রাজধানী ঢাকাকে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা এবং দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার একটি বড় কর্মপরিকল্পনা বা ‘মেগা প্ল্যান’ নিয়ে কাজ করছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ১ লাখ প্রশিক্ষিত ও দক্ষ স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ এবং জরুরি সময়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ৪৫০টি নির্দিষ্ট ‘অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট’ বা সমবেত হওয়ার স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ে সক্ষমতা ও কার্যক্রম বাড়াতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার একটি প্রশাসনিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত নবম ‘আরবান ডায়ালগ-২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এসব তথ্য জানান। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে আরবান আইএনজিও ফোরাম বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় ঢাকা শহরে ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় ১ লাখ নতুন স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এসব স্বেচ্ছাসেবী যেকোনো দুর্যোগে ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ বা প্রাথমিক উদ্ধারকর্মী হিসেবে কাজ করবেন। তিনি জানান, আগে সরকারি পর্যায়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর একটি ডেটাবেস থাকলেও দীর্ঘদিন হালনাগাদ না হওয়ায় বর্তমানে ১৮ বছরের বেশি বয়সি তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন করে প্রায় ৫০ হাজার ৫০০ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব বলেন, ‘আমরা দেশের এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে মূল শক্তি বা পুঁজি করে ভলান্টিয়ার নিয়োগ করতে চাই। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত এই ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবীর প্রত্যেককে প্রাথমিক চিকিৎসা, উদ্ধারকাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যসহ প্রয়োজনীয় বিশেষ সরঞ্জাম ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’
সচিব জানান, ভূমিকম্পের পর সাধারণ মানুষ কোথায় সমবেত হবে এবং সরকারি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কোথায় পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত করতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) সঙ্গে সমন্বয় করে ৪৫০টি উন্মুক্ত ও নিরাপদ স্থান ‘অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট’ হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য তালিকাটি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া দুর্যোগের পর ধসে পড়া ভবন বা ধ্বংসস্তূপের নিচে উদ্ধারকাজের জন্য সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে ৫২ থেকে ৫৪ ধরনের আধুনিক ভারী যন্ত্রপাতির তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। জরুরি সেবার জন্য বেসরকারি খাতে থাকা হেলিকপ্টার এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের বেড সক্ষমতার তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) গ্র্যাজুয়েশনের প্রেক্ষাপটে নগর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদ্যমান অবকাঠামোগত ঘাটতি ও আর্থসামাজিক বৈষম্য কমাতে সুপরিকল্পিত, জলবায়ু-সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
আরবান ডায়ালগে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা ঘোষ নগরায়ণের বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা না করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত টেকসই নগরায়ণ নিয়ে ভাবতে হবে, যাতে মানুষের রাজধানীমুখী হওয়ার প্রবণতা বা মাইগ্রেশন কমে আসে। তিনি বলেন, ‘যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মানসম্মত উচ্চশিক্ষা বা আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত থাকত, তবে সাধারণ মানুষ কেন এত কষ্ট করে ঢাকায় আসত?’
দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং জনবান্ধব নগরনীতি বাস্তবায়নের দাবিতে অনুষ্ঠানে ১৬ দফা ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়। এতে ভূমির মালিকানার আইনি জটিলতা বা বৈধতা বিবেচনা না করে বস্তিবাসীসহ সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়, যা মানুষের মৌলিক অধিকার।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শহর এলাকায় বাড়তে থাকা দাবদাহ মোকাবিলায় সমন্বিত ‘ন্যাশনাল হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি, নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মায়েদের সহায়তায় এলাকাভিত্তিক চাইল্ড-কেয়ার হাব প্রতিষ্ঠা এবং বর্জ্য ও স্যানিটেশন কর্মীদের পৌর ব্যবস্থাপনার মূল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের ন্যায্য মজুরি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়।
