস্বস্তি হয়, দ্বিতীয়বার কম, তৃতীয়বার মানুষ বিরক্তও হয় না। যে দৃশ্য একসময় চোখ নামিয়ে দিতে বাধ্য করত, সেটাই একদিন আর দশটা সাধারণ কনটেন্টের মতো মনে হতে থাকে।

ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) তাঁর “সাইদুল খাতির”-এ লিখেছেন – অন্তর যখন ক্রমাগত অনর্থক ও ক্ষতিকর জিনিসে ডুবে থাকে, ইবাদতে আর মিষ্টতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।[৬] নামাযে দাঁড়ালে মন অস্থির থাকে, কুরআন শুনলে ভেতরে কম্পন তৈরি হয়না, ভালো কাজে ইচ্ছা করে না, আবার খারাপ কাজেও আগের মতো অপরাধবোধ হয় না। অন্তর অশান্ত থাকে, অথচ সে নিজেই জানে না সে আসলে কী চায়!

হাতে থাকা যন্ত্রটা কখন যে আমাদের অন্তরের নিয়ন্ত্রন নেয়া শুরু করেছে তা আমরা বুঝতেই পারি না। আর এই নিয়ন্ত্রন নেয়ার প্রধান দরজাটা হচ্ছে আমাদের “চোখ“। আল্লাহ তা’আলা তাই দৃষ্টিকেই প্রথম প্রতিরক্ষার জায়গা বানিয়েছেন – “আপনি মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে; এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।”[৭] চোখ শুধু একটা অঙ্গ নয়, এটা অন্তরের প্রথম দরজা, যে দরজা আমরা খোলা রাখি সারা দিন-রাত। উমার ইবনুল খাত্তাব (র) বলতেন – নিজের হিসাব নিজে নাও, তোমাদের হিসাব নেয়ার আগেই।[৮]

নিজের কাছে আজ একটা প্রশ্ন রাখা দরকার – “আমি কি গুনাহকে আলাদা ভাবে চিনতে এবং সেটাকা বাধা দিতে পারছি? নাকি গুনাহকে আর গুনাহ’ই মনে হচ্ছে না!” প্রশ্নটা কঠিন, কিন্তু এড়িয়ে গেলে চলবে না। ঈমানের মিষ্টতা হারিয়ে যাওয়ার অনেক আগেই অন্তর নীরবে সংকেত দিতে থাকে – নামাযে অমনোযোগ, কুরআনে অনাগ্রহ, হারাম দৃশ্যে অনুভূতি-শূন্যতা! এগুলোকে শুধু মানসিক ক্লান্তি বলে পাশ কাটানো মানে নিজের অন্তরের সবচেয়ে জরুরি উপসর্গকেই উপেক্ষা করা।

.

শেষ কথা – পাপ নিজে যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়েও ভয়ংকর হলো পাপকে আর পাপ মনে না করা। যেদিন থেকে একজন মানুষ গুনাহকে গুনাহ হিসেবে চিনতে অক্ষম হয়ে যায়, সেদিন থেকেই তার অন্তরের প্রকৃত মৃত্যু শুরু হয়। তাই সবচেয়ে জরুরি দু’আ এমন হওয়া উচিৎ – হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে এমনভাবে জীবিত রাখুন যেন গুনাহকে আমি গুনাহ হিসেবেই চিনতে পারি এবং সেটা থেকে বেঁচে থাকতে পারি। আমি যেন কখনো অন্ধকারকে আলো বলে ভুল না করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

twelve − six =

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য