চোখ-কান খোলা রাখলেই আমাদের সমাজে ইসলামবিদ্বেষের বাস্তবতাটা ধরা পড়ে। হিজাব বা নিকাব পরার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা কর্মক্ষেত্রে অপদস্থ হওয়া, ভাইবা বোর্ডে দাড়ি-টুপির কারণে মেধাবী প্রার্থীদের বাদ পড়া, অথবা ক্লাসে হাদীস বলার ‘অপরাধে’ শিক্ষকের চাকরি যাওয়া; এমন অনেক নজির আছে আমাদের সামনে। [১]
এর বাইরে রাস্তাঘাটে, গণপরিবহনে, মিডিয়া এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানেও তুচ্ছার্থে ‘হুজুর’ বা ‘মোল্লা’ সম্বোধন এবং তির্যক মন্তব্যের উদাহরণও আছে প্রচুর। ইসলামবিদ্বেষ আমাদের সমাজের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
দাড়ি-টুপি, হিজাব-নিকাব, বোরকা-জুব্বা নিয়ে ঠাট্টা আমাদের সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার। ইসলামের ফরজ বিধান পর্দা করার কারণে অনেক মুসলিম নারীকে এখানে ‘বোরকাওয়ালি’, ‘নিনজা’, ‘বস্তা’-র মতো অপমানজনক কথা শুনতে হয়।
ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি হজ করে দাড়ি রাখলে সমাজের চোখে সেটা ভালো। বৃদ্ধ বয়সে টুকটাক ইসলাম পালন করাটা সেক্যুলারিসম স্বাভাবিকভাবে নেয়। কিন্তু কোনো যুবক যদি দাড়ি রাখে, টুপি পরে, গোড়ালির ওপরে কাপড় রাখে, তখন সেটা কট্টরতা, উগ্রবাদ বা মগজধোলাইয়ের শিকার হবার লক্ষণ।
ইসলামের শিক্ষা মেনে যুবক বয়সে নাচ-গান বা ফ্রি-মিক্সিং থেকে দূরে থাকাকে সমাজের বড় একটা অংশ মনে করে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কিংবা সেকেলে হওয়া।
এ সমাজে তরুণদের ইসলামচর্চাকে হুমকি মনে করা হয়।
ফিরিঙ্গিদের অনুকরণে বাংলার কাঠফাটা গরমে স্যুট-কোট পরে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে হাঁটাটা স্বাভাবিক। এটাকে কেউ গোলামির মানসিকতা মনে করে না। ঔপনিবেশিক প্রভুদের এই অন্ধ অনুকরণই সমাজের চোখে আধুনিকতা। কিন্তু পাঞ্জাবি অথবা জুব্বা পরলে, সেটা কিন্তু পাকিস্তান কিংবা আরবের সংস্কৃতির অনুসরণ!
এমন অনেক দ্বিচারিতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ আর তাচ্ছিল্যের গল্প ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে।
তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, তরুণদের ইসলামচর্চা নিয়ে আমাদের সুশীল সমাজের তাত্ত্বিক উদ্বেগ। তরুণরা কেন ফোন ধরে ‘হ্যালো’ না বলে সালাম দিচ্ছে? মেয়েরা কেন হিজাব করছে, বোরকা পরছে? কেন কথোপকথনের সময় বলছে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বা ‘সুবহানাল্লাহ’? তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেছে তারা।
দেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে কবি-সাহিত্যিকরা এই আচরণগুলোকে চিহ্নিত করছেন উগ্রবাদ, রাজনৈতিক চক্রান্ত কিংবা সমাজের অধঃপতন হিসেবে।
একজন মুসলিম যখন তার দ্বীন পালন করতে চায়, আমাদের সিভিল সোসাইটির মাথারা তখন সেটাকে রোগ হিসেবে দেখেন। ইসলামচর্চাকে রোগ এবং বিপজ্জনক হিসেবে দেখানোর এই প্রবণতা ইসলামবিদ্বেষের টেক্সটবুক প্রমাণ।
ইসলামবিদ্বেষ বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত। এটা কেবল গুটিকয়েক মানুষের আচরণের সমস্যা না; এই ইসলামবিদ্বেষ কাঠামোগত। দেশের পলিসি, রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, আইন, আইনের প্রয়োগ, মিডিয়া—যে দিকেই তাকাবেন, দেখবেন সেখানে ইসলামবিদ্বেষ গেঁথে আছে।
দাড়ি-টুপি বা হিজাব নিয়ে যেসব বৈষম্যমূলক আচরণ আমরা দেখি, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। বরং বিদ্বেষের এই কাঠামোরই বিষাক্ত ফল।
বই: মুসলিমবঙ্গ
অধ্যায়: খাঁচা
