নিজেকে আল্লাহর কাছে নিঃস্ব করে তুলে ধরুন:
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ সর্বদা মানুষদেরকে আল্লাহ তা‘আলার দিকে নিজের অভাব ও নিঃস্ব অবস্থা তুলে ধরার অত্যাবশ্যকতা বর্ণনা করতেন।
তিনি বলতেন, বান্দা তার রব আল্লাহর মুখাপেক্ষী হবে যাতে তিনি তাকে সঠিক পথের দিশা দেন, ভালো কাজগুলোর দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত প্রদান করেন।
তিনি বলেন, ‘হতে পারে কোনো মানুষ অনেক বেশি বুদ্ধিমান, প্রখর মেধার অধিকারী, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাকে সবচেয়ে প্রকাশিত জিনিস থেকে অন্ধ করে রাখেন। আবার হতে পারে একজন মানুষ অনেক বোকা, দুর্বল দৃষ্টির অধিকারী কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাঁরই অনুমতিক্রমে মানুষের মাঝে যে বিষয়ে মতভেদ হয়েছে তাকে সে হক্বের সহজ দিশা প্রদান করেন। সুতরাং লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপায় নেই, তিনি ব্যতীত কোনো ক্ষমতা নেই। তাই এটা স্পষ্টভাবে বলা যায়, যে কেউ নিজের দৃষ্টি তথা বুদ্ধির ওপর নির্ভর করবে অথবা নিজের বিবেকের ওপর ভরসা করবে সে অবশ্যই অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। হেদায়াত থেকে মাহরূম হয়ে যাবে।’ ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা‘আরুদ্বিল আক্বলি ওয়ান নাক্বলি ৯/৩৪।
অন্যত্র তিনি বলেন, সুতরাং আল্লাহ যার অন্তরকে আলোকিত করবেন তাকে এমন হিদায়াত দিবেন যা তাকে মঞ্জিলে মাকসূদে পৌঁছে দিবে। অন্যদিকে যার অন্তরকে অন্ধ করে দিবেন, অনেক গ্রন্থ পড়লেও সেটা তার হয়রানী ও পথভ্রষ্টতাই শুধু বাড়িয়ে দিবে। মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১০/৬৬৫ (আল-ওয়াসিয়্যাতুস সুগরা)।
ইবন তাইমিয়্যাহ আরো বলেন, ‘দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত হক্ক কেউ বিশ্বাস করতে সমর্থ হলে সেটা তার মাঝে ধারণ করার ক্ষমতা, আয়ত্ব করার যোগ্যতা শক্তিশালী করে ও পরিশুদ্ধ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿وَٱلَّذِينَ ٱهۡتَدَوۡاْ زَادَهُمۡ هُدٗى﴾ [محمد : ١٧] “আর যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে তিনি তাদের হিদায়াত বাড়িয়ে দিবেন”। [সূরা মুহাম্মাদ: ১৭]
আরও বলেন,
وَلَوۡ أَنَّهُمۡ فَعَلُواْ مَا يُوعَظُونَ بِهِۦ لَكَانَ خَيۡرٗا لَّهُمۡ وَأَشَدَّ تَثۡبِيتٗا ٦٦ وَإِذٗا لَّأٓتَيۡنَٰهُم مِّن لَّدُنَّآ أَجۡرًا عَظِيمٗا ٦٧ وَلَهَدَيۡنَٰهُمۡ صِرَٰطٗا مُّسۡتَقِيمٗا ٦٨ ﴾ [النساء : ٦٦، ٦٨] “যা করতে তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তারা তা করলে তাদের ভাল হত এবং চিত্তস্থিরতায় তারা দৃঢ়তর হত। আর অবশ্যই তখন আমরা তাদেরকে আমাদের কাছ থেকে মহাপুরস্কার প্রদান করতাম। এবং অবশ্যই আমরা তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করতাম।” [সূরা আন-নিসা: ৬৬-৬৮]’ দেখুন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৪/১০।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ আরও বলেন, ‘যে কেউ যা জেনেছে তার ওপর আমল করবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে যা জানেনি সে জ্ঞানের ওয়ারিস বানাবেন। সৎ উদ্দেশ্য ইলম অর্জন ও তা ধারণ করার ক্ষেত্রে বড় সহযোগী হিসাবে প্রমাণিত। শরী‘আতের জ্ঞান অর্জন করা সৎ উদ্দেশ্য ও সৎ আমলের জন্য বড় সহযোগী হিসাবে পরীক্ষিত। কারণ ইলম হচ্ছে কায়েদ (সম্মুখ পরিচালক) আর আমল হচ্ছে সায়েক (পিছনের দিক থেকে হাঁকিয়ে নেয়ার চালক)। আত্মা হচ্ছে একগুঁয়ে, সুতরাং যখন কায়েদ (সম্মুখ পরিচালক) কাজ করতে অলসতা করবে তখন সায়েক্ব (পিছনের দিক থেকে হাঁকানো) ব্যক্তির পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয় না, আর যখন সায়েক অলসতা করবে তখন কায়েদ সামনে এগুতে সক্ষম হবে না। যখন ইলম দুর্বল হবে পথচারী তখন বিভ্রাটে পড়বে, জানতে পারবে না কোন পথে চলবে, সর্বশেষ অবস্থা হবে তাকদীরের ওপর নিজের ডোর ছেড়ে দেয়া। আর যখন কেউ আমল ছেড়ে দেয় তখন পথচারী পথ হারিয়ে ভুল পথে পরিচালিত হবে, যদিও সে জানছে যে সে পথ হারিয়ে বসেছে। এভাবে ইলমে দুর্বল ব্যক্তি হতভম্ব ও হয়রান, জানে না কোন পথে চলবে, যদিও তার সামনে চলার পথ অনেক, আর আমল পরিত্যাগকারী ব্যক্তিও হতভম্ব ও হয়রান, পথ থেকে বিচ্যুত, তবে সে জানে যে সে পথ হারিয়ে বসেছে।’ মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১০/৫৪৪। আরও দেখুন, জামে‘উর রাসায়িল ২/১৮০; মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৩/২৪৫-২৪৬, ১৮/১৭৬।
